মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কিছুই করার বাকি আছে

এম এ মজিদ

বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তির পর বলেছিলেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন করবেন এবং এমন এক ধরনের সার্টিফিকেট ও পরিচয়পত্র প্রদান করবেন যা নকল করা তো দূরের কথা ফটোকপিও করা যাবে না। তিনি গত বছর দেশব্যাপী একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু করেছিলেন। আমরা তার সঙ্গে বহুবার সাক্ষাত্ করে বলেছিলাম, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই করার জন্য সকল মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনকে নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক করতে। সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট পরামর্শগুলো গ্রহণ করে প্রতিটি জেলায় একটি করে উপজেলাকে পাইলট প্রকল্প বেছে নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করতে। যেহেতু এখনো অন্তত ৫০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে আছেন সেহেতু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্তকরণ এবং ভারতীয় তালিকা, মুক্তিযোদ্ধা ভোটার তালিকা, গেজেট তালিকা, মুক্তিবার্তা তালিকাগুলো সমন্বয় ও পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই করা মোটেও অসম্ভব কিছু নয়।

উল্লেখ্য, একটি মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন গত ৪ বছর যাবত্ মুক্তিযোদ্ধাদের গৃহ নির্মাণের জন্য ১০ লক্ষ টাকা ঋণ প্রাপ্তিকল্পে একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে। এই প্রস্তাবটি এখন পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রেরণ করেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। অথচ বাংলাদেশে ১৮ লক্ষ সরকারি কর্মচারীকে গৃহনির্মাণ নীতিমালা-২০১৮ এর আওতায় গ্রেড ভেদে সর্বোচ্চ ৭৫ লক্ষ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৩০ লক্ষ টাকা ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে। সমপ্রতি ৫ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১ কোটি ও সর্বনিম্ন ৬০ লক্ষ টাকার ঋণ নেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করে শেষপর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়।

আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সামান্য মর্যাদা চেয়ে আবেদন নিবেদন করে আসছি। দাবিগুলো এরূপ—১. বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই ষাটের ঊর্ধ্বে বয়স্ক লোকদের সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধারা সকলেই ষাটের ঊর্ধ্বে। মুক্তিযোদ্ধাদের সিনিয়র নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দিয়ে সরকারি সকল পরিবহনে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ দান; ২. সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১০০ শতাংশ বিনামাশুলে চিকিত্সার আদেশটি মোটেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না, আদেশটি যথাযথভাবে পালনের কঠোর নির্দেশ জারি করা; ৩. ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় একই মঞ্চে মুক্তিযোদ্ধাদেরও রাখা। এজন্য উপজেলা পর্যায়ে টিএনও’র সঙ্গে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, জেলা পর্যায়ে ডিসি’র সঙ্গে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এবং একইভাবে বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা; ৪. মুক্তিযোদ্ধাদের দাফনের ৫ হাজার টাকা পেতে কুলখানি বা চল্লিশা তো দূরের কথা ফাইল চালাচালিতে মৃত্যুবার্ষিকী ফিরে এলেও ওই ৫ হাজার টাকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। মুক্তিযোদ্ধাদের দাফনের অর্থ কমপক্ষে অফেরতযোগ্য ২০ হাজার টাকা তাত্ক্ষণিকভাবে প্রদানের আদেশ জারি ও তা কার্যকর করা ৫. এখনো যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে রিকশা চালাতে বা ভিক্ষাবৃত্তিতে দেখা যায়, তাহলে ওই এলাকার নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করা। এসব আদেশে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানিত হবেন।

পাঁচ থেকে ১০ বছর পর হয়তো আর একজন মুক্তিযোদ্ধাকেও জীবিত পাওয়া যাবে না। জীবনবাজি রেখে ও রক্ত দিয়ে যাঁরা বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের এই দেশটির মানচিত্র অঙ্কন করে দিয়েছেন—তাঁদেরকে একটু সম্মান দিতে আমাদের কার্পণ্য করা উচিত নয়। এই সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক কিছুই করেছে। তারপরও অনেক কিছুই করার বাকি আছে। আমরা আশা করি, উপর্যুক্ত বিষয়ে সরকার অবিলম্বে আন্তরিক পদক্ষেপ নিবেন।

n লেখক : ৭নং সেক্টরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

শেয়ার করুন