অস্তিত্ব রক্ষায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস

আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মসূচির ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই উপলক্ষে আজ (২২ মে ২০১৮) আন্তর্জাতিকভাবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মসূচির ২৫ বছর পূর্তি উৎসব উদ্যাপন করা হচ্ছে। ‘কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি’র সদর দপ্তর মন্ট্রিয়লসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আয়োজন করা হয়েছে নানা অনুষ্ঠান।

জীববৈচিত্র্য আমাদের তথা বিশ্বের মূল্যবান সম্পদ। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার জন্য জীববৈচিত্র্য প্রয়োজন। কিন্তু মানুষের কিছু কর্মকাণ্ডের জন্য বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে মানুষের চরম ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল বেশ কিছুকাল আগে থেকেই এই আশঙ্কা করেছিল। এ ব্যাপারে করণীয় ঠিক করতে ১৯৮৮ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেই উদ্যোগে জীববৈচিত্র্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের অ্যাডহক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয় এবং এই কমিটি সে সময় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। পরের বছর ১৯৮৯ সালের মে মাসে এই গ্রুপ কারিগরি ও আইন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের টেকসই ব্যবহারের (আহরণের) জন্য আন্তর্জাতিক একটি কনভেনশন তৈরির লক্ষ্যে আবারও একটি অ্যাডহক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে। পরবর্তী সময়ে এই ওয়ার্কিং গ্রুপ আন্ত সরকার মধ্যস্থতা কমিটি হিসেবে পরিচিতি পায়। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই কমিটি আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য কনভেনশনের খসড়া চূড়ান্ত করে এবং ১৯৯২ সালের ২২ মে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তা পাস হয়। আন্তর্জাতিক এই চুক্তির নাম হয় ‘কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি’, সংক্ষেপে সিবিডি। এরপর ৫ জুন ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির ধরিত্রী সম্মেলনে সিবিডি বিভিন্ন দেশের স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সিবিডিতে স্বাক্ষরের জন্য সে সময় সর্বশেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয় ১৯৯৩ সালের ৪ জুন। উল্লিখিত এই তারিখের মধ্যে মোট ১৬৮টি দেশ সিবিডিতে স্বাক্ষর করে এবং সিবিডি ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। বর্তমানে এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ১৯৫ এবং ইসিসহ পার্টির সংখ্যা ১৯৬।

জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে পৃথিবীব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করতে সিবিডি কার্যকর হওয়ায় দিনটিকে (২৯ ডিসেম্বর) ‘আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস’ হিসেবে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর পালন করা হয়। কিন্তু ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নানা ধরনের ছুটি থাকায় ২০০০ সালের পর থেকে প্রতিবছর ২২ মে ‘আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিবিডি স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার দিন থেকে আজ পর্যন্ত ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় এ বছর ‘আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস’-এর প্রতিপাদ্য করা হয়েছে—‘জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পঁচিশ বছর পূর্তি উদ্যাপন’।

এই দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ থেকে বলা হয়েছে, পৃথিবীর ৭০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ এখনো গ্রামে বাস করে এবং বেঁচে থাকার জন্য তারা প্রত্যক্ষভাবে জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীতে যে পরিমাণ জীববৈচিত্র্য বর্তমানে আছে, তার তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জীববৈচিত্র্যের ব্যবহার টেকসইভাবে হচ্ছে না। পৃথিবীব্যাপী অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। জীববৈচিত্র্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।

সিবিডি কার্যক্রমের শুরুর দিকে পৃথিবীব্যাপী জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যাপারে দৃশ্যমানভাবে তেমন অগ্রগতি হয়নি। সে কারণে ২০১০ সালে জাপানের আইসিতে সিবিডির সাধারণ সভায় (কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস-১০) ২০১১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত  ১০ বছর মেয়াদি পাঁচটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা হয়। লক্ষ্যগুলো হচ্ছে—১. জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ নির্ণয়; ২. জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রত্যক্ষ চাপ কমানো এবং তাদের টেকসই ব্যবহারকে উৎসাহিত করা; ৩. বাস্তুতান্ত্রিক প্রজাতি ও জেনেটিক বৈচিত্র্য রক্ষা করা; ৪. জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র থেকে সেবাগুলো সবার জন্য বৃদ্ধি করা; ৫. অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা, জ্ঞান ব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য সময়সীমাভিত্তিক (২০১১-২০ সাল) মোট ২০টি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।

বলা হচ্ছে, উল্লিখিত এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে বেশ কিছুটা অগ্রগতি হলেও ২০২০ সালের মধ্যে প্রত্যাশিতভাবে সব লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমাদের প্রচেষ্টাকে দ্বিগুণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে সিবিডির কার্যনির্বাহী সম্পাদক ড. ক্রিস্টিনা পাসকা পালমার বিশ্ববাসীকে সে বার্তাই দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সিবিডিতে স্বাক্ষর করেছে। দেশের জন্য জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনাও (এনবিএসএপি ২০১৬-২০) তৈরি করা হয়েছে এবং এর সংশোধিত কপি সিবিডিতে জমা দেওয়া হয়েছে।  সিবিডির লক্ষ্য অর্জনে এনবিএসএপিএ বর্ণিত বাংলাদেশের অগ্রগতিগুলো হচ্ছে—১. জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা তৈরি; ২. দেশে সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ বৃদ্ধি; ৩. উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের তালিকা প্রণয়ন; ৪. রেড লিস্ট প্রজাতিগুলোর তালিকা হালনাগাদ করা; ৫. সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ।

সন্দেহ নেই, সিবিডির লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জীববৈচিত্র্য রক্ষা আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন। প্রকৃতপক্ষে উপরোক্ত পাঁচটি ক্ষেত্রের মধ্যে ৩ ও ৪ নম্বর ছাড়া বাকি তিনটি ক্ষেত্রের অগ্রগতি অবশ্যই প্রশংসনীয়। ৩ নম্বরে উল্লিখিত ‘উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের তালিকা প্রণয়ন’ ও ৪ নম্বরে ‘রেড লিস্ট প্রজাতিগুলোর তালিকা হালনাগাদ করা’—এই দুটি বিষয়ে দীর্ঘ গবেষণা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে সন্তোষজনক একটি জায়গায় যাওয়া সম্ভব।

এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ২৮টি ভলিউমে বাংলাদেশে রেকর্ডকৃত ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস, উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের তালিকায় উদ্ভিদ ও মেরুদণ্ডী প্রাণিদের প্রজাতি তালিকা সন্তোষজনক হলেও জীববৈচিত্র্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ সদস্য বিশেষ করে যারা অমেরুদণ্ডী—তারা কিন্তু ও তালিকায় নেই। অথচ বাস্তুতান্ত্রিক সেবা বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদনে, মাটির উর্বরতা রক্ষায়, পানি বিশুদ্ধকরণ তথা পরিবেশ রক্ষায় এদের ভূমিকা অপরিসীম। এ ছাড়া অমেরুদণ্ডীদের যে তালিকা সেখানে দেওয়া হয়েছে তারা সত্যি সত্যি বাংলাদেশে এখন আছে কি না তা যাচাই করা হয়নি। রেড লিস্ট প্রজাতিগুলোর মধ্যে প্রজাপতি ছাড়া অমেরুদণ্ডী অন্য কোনো প্রাণী গ্রুপ সেখানে অন্তর্ভুক্ত নেই। কাজেই বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে নির্বাহ করতে হলে আমাদের জীববৈচিত্র্যকে চিনতে ও জানতে হবে। এ এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার বিষয়। কিন্তু পরিকল্পনামাফিক শুরু করা তো প্রয়োজন। তা না হলে গ্রুপভিত্তিক বিশেষজ্ঞ তৈরি হবে কিভাবে?

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ে আমাদের দেশে সচেতনতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নয়। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বলতে অনেকে শুধু ‘গাছপালা জীবজন্তু ধরা যাবে না’ কিংবা ‘ছোঁয়া যাবে না’ বুঝে থাকেন। আসলে  ‘কনজারভেশন বায়োলজি’ শাখায় ‘কনজারভেশন’ বলতে উদ্ভিদ, প্রাণী বা জীবের প্রয়োজন অনুসারে চাষবাসও বোঝানো হয়। যেমন—হাঁস-মুরগি, মাছ, শস্য চাষ ইত্যাদি। রুই, কাতলা মাছ যদি চাষ করা না হতো, তাহলে  সেগুলোও কিন্তু অন্য অনেক মাছের মতো প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেত।

পরিবেশবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ এবং বিখ্যাত লেখক ড. ডোনেলা মিডোজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য শুধু বেছে বেছে কয়েকটা প্রাণী কিংবা উদ্ভিদ প্রজাতির পরিচর্যা কার্যকর কোনো ফল বয়ে আনবে না। প্রকৃতপক্ষে গোটা জীবগোষ্ঠীকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের নিরুপদ্রব জীবনযাপন করতে দিলেই জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।’ ঠিক একই ধরনের কথা বলেছেন বিখ্যাত মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও প্রকৃতিবিজ্ঞানী স্যার ডেভিড ফেডরিক অ্যাটেনবরো। তিনি বলেছেন, ‘শুধু কয়েকটি তারকা প্রজাতি রক্ষা করলেই জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে না। জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন সব প্রকার জীবপ্রজাতি রক্ষার ব্যাপারে সমানভাবে গুরুত্ব প্রদান।’ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণবিষয়ক কর্মকাণ্ডে বেছে বেছে বড় বড় কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকৃতপক্ষে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন একটি হলিস্টিক বা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। আর তা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই করা প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
(কালের কণ্ঠ থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন