মাতালের গোয়াল দর্শন

অরুণ কুমার বিশ্বাস

মাতাল বলে মাতাল! যাকে বলে একেবারে পাঁড় মাতাল। মাতালের নাম মদন, মদের গন্ধ পেলেই উদ্ভাসিত হয় তার বদন। এহেন মাতাল কখনো শুকনো মুখে থাকতে পারে না। আর যখন কারণবারিতে সে ঢুলুঢুলু, মাতালের এক পা তখন পাতালে, আর মুণ্ডুখানা থাকে গগনে, মানে তার নগদানগদি আসমান দর্শন হয়।

মাতাল মদন কিন্তু নিজেকে কখনো মদ্যপ বলে মানতে চায় না। তার মতো বিদ্বান ও বুদ্ধিমান মানুষ নাকি ভূ-ভারতে আর একটাও নেই। প্রশ্নফাঁস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সে বলে, আরে ভায়া, প্রশ্ন না পেলে পোলাপান লিখবে কী করে! প্রশ্ন ছাড়া কি পরীক্ষা হয়? টাইম ইজ মানি। তাই ওরা মিছে সময় নষ্ট না করে নিজ উদ্যোগে একটু আগেভাগে প্রশ্ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করে। তাতে দোষটা কোথায় বলো তো! মাতাল মদনের আপসোস! ইস্ তার যদি এমন উদ্যোগী বাপ-মা বা অভিভাবক থাকত! যারা কিনা রাত জেগে হায়েনার মতো হন্যে হয়ে ছেলেমেয়ের জন্য প্রশ্নপত্র খুঁজে আনে! এক তুড়িতে ওদের অদূর ভবিষ্যত্ একেবারে ঝরঝরে করে দেয়!

দেখো তো কী ভয়ানক অবিচার! আমি মদন টুকটাক গিললে তাতে দোষ, আর বাবুবিবিরা যে ক্লাবে-আড্ডায় গিয়ে গ্যালন কে গ্যালন গেলে, তাতে বুঝি কোনো দোষ নেই! আবার দ্যাখো, আইনের চোখে নাকি সব সমান। আইনের যদি চোখই থাকবে, তাহলে সেই নারীমূর্তির চোখ বাঁধা কেন থাকবে! তাহলে রাজা-উজির আর সাধারণ প্রজাদের সে চিনবে কী করে! হাজার হোক, রাজাগজা বলে কথা। তাকে তো আর নগণ্য খচ্চরের মতো গোয়ালে রাখা যায় না, ব্যাংক লুট করে তারা দিব্যি ডিভিশন পায়, মানুষ খুন করে জেলে বসে এসির হাওয়া খায়, মিছে অসুখের কথা বলে নামি হাসপাতালের দামি কেবিনে বসে ঠ্যাঙ নাচায়। আর মরতে মরণ সানাইঅলার, মানে যারা লোকের পকেট কেটে দুচারটে টাকা কামাই করে। ব্যাংক-লুটেরারা দিব্যি ভালো থাকে।

মদন মাতাল, তাই বলে বোকা নয় কিন্তু। দেশে কী চলছে এখন, সে বেশ খোঁজ রাখে। সে এও জানে, জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারকাজে শ্লথ গতি মানেই পাবলিকের বিচারিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা।

উন্নয়ন কি কেবল টাকাকড়ি দিয়ে হয় বলো! মনে সুখ চাই। সুখের আম্মাজান তো মারা গেছে সেই কবেই! বিশ্বাস আর কাকে করবে তুমি! দুটো টাকা হলে রাখবে কোথায় শুনি! মাটির ব্যাংকে! কারো কাছেই মেয়ে এখন নিরাপদ নয়। প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে কুবন্ধু সহযোগে সম্ভ্রম লুটছে প্রেমিক। ইদানীং আবার শুনছি এক মেয়ে নাকি তার ভালোবাসার মানুষটিকে অ্যাসিড ছুড়েছে। কারণ সে মেয়েটির প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। কে কাকে সাড়া দেয় বলো। বিরোধীরা এখন আলোচনার কথা বলে মেলা হাঁকডাক পাড়ছে। কিন্তু গদিনসীনরা কি তাতে সাড়া দিচ্ছে! সময়ে কোকিল না ডাকলে বিগত বসন্তে কোকিলের ডাক শুনতে চেয়ে লাভ নেই! তখন তো তা কাউয়া’র কা-কা’র মতো শোনাবে।

কী বুঝলেন! মদন মাতাল হতে পারে, তাই বলে বেকুব নয়। তারও মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়, যখন দেখে খেয়েপরে আর সুখ নেই। যা খাবে তাতেই ভেজাল, আবার দামেও বাড়তি। এবার ঈদে নাকি জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না। মানে সেই পাগলের সাঁকো নাড়ানোর মতো ব্যাপার। ঈদ আসছে। মেলা মুনাফা কামাবার প্রস্তুতি নাও। কাটবে তো পাবলিকের গাঁট, কার বাপের কী!

মদনের মন ভীষণ খারাপ। মানুষ ক্রমশ কেমন নৃশংস হয়ে উঠছে। যা নয় তাই করে বসছে। মারবি মার, দুচারটা চড়-থাপ্পড় দে। তা নয়, কাকুকে ধরে একেবারে চাকু-ফাকু চালিয়ে দিচ্ছে! মেরেও ক্ষান্ত হয় না ওরা, লাশের সঙ্গে বালির বস্তা বেঁধে ডুবিয়ে দিচ্ছে পানিতে। যাতে তার প্রিয়জনেরা লাশের হদিস অব্দি না পায়। দাফন-কাফন তো দূর কি বাত্!

যাদের দেখার কথা, তারা যেন দেখেও দেখছে না। শুধু ঢুলছে। কী খেয়েছে কে জানে! একফালি কাপড়, কতদিক ঢাকবে বলুন তো! যতটুকু সময় তার গলা সিক্ত থাকে কারণবারিতে, ততক্ষণ বেশ ভালো কাটে মদনের। দুনিয়াটাকে স্রেফ স্বর্গসদন বলে মনে হয়। চারদিকে শুধু রঙ আর সঙেদের খেলা চলছে যেন। কেউ দেদার খেলছে, আবার কেউ খুলছে সভ্যতার মুখোশ। মান-সম্মান বিকিয়ে দিয়ে বেআব্রু হয়ে পড়ছে যেন। তারচে মদনই ভালো। নাচতে নেমে ঘোমটা টানার কী দরকার! মানুষ নয়, বরং গরুর সঙ্গে সখ্য জুড়েই লাভ। গরু বড় নিরীহ প্রাণী। তুমি তাকে খেতে দিলেই সে দুধ দেয়। দুধ পুষ্টিকর খাদ্য। উপাদেয়ও বটে। কাঁচা ঘাস খাওয়ালে সে আরো বেশি দুধ দেয়। ব্যাংক-লুটেরাদের চেয়ে গাভী ভালো। সে কিছু দুধ যদিও বাছুরের জন্য বাঁচিয়ে রাখে, তবে পুরোটা লোপাট করে না। মদন তাই ঠিক করেছে, এখন থেকে আর অট্টালিকায় নয়, বরং গরুদের সঙ্গে গোয়ালে গিয়ে থাকবে। সেখানে মারামারি কাটাকাটি নেই, রাজনীতি নেই, নৃশংসতা নেই, আছে শুধু কাঁচা ঘাস, আর মশা তাড়াবার জন্য গরুর লেজ। মদনের অমনি ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। পরীক্ষার পাতা ভর্তি করে গরুর রচনা লেখা। মস্ত সুবিধে ছিল তখন। প্রশ্ন তো ফাঁস হতো না। মনে যা আসত তাই লিখত। গরু, ঘোড়া কিংবা ব্যাঙের রচনা। এখনকার ‘ওরা’ মানে ফাঁসুরেরা কি সেসব জানে! আহা, সেই সোনালি শৈশব! আবার যদি ফেরা যেত ছোট্টবেলার আমবাগানে! মদন সহসাই আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। আর আবেগে কে না মাতাল হয়!

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও রম্যলেখক

ইত্তেফাক থেকে সংগৃহীত

শেয়ার করুন