উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে প্রবাসী ও অভিবাসীদের অংশগ্রহণ

ড. এজাজ মামুন

সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল সামিট অব উইমেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে নারী শিক্ষা এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকার জন্য বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করে। এ কারণেই গত ২৭ এপ্রিল দুদিনের সফরে সিডনি এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সফরকালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। ভিয়েতনামের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড্যাং থাই নগক থিন এবং অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। সংক্ষিপ্ত ও ব্যস্ত এই সফর শেষে ফিরে যাবার আগে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এতে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় ধরে তিনি দেশের উন্নয়ন ও  ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। তাঁর প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কসুলভ বক্তব্য, পরিকল্পনা ও দেশকে এগিয়ে নেবার দৃঢ় প্রত্যয় উপস্থিত অস্ট্রেলিয়া প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শক্ত মনোবল ও তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন সারাবিশ্বের নজর কেড়েছে। তাই তিনি যেমন সারাবিশ্বে সমাদৃত, তেমনি প্রবাসীরাও আজ বন্যা-খরা-মঙ্গা আর বিদেশি সাহায্যপুষ্ট দেশের মানুষ হিসেবে পরিচিত নন। সবচে’ বড় কথা হলো, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের মাঝে একটি আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছেন। সেটি হলো সামনে এগিয়ে যাবার আত্মবিশ্বাস। পদ্মা সেতুসহ অনেক মেগাপ্রজেক্ট দেশের নিজস্ব অর্থে বাস্তবায়নে তাঁর বজ্রকঠিন সিদ্ধান্ত এই  আত্মবিশ্বাসের ভিতকে শক্ত করেছে।

শস্য উত্পাদন থেকে শুরু করে গার্মেন্টস শিল্প ও অন্যান্য খাতে যে এক বিপ্লব সূচিত হয়েছে তার পেছনে রয়েছে দেশের খেটে খাওয়া মানুষের অপরিসীম পরিশ্রম। আপনজনকে দেশে ফেলে এসে প্রবাসে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন লাখ লাখ প্রবাসী কর্মী। তারা সবাই আজ বাংলাদেশের এই উন্নয়নের সারথি। আর সবকিছুর মূলে প্রধানমন্ত্রীর যে এক নিরলস ভূমিকা রয়েছে তা সর্বজনবিদিত। তাঁর নেতৃত্ব ও উন্নয়নের কর্মধারা আজ সারা বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কল-কারখানা বাড়ছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, মানুষের জীবনযাত্রায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে। সর্বক্ষেত্রে দেশের চাহিদা মেটাবার জন্য আজ চাই আধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তিতে শিক্ষিত দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনগোষ্ঠী। দেশ যেভাবে এগুচ্ছে সেভাবে কিন্তু দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে না। আর এ কারণেই আজ দেশের বিরাট অংকের মুদ্রা বিদেশিদের হাতে চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে অন্য দেশে। দু’মাস আগে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া হিসাবে দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে ৮৫ হাজার বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করছেন যাঁদের মধ্যে প্রায় ৬৮ হাজার কোনো না কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। কিন্তু অনেকের মতে এ সংখ্যা পাঁচ লাখেরও অধিক। আর দেশ থেকে এদের হাত দিয়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার। আমাদের দেশের উন্নয়নকে গতিশীল করার জন্য বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে, বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ লোকবলের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এ দেশে জন্ম নেওয়া দেশের বাইরে শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জনকারী অনেকেই যে প্রকারান্তরে এ চাহিদার কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারে তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

একসময় দেশ ছেড়ে অনেক পেশাজীবী দেশের বাইরে চলে যেতেন। কারণ হিসেবে বলা হতো দেশে কাজ করার সুযোগ নেই। কিন্তু এখন সেটা আর সত্যি নয়। এক সময়ের ব্রেইন ড্রেইনকে ব্রেইন গেইন হিসেবে কাজে লাগাবার সুযোগ এসেছে এখন। বাংলাদেশ থেকে আসা প্রবাসী ও অভিবাসীরা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের অনেকেই দেশের ১৬ কোটি মানুষের সঙ্গে মাতৃভূমির মঙ্গলে ও উন্নয়নে অংশীদার হতে চান। এঁদের অনেকেই অভিবাসী হিসেবে অন্যত্র বসবাস করছেন ঠিকই, কিন্তু দেশের জন্য তাঁদের মন কাঁদে। তাঁরা আনন্দিত হন দেশের মঙ্গলে। প্রবাসী ও অভিবাসীদের অনেকেই  নীতি নির্ধারণী, বিজ্ঞান, গবেষণা, চিকিত্সা, শিক্ষকতা, তথ্য প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও পরিকল্পনা, আইনসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত। দীর্ঘদিন উন্নত দেশে কাজ করে তাঁরা পেশাগত আধুনিক, লাগসই ও বিশেষায়িত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে এইসব প্রবাসী ও অভিবাসী বাংলাদেশির অংশগ্রহণ যেমন তাঁদের মাতৃভূমির প্রতি দায়বদ্ধতা পূরণে সাহায্য করবে, তেমনি বিভিন্ন খাতে  দেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ফলে বিদেশি মুদ্রা খরচ অনেকাংশে সাশ্রয় হবে। আমরা লক্ষ করেছি, দেশের অনেক ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে যার ভিত্তি তৈরি হয়ে আছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রামাণ্য তথ্যভিত্তিক নীতি নির্ধারণ, বিজ্ঞান গবেষণাকে আরো ফলপ্রসূ ও জনকল্যাণমূলক করা, প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো, সঠিক পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক মডেলিং, পুরনো আইনগুলোর সংস্কার ও আধুনিকীকরণ, অপ্রবিধান বা ডি-রেগুলেশন, ই-গভর্নেন্স, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, কৃষিজাত পণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন, নগর পরিকল্পনা, যানজট নিরসন ও উত্পাদনশীলতা বাড়ানো এবং এমন আরো অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীর প্রয়োজন রয়েছে। অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেই তাদের প্রবাসী ও অভিবাসীদের দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সমপৃক্ত করা হয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও সে দেশগুলোতে জন্ম নেওয়া প্রবাসী ও অভিবাসীরা এভাবে কাজ করছেন।

আমরা মনে করি অভিবাসী ও প্রবাসীদের দেশের কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিলে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বেগবান হবে। তাছাড়া বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আধুনিক প্রযুক্তিতে শিক্ষিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনগোষ্ঠী মেন্টর হিসেবে কাজ করে দেশে একটি দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতেও অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তিতে শিক্ষিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ অভিবাসী ও প্রবাসীদের দেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে সমপৃক্ত করার জন্য নলেজ ব্যাংকের প্রবর্তন করা যেতে পারে যেখানে অভিবাসীদের দক্ষতার যাবতীয় তথ্যাদি থাকবে আর দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের চাহিদাকে সামনে রেখেই প্রবাসী ও অভিবাসীরা তাঁদের নলেজ রেমিট্যান্সের ব্যবস্থা করতে পারবেন। তাছাড়া দেশে ও বিদেশে দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে আমরা দেখেছি, সরকার ও দূতাবাসগুলোর বর্তমান ব্যবস্থাপনার মধ্যেই এগুলো করা সম্ভব। তবে এজন্যে পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ও পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

মাতৃভূমিকে সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছার সঙ্গে প্রবাসী ও অভিবাসীরা নিবিড়ভাবে সমপৃক্ত হোক— এটা আমাদের একান্ত কাম্য।

লেখক: প্রবাসী বিজ্ঞানী

(ইত্তেফাক থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন