ধর্ষণের শাস্তি কঠোর হওয়া দরকার

ইসহাক খান

দেশে যে হারে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, তাতে সমাজের মানবিক ও নৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণকারীরা ধর্ষিতাকে হত্যা করছে। কারণ তারা কোনো প্রমাণ রাখতে চায় না। এই ধর্ষণকারীদের তালিকায় স্কুল শিক্ষক, মাদরাসা শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, কলেজ শিক্ষক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকও রয়েছেন।

বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো শিশু ধর্ষণ। সম্প্রতি বেশ কয়েক স্থানে শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে। এখানে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া তিনটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। দুটি ঘটনার মূল চরিত্রে মসজিদের ইমাম। অন্যটির মূল চরিত্রে হাই স্কুলের শিক্ষক।

ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ধানিখোলা ইউনিয়নে গায়েশাপাড়া গ্রামে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মসজিদের ইমাম মোবারক হোসেনকে এলাকাবাসী ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছে। অভিযোগে জানা গেছে, মক্তবে পড়তে আসা শিশু শিক্ষার্থীকে বেশ কিছুদিন ধরে ইমাম মোবারক সাহেব মসজিদের পাশে একটি গোপন কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করেন। ঘটনার দিন এলাকাবাসী তা দেখতে পায় এবং মোবারক হোসেনকে উত্তম-মধ্যম দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। এদিকে শিশুটি লোকলজ্জার ভয়ে বাড়ির পাশে একটি গাছে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে।

অন্য ঘটনাটি ঘটে চট্টগ্রামে ফটিকছড়ির দৌলতপুর চৌধুরী বাড়ির জামেয়া মসজিদে। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী মক্তবে পড়তে এলে মসজিদের ইমাম তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। মেয়েটির চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে হুজুরকে হাতেনাতে ধরে গণধোলাইর পর গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকা পদক্ষিণ করায়। তারপর তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।

পরের ঘটনাটি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার উমেদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের। শিক্ষকের নাম রবিউল।  তিনি দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর ভিডিও ধারণ করে কৌশলে তাকে কয়েক বছর ধরে ধর্ষণ করে আসছিলেন। এই কয়েক বছরে মেয়েটি কয়েকবার গর্ভবতী হয়ে পড়লে শিক্ষক রবিউল নিজের উদ্যোগে তার গর্ভপাত করান। ঘটনা এখানেই শেষ হলে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু এক সন্তানের জনক রবিউল তার খালি বাসায় বিদ্যালয়ের আরো অনেককে নিয়ে এসে যৌনকর্মে লিপ্ত হলে এবার ওই মেয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সে তার অভিভাবককে ব্যাপারটা জানায়। তারপর প্রধান শিক্ষক বরাবর মেয়েটি লিখিত অভিযোগ করলে বেরিয়ে আসে শিক্ষক রবিউলের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনেক তথ্য। ফাঁস হয় একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে রবিউলের অনৈতিক সম্পর্কের অডিও-ভিডিও। সেই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয় একাধিক ছাত্রী। সেই অভিযোগের সত্যতা পায় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। ঘটনা বেগতিক দেখে রবিউল ছুটির দরখাস্ত দিয়ে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

এখানে ঘটনাগুলোর উল্লেখ করার কারণ, অনেকেই বলে থাকেন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। প্রশ্ন হলো, কাকে আপনি সচেতন করবেন? এখানে যে তিনটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, দুটি ঘটনারই মূল চরিত্র দুজন ধার্মিক ব্যক্তি। আরেকটির মূল চরিত্র একজন শিক্ষক। শিক্ষক হলো পিতৃতুল্য। তাঁর কাছে যদি শিক্ষার্থী নিরাপদ না হয়, তাহলে আর কোথায় নিরাপদ হবে তারা?

উল্লিখিত ঘটনায় আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও সামাজিক মূল্যবোধ কোনো কিছুই এই জঘন্য ঘটনা থেকে মানুষকে দূরে রাখতে পারছে না। এর জন্য দরকার কঠোর আইন ও সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ।

এ প্রসঙ্গে একটু পেছনে তাকাতে হয়। কিছুদিন আগেও কথায় কথায় এসিড নিক্ষেপ ছিল ডাল-ভাত। মন চাইলে এসিড নিক্ষেপ করত দুষ্কৃতকারীরা। এই এসিডের ঝলসানিতে কত সোনামুখ যে মুহূর্তে বিকৃত হয়ে গেছে, সে কথা বলাই বাহুল্য। সারা দেশ এই নিয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠলে সরকার আইন করতে বাধ্য হয়। এসিড নিক্ষেপের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ার পরপরই রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেছে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা।

এই সময় একটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে। শবেবরাতের সন্ধ্যায় তাসফিয়া নামের একজন স্কুলপড়ুয়া মেয়ে তার ফেসবুক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। পরদিন পতেঙ্গা সৈকতের ১৮ নম্বর ঘাটে তাসফিয়ার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাসফিয়ার কথিত প্রেমিক আদনানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সেই নাকি তাসফিয়াকে তার বন্ধুদের হাতে তুলে দিয়েছে। হায়রে প্রেম। সেখানেও এমন নিষ্ঠুরতা! ধারণা করা হচ্ছে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে।

বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে রাতের চলন্ত বাসগুলো। বাসে মহিলা যাত্রীদের একা পেলেই বাসের ড্রাইভার-হেলপার মেয়েটিকে আটকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে। এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। রূপা নামের একটি মেয়েকে এমন ঘটনায় জীবন দিতে হয়েছে। রাজধানীর রামপুরায় এমন একটি ঘটনায় একটি মেয়ে আত্মরক্ষায় চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে পড়ে সম্ভ্রম রক্ষা করেছে কিন্তু তাতে সে গুরুতর আহত হয়। সাভারে একজন গার্মেন্টকর্মীকে চলন্ত বাসে আটকিয়ে ধর্ষণ করেছে বাসের ড্রাইভার ও হেলপার। এ রকম ঘটনা অনেক। কিন্তু তার জন্য যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে না।  বেশির ভাগ ঘটনা ধীরে ধীরে ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। আর এর কুফল পড়ছে সমাজে। অপরাধীদের সাহস বেড়ে যাচ্ছে। তারা ধরেই নিচ্ছে ধর্ষণ করলে কিছু হবে না। তাই তো তাদের এমন আগ্রাসী ভূমিকা।

তার ওপর রয়েছে থানা, পুলিশ ও জেরার বিড়ম্বনা। ধর্ষণ প্রমাণ করতে গিয়ে ধর্ষিতাকে দ্বিতীয়বার ধর্ষিত হতে হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবীর অমানবিক ও অশ্লীল জেরার মুখে ভিকটিম আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিচারব্যবস্থার এই প্রক্রিয়া আধুনিকীকরণ করা জরুরি। না হলে বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে ফিরবে।

ধর্ষণ এখন মহামারির আকার ধারণ করেছে। একে রোধ করার একমাত্র পথ হলো কঠোর আইন এবং তাত্ক্ষণিকভাবে সেই আইনের বাস্তবায়ন। স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, কোনো ভালো কথায় বা সৎ পরামর্শে যখন সামাজিক এই ব্যাধির নিরাময় সম্ভব হচ্ছে না তখন চিকিৎসা পদ্ধতি পাল্টাতে হয়। হঠাৎ করে সমাজের কোনো অঙ্গ বিকল হয়ে গেলে তখন দ্রুত সেই অঙ্গের চিকিৎসা দরকার। যেভাবে আইন করে এসিড নিক্ষেপ বন্ধ করা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে দ্রুত কঠোর আইন করে এই ধর্ষণপ্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার, টিভি নাট্যকার

শেয়ার করুন