নবীজির মেরাজ

তরীকুল ইসলাম 

মেরাজ হয়েছিল এ কথা কোরআন, হাদিস এবং ইতিহাসের কিতাবে রয়েছে। মেরাজ প্রসঙ্গে কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি। যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ১)।

বোখারিসহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থের ভাষ্য মতে, এক রাতে রাসুল (সা.) কাবা শরিফের হাতিমে শুয়েছিলেন। এ সময় জিবরাইল (আ.) ও মিকাইল (আ.) এসে বললেন আমাদের সঙ্গে চলুন। নবী (সা.) কে বোরাক নামক এক বাহনে সওয়ার করানো হলো। বোরাক এক বেহেশতি বাহনের নাম, যা খচ্চর অপেক্ষা ছোট এবং গাধা অপেক্ষা বড়। যার চলার গতি এই পরিমাণ ছিল যে, যেখানে তার দৃষ্টি পড়ছিল, সেখানে তার পা পড়ছিল। এত দ্রুততার সঙ্গে প্রথমে তাঁকে ফিলিস্তিনের আল আকসা মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে আল্লাহ তায়ালা নবী (সা.) কে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য মোজেজা হিসেবে পূর্ববর্তী সব নবী-রাসুলকে সমবেত করে রেখেছিলেন। জিবরাঈল (আ.) এখানে পৌঁছার পর আজান দিলেন এবং নামাজের জন্য সব নবী-রাসুল কাতার বেঁধে দাঁড়ালেন; কিন্তু সবাই এই অপেক্ষা করছিলেন যে, নামাজ কে পড়াবে? জিবরাইল (আ.)  নবী (সা.) এর হাত ধরে আগে বাড়িয়ে দিলেন। নবীজি সব নবী-রাসুল এবং ফেরেশতাদের নামাজ পড়ালেন। এ পর্যন্ত ছিল পৃথিবীর দৃশ্যমান জগতের সফর যা বোরাকে সওয়ার হয়ে সম্পন্ন করানো হয়।
এরপর নবী (সা.) কে একের পর এক সবগুলো আকাশ ভ্রমণ করানো হয়। প্রথম আকাশে সাক্ষাৎ হয় আদম (আ.) এর সঙ্গে, দ্বিতীয় আকাশে ঈসা (আ.) এবং ইয়াহইয়া (আ.) এর সঙ্গে, তৃতীয় আকাশে ইউসুফ (আ.), ষষ্ঠ আকাশে মুসা (আ.) এবং সপ্তম আকাশে ইবরাহিম (আ.) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এর পর নবী (সা.) সিদরাতুল মুনতাহার দিকে অগ্রসর হন। পথে হাউসে কাওসার অতিক্রম করে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন। এখানে এসে তিনি আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি এমন সব বিস্ময়কর অপূর্ব সৃষ্টি প্রত্যক্ষ করেন, যা আজ পর্যন্ত কখনও কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান কখনও শোনেনি এবং কখনও কোনো মানুষের ধারণা ও কল্পনাও সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি।
এরপর নবীজি (সা.) এর সামনে জাহান্নাম এনে রাখা হলো, সব ধরনের আজাব এবং ভয়াবহ ও কঠিন আগুনে তা ভরপুর ছিল, যে আগুনে লোহা বা পাথরের মতো শক্ত এবং কঠিন কোনো বস্তুরও অস্তিত্ব বলতে কিছু থাকে না। এরপর নবী (সা.) আরও সামনে এগিয়ে যান; কিন্তু জিবরাইল (আ.) সামনে যাওয়ার অনুমতি না থাকায় দাঁড়িয়ে পড়েন। এই স্থানটিকে বলা হয় সিদরাতুল মুনতাহা। নবীজি (সা.) সামনে অগ্রসর হয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়ে উপনীত হন এবং আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সৌভাগ্য অর্জন করেন। নবী (সা.) এতই নিকটবর্তী হন যে, আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর মধ্যে ধনুক পরিমাণ ব্যবধান ছিল। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর নিকটবর্তী হলো ও ঝুলে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম।’ (সূরা নাজম : ৮-৯)।
এখানেই আল্লাহ নবীজি (সা.) কে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হিসেবে পালনের নির্দেশ দেন। এরপর নবী (সা.) বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন। সেখান থেকে বোরাকে আরোহণ করে মক্কা নগরীর দিকে রওয়ানা হয়ে যান এবং ভোর হওয়ার আগেই তিনি মক্কায় পৌঁছে যান। নবী (সা.) এর মেরাজের বিস্ময়কর ও বরকতময় সফর এখানেই সমাপ্তি ঘটে।

(সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া, আশরাফিয়া লাইব্রেরি, পৃষ্ঠা : ৪৯-৫০; সীরাতে মুস্তফা, ইদরীস কান্ধলভী, মদীনা পাবলিকেশন্স)।

শেয়ার করুন