আলোদূষণ নিয়ে কী ভাবছি আমরা

জয়া ফারহানা

গরমে হিট র‌্যাশ, ফুড পয়জনিং, অল্প শ্রমে ক্লান্তিজাতীয় নাজেহাল থেকে বাঁচতে আমরা ডিপফ্রায়েড খাবার এড়িয়ে চলি। সাইট্রাস ফল, তরমুজ বা কাঁচা আমের শরবত, ডাবের পানি খাই। নরম ভয়েল কটন ব্যবহার করি। শীতে সামনে ধোঁয়া ওঠা একবাটি গরম স্যুপ মনখুশ করে দেয়। চুষির পায়েস, নলেন গুড়ের ক্ষীর, পাটিসাপটা খেতে ভালোবাসি। সিল্ক তসর পরিধান করি। চৈত্রে খাই ব্রাহ্মী শাকের তেতো বা উচ্ছে-করলা। বর্ষার ঘনঘোর বৃষ্টিতে সরিষা ইলিশ-খিচুড়ি কার না পছন্দ? তসর সিল্ক বা আদ্দি কটন নয়, পোশাকে ফেব্রিক হিসেবে তখন প্রয়োজন নাইলন, টেরিকটন বা ভিসকস। ঋতুভেদে পছন্দের ভিন্নতা মনে করিয়ে দেয় জলবায়ুর সঙ্গে জীবনের নিবিড় ঘনিষ্ঠতার কথা। কিন্তু জীবনের জন্য এমন শক্তিধর, এমন প্রভাবক, এমন গুরুত্বপূর্ণ যে জলবায়ু তাকে নিয়ে কতটুকু ভাবি আমরা? সম্প্রতি অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘন ঘন কয়েকটি বিধ্বংসী কালবৈশাখী, বজ্রপাত, অসংখ্য প্রাণহানি, গাছচাপা পড়ে মৃত্যুর কারণে নাগরিক আড্ডার এজেন্ডায় সাবসিডিয়ারি হিসেবে ঢুকেছে বজ্রপাতের টার্মটিও। কেন এত বজ্রপাত, আগে তো কখনো হয়নি, হলেও এত মানুষের মৃত্যু হয়নি, এ নিয়ে হালকা চালে কিছু কথা বলছি বটে। বিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীরা অবশ্য বহুদিন থেকে আমাদের সতর্ক করছেন। পৃথিবী জলবায়ুর যে এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বহুদিন ধরে তা বলছেন। বলেই যাচ্ছেন। আমরা গা করিনি। না করাই আমাদের স্বভাব। জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ে এই যে উদাসীনতা, এর জন্য চরম মাসুল দিতে হবে আমাদের। এপ্রিল-মে মাসে অর্থাৎ বৈশাখে কালবৈশাখী, ক্রান্তীয় নিম্নচাপসহ আরো নানা ধরনের ঝড় হবে, কিউমুলোনিম্বাস মেঘের কারণে প্রবল গতির বারিকণার মধ্যে অনবরত সংঘর্ষের কারণে নেগেটিভ-পজিটিভ বিদ্যুৎ তাড়িত হয়ে বজ্রপাতও হবে। এর সবই স্বাভাবিক। কালবৈশাখীর স্বাভাবিক প্রবণতা এটা সাধারণত বিকেলের শেষে বা সন্ধ্যায় হয়। এ বছর সকাল ৯টার ভরন্ত রোদের তেজি আকাশ হঠাৎ করেই নিকষ কালো হয়ে প্রবল গতিতে হুড়মুড়িয়ে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে মানুষ ও বৃক্ষ। কালবৈশাখী সুবোধ বালকের মতো অল্প ঝড়ো হাওয়া আর অঝোর ধারার কিছু বৃষ্টি উপহার দেবে এমন নাও হতে পারে। কিন্তু এক কেজি, দুই কেজি ওজনের শিলাবর্ষণ একটু বেশিই বেপরোয়া বালকের আচরণ। শরত্চন্দ্রের ‘রামের সুমতি’র রামের মতো। বজ্রপাতকে এরই মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কালবৈশাখীও মোটেই তাচ্ছিল্যের বিষয় নয়। ধ্বংসলীলায় এটা কখনো কখনো টাইফুনকেও হার মানাতে পারে। ১৯৫১ সালের ১২ মে যশোর ও ফরিদপুরে এমন একটি কালবৈশাখী হয়েছিল। এটি ধ্বংসলীলায় যেকোনো টাইফুন, টর্নেডো বা হারিকেনকে হার মানায়। এ বছর তেমন বিধ্বংসী ঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে শিলাবৃষ্টিকে বেশ নিরীহই মনে হয়। গ্রামবাংলার শিশুদের কাছে বরফ ভেবে শিলা খাওয়া মজা ও খেলার অংশ। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ এই শিলা কিন্তু আদতে নিরীহ নয়। কৃষির জন্য প্রচণ্ড ক্ষতিকারক। শিলাবৃষ্টির জন্য আমের মুকুল ঝরে যায়। কচি আম পড়ে যায়। তরমুজ, খরমুজসহ গ্রীষ্মকালীন আরো নানা ধরনের ফলের জন্যও শিলাবৃষ্টি ক্ষতিকর। সবচেয়ে বড় ব্যাপার শিলাবৃষ্টি চাষের জমির জন্য সাক্ষাৎ বিভীষিকা। কালবৈশাখী অকস্মাৎ হুড়মুড় করে শীতল বারিধারা নামিয়ে সবাইকে হকচকিত করে আবার উধাও হয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে একে এক রকম প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বলে মনে হলেও এর প্রচণ্ড গতির বাতাস ও তুমুল বর্ষণ আমাদের নরম মাটির চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর। মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরই মধ্যে আমাদের বোরো ফসলের বিশাল একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধানে চিটা লেগেছে। রোদের অভাবে ধান শুকাতে না পেরে কৃষকের হাহাকারের খবরও পত্রিকায় বিস্তারিত লেখা হয়েছে। এসব কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা সাধারণ মানুষও জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ে কিছুটা হলেও ভাবছি। বিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীদের পরিসর অতিক্রম করে এসিড রেইন, গ্রিনহাউস গ্যাস, ওজোন হোলের এজেন্ডা সাধারণের আড্ডায় ঢুকে পড়েছে। কিন্তু কখনো কি আমরা আলোদূষণ নিয়ে ভেবেছি? আলোদূষণ মোটেও তুচ্ছ সমস্যা নয়। সম্প্রতি সংঘটিত বেশ কিছু নির্মানবিক সড়ক দুর্ঘটনার কারণে আলোচনায় উঠে এসেছে সড়ক দুর্ঘটনার অন্ধিসন্ধি। কিন্তু সড়কে আলোর বিশৃঙ্খল (কখনো অতি উজ্জ্বল কখনো অনুজ্জ্বল আলো) ব্যবহারও যে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান একটি কারণ, আলোচনায় সেটা কম এসেছে। শহরে, বিশেষ করে মেট্রো শহরগুলোতে রাস্তার দুই পাশে বিলবোর্ডের সারি সারি উজ্জ্বল আলো ঝলকে ঝলকে প্রতিফলিত হয়ে চালকের চোখে পড়ায় চালকরা কখনো কখনো দিশা হারিয়ে ফেলেন বলে দুর্ঘটনা তদন্ত রিপোর্টে এসেছে। সড়কের মাঝে লাল হলুদ সবুজ সংকেত। পথ হয়তো মোড় বা বাঁক নিয়েছে কোথাও। সেই মোড়ে আবার বড় বড় বিজ্ঞাপন বোর্ড। তাও আবার বিভিন্ন বর্ণের আলোর। কখনো দূর থেকে সাধারণ আলোকে মনে হয় হলুদ আলো। সবুজ আলোকে বিবর্ণ মনে হয়। এসব ক্ষেত্রে চালকরা বিভ্রান্ত হন। অনেক গাড়িচালক অভিযোগ করেছেন, রাতে গাড়ি চালাতে গিয়ে মারাত্মক অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয় তাঁদের।

শুধু যে চালকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন তা নয়, এই আলো পরিবেশদূষণেরও কারণ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসসহ আরো বেশ কিছু দেশে সড়কে অতিরিক্ত মার্কারি ল্যাম্প ও অতি উজ্জ্বল ফিলামেন্ট ল্যাম্প এবং হাই প্রেসারের সোডিয়াম ল্যাম্প এরই মধ্যে নিষিদ্ধ হয়েছে। পথের নিরাপত্তাবিষয়ক পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেটুকু আলো হলে আমরা বস্তুর স্বাভাবিক রং চিনতে পারি সড়কে শুধু সেটুকু আলোই থাকতে পারে। এসব দেশে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে লো প্রেসার ল্যাম্প। এতে এসব দেশে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমেছে। এসব ল্যাম্পের খরচ কম। রক্ষণাবেক্ষণ সহজ। সবচেয়ে বড় লাভ লো প্রেশার সোডিয়াম ল্যাম্প অতি উজ্জ্বল ফিলামেন্ট ল্যাম্পের চেয়ে আট গুণ বেশি কার্যকর। রাস্তার আশপাশের আলো, যানবাহনের সংকেতের লাল সবুজ হলুদ আলো, বিজ্ঞাপন বোর্ডের নানা রঙের আলোর ব্যবহারে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে পশ্চিমা দেশগুলোতে। সেখানকার পরিবেশবিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীদের চাপে এ নিয়ে বিজ্ঞাপনের মার্কেটিং বিভাগ ভাবতে বাধ্য হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের বিজ্ঞাপন প্রচারের কায়দা-কানুন বদলেছে। এমনভাবে বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা হয়েছে যেন কোনোভাবে আলোর দূষণ না হয়।  শুধু যে সড়কের বিশৃঙ্খল আলোই আলোর দূষণ ঘটাচ্ছে তা নয়। অতিমাত্রায় কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বাসাবাড়ি এবং অফিস-আদালতেও আলোর দূষণ ঘটাচ্ছে। বহু অফিসেই এখন আর সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের অজ্ঞতায় ডেকোরেশনের ভুলভাল প্রয়োগে অফিসগুলোতে রীতিমতো দূষিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফ্লুরেসেন্ট টিউব, কম্পিউটারের মাইক্রোপ্রসেসর ও তাদের ভিশন প্লেট থেকে নির্গত নানা বর্ণের আলোকে আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির মতোই ক্ষতিকর মনে করছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা। ঠিক একই রকম ক্ষতিকর বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত এলইডি এলসিডি টেলিভিশনের আলো। বিজ্ঞানীরা বলছেন, টেলিভিশন থেকে নির্গত আলো তীব্রভাবে মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর। চোখের ক্ষতি থেকে শুরু করে নিউরনের ক্ষয়, মাথা ধরা থেকে শুরু করে স্মরণশক্তি হ্রাস ও শেষ পর্যন্ত আলঝেইমার্সের কারণ হয়ে দাঁড়ায় টেলিভিশন থেকে বিকিরিত আলো। টেলিভিশন ও কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন প্রকৃতির হিসাব-নিকাশকেই বদলে দিচ্ছে, বলছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা। কৃত্রিম আলোয় কাজ করতে গিয়ে মানুষের শারীরিক সক্ষমতার হার হ্রাস পাচ্ছে। নগরায়ণের কারণে রাতের আকাশ এখন আর রাত বলে মনে হয় না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্যাসাডিনা ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরে রাতের আকাশ দিনের আকাশের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল। এটা যারপরনাই ক্ষতিকর। দুর্ভাগ্য ও দুঃখজনকভাবে অন্যান্য দেশের বড় বড় শহরেও প্যাসাডিনা ও লস অ্যাঞ্জেলেসকে অনুসরণ করা শুরু করেছে। বিজ্ঞাপনদাতারা চাচ্ছেন বিজ্ঞাপনের লেখা ও ছবির ওপর আরো বেশি করে আলো পড়ুক যেন লেখা ও ছবি বেশি বেশি করে মানুষের মনোযোগ টানে। আরিজোনার তুসান শহরের সিটি কর্তৃপক্ষ আইন করে বিজ্ঞাপনের আলো বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের দেশে নগর নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা বহু রকম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেন। এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়ার নির্বাচনী খরচ অবশ্য তারা ওই বিজ্ঞাপনওয়ালাদের থেকেই নেন। কাজেই অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতেও আমাদের শহরগুলোতে আইন করে বিজ্ঞাপনের আলো বন্ধ করার ব্যবস্থা আমাদের জন্য একরকম অতি আশা কিংবা দূরাশাই।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

* কালের কণ্ঠ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

শেয়ার করুন