গৌতম বুদ্ধের জীবনদর্শন ও বুদ্ধপূর্ণিমার তাৎপর্য

ড. দিলীপ কুমার বড়ুয়া

আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা। বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জীবনের তিনটি প্রধান ঘটনা, যথা—জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ তথা মৃত্যু বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল। তাই বৈশাখী পূর্ণিমা ‘বুদ্ধপূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত এবং বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কাছে দিনটির আবেদন অনন্যসাধারণ। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে কপিলাবস্তু রাজ্যের রাজা শুদ্ধোদনের ঔরসে রানি মহামায়ার গর্ভে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তবে রাজপ্রাসাদে নয়, তাঁর জন্ম হয়েছিল লুম্বিনী কাননে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে। তাঁর জন্মে দীর্ঘদিন সন্তানহীন পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের মনোবাসনা পূর্ণ বা সিদ্ধ হয়েছিল বিধায় তাঁর নাম রাখা হয় সিদ্ধার্থ। কিন্তু জন্মের সাত দিন পর তিনি মাতৃহারা হন। বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমীর পরিচর্যায় ও সস্নেহে লালিত-পালিত হন বিধায় তিনি সিদ্ধার্থ গৌতম নামে পরিচিতি লাভ করেন।

জন্মের পর তাঁকে একনজর দেখার জন্য রাজপ্রাসাদে জনতার ঢল নামে। হিমালয়ের গভীর অরণ্য থেকে এলেন ঋষি অসিত। তিনি শিশু রাজকুমারকে দেখে অভিভূত হয়ে প্রথমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তৎপর তাঁর দুই চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। ঋষির চোখে অশ্রু দেখে রাজা বিচলিত হয়ে বিনীতভাবে হর্ষবিষাদের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। উত্তরে ঋষি বলেন, ‘মহারাজ! এই কুমার মহাজ্ঞানী বুদ্ধ হবেন। জগতে দুঃখমুক্তির পথ প্রদর্শন করবেন। এ জন্য আমি উচ্ছ্বসিত হয়েছি। কিন্তু আমি বয়োবৃদ্ধ। তাঁর দুঃখমুক্তির অমিয়বাণী শোনার সৌভাগ্য আমার হবে না। তার আগেই আমার মৃত্যু হবে। এ জন্য মন বিষণ্ন, দুঃখভারাক্রান্ত।’ ঋষির ভবিষ্যদ্বাণী শুনে রাজার মন বিষণ্নতায় ছেয়ে যায়। একমাত্র পুত্র গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসী হবে, এই চিন্তায় রাজা সারা দিন অস্থির থাকতেন এবং দিনরাত রাজকীয় ভোগ-ঐশ্বর্যে পুত্রকে আবিষ্ট করে সংসারমুখী করার চেষ্টা করতেন। জন্মের পর থেকে রাজকীয় ঐতিহ্য অনুসারে রাজপুত্রের শিক্ষণীয় সব বিষয় তাঁকে শিক্ষাদান করা হয়। রাজকীয় রীতিনীতি ও ভোগ-ঐশ্বর্যে লালিত-পালিত হয়ে ক্রমেই তিনি শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পণ করেন। কিন্তু রাজা লক্ষ করলেন, যতই দিন যাচ্ছে রাজকুমার ততই উদাসীন হয়ে যাচ্ছেন এবং গভীর চিন্তায় মগ্ন হচ্ছেন। রাজকুমারকে রাজকীয় ভোগবিলাসে মত্ত ও সংসার ধর্মে আবদ্ধ রাখার অভিপ্রায়ে রাজা সব ধরনের প্রযত্ন করলেন। এমনকি রূপবতী নারীর সঙ্গে তাঁকে বিবাহ বন্ধনেও আবদ্ধ করালেন। কিন্তু জগতের কোনো ধরনের রূপরস তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারল না। কিভাবে মানুষকে ক্রমবর্ধমান দুঃখের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি দেওয়া যায় সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অর্থাৎ জগতের দুঃখের কারণ অনুসন্ধানে তিনি ২৯ বছর বয়সে প্রাণপ্রিয় স্ত্রী-পুত্র, পিতা-মাতা, আত্মীয়-পরিজন এবং রাজসিংহাসনের মায়া বিসর্জন দিয়ে গৃহত্যাগপূর্বক সন্ন্যাস জীবন অবলম্বন করেন।

সুদীর্ঘ ছয় বছর কঠোর সাধনায় তিনি ৩৬ বছর বয়সে আর এক বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষের নিচে লাভ করেন বোধিজ্ঞান, জগতে খ্যাত হন ‘বুদ্ধ’ নামে। জন্মের ন্যায় তাঁর বোধিপ্রাপ্তিও ঘটেছিল প্রকৃতির সান্নিধ্যে। বোধিজ্ঞান লাভের মধ্য দিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন জগতের প্রকৃত স্বরূপ ‘দুঃখময়তা’। তিনি আবিষ্কার করলেন জগতে দুঃখ যেমন আছে, তেমনি দুঃখের কারণ আছে, দুঃখের নিরোধ আছে এবং দুঃখ নিরোধের উপায়ও আছে। তিনি দুঃখের স্বরূপ বিভাজন করে ঘোষণা করলেন, পৃথিবীর সব মানুষ নানাভাবে আট ধরনের দুঃখ ভোগ করে। তা হচ্ছে :  জন্মগ্রহণ করলেই দুঃখ ভোগ করতে হয়, জরার কারণে দুঃখ ভোগ করতে হয়, ব্যাধির কারণে দুঃখ ভোগ করতে হয়, মৃত্যুজাত দুঃখ ভোগ করতে হয়, অপ্রিয় সংযোগের কারণে দুঃখ ভোগ করতে হয়, প্রিয় বিচ্ছেদের কারণে দুঃখ ভোগ করতে হয়, কাঙ্ক্ষিত বস্তুর অপ্রাপ্তির কারণে দুঃখ ভোগ করতে এবং দেহজনিত দুঃখ ভোগ করতে হয়। রক্ত-মাংসের দেহধারী মানুষ অবশ্যই এই আট প্রকার দুঃখ কোনো না কোনোভাবে ভোগ করে। দুঃখের ব্যবচ্ছেদের পাশাপাশি তিনি দুঃখের কারণও ঘোষণা করলেন। তিনি মানবজাতির দুঃখ ভোগের পেছনে ১২ ধরনের কারণ নির্দেশ করেন। এই ১২টি কারণ বৌদ্ধ সাহিত্যে দ্বাদশ নিদান, ভবচক্র বা প্রতীত্যসমুত্পাদতত্ত্ব নামে পরিচিত। এ তত্ত্বমতে, দুঃখ সৃষ্টি হয় জরা-মরণ-ব্যাধি-শোক থেকে, জরা-মরণ-ব্যাধি-শোক সৃষ্টি হয় জন্মের কারণে, জন্ম হয় বাসনার কারণে, বাসনা সৃষ্টি হয় জাগতিক বস্তুর প্রতি আসক্তির কারণে, আসক্তি সৃষ্টি হয় তৃষ্ণা থেকে, তৃষ্ণা সৃষ্টি হয় বেদনা বা অনুভূতি থেকে, অনুভূতি সৃষ্টি হয় স্পর্শ বা ছোঁয়া থেকে, স্পর্শ সৃষ্টি হয় ষড়ায়তনের (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক ও মন) কারণে, ষড়ায়তনের কারণ হচ্ছে নামরূপ (নাম হচ্ছে মানসিক অংশ, রূপ হচ্ছে কায়িক অংশ), নামরূপ সৃষ্টির কারণ হচ্ছে চেতনা বা বিজ্ঞান, চেতনা বা বিজ্ঞান সৃষ্টি হয় সংস্কার থেকে, সংস্কার সৃষ্টি হয় অবিদ্যা থেকে। এককথায় বলা যায়, অবিদ্যা বা অজ্ঞতাই দুঃখের মূল কারণ।

ব্যক্তিস্বাধীনতা বা আত্মশক্তির প্রাধান্য সম্ভবত প্রাচ্যের দর্শনে বুদ্ধই প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন। ‘অতিপ্রাকৃত সত্তা বা ঈশ্বরের সাহায্য ছাড়া মানুষ তার কর্মের মাধ্যমে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে’—এ ঘোষণার মাধ্যমে তিনি মানুষের মর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন, মানুষকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে মানবতার জয়গান গেয়ে গেছেন। মানুষের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা, মানুষকে পরস্পরের মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ করাই ছিল তাঁর সংগ্রামের মূল অভীপ্সা। সামাজিক মর্যদা নির্ধারণে তিনি জন্ম নয়, কর্মকেই প্রাধান্য দেন। কর্মকেই তিনি মানুষের সামাজিক অবস্থান পরিমাপের একক হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁকে বলতে দেখি, ‘জন্মের দ্বারা কেউ চণ্ডাল হয় না, কর্মের দ্বারাই চণ্ডাল হয়। সমগ্র ত্রিপিটক অধ্যয়ন করলেও বৌদ্ধ হওয়া যায় না, যদি না তাঁর নৈতিক চরিত্রের দৃঢ়তা থাকে। তিনিই প্রকৃত বৌদ্ধ, যাঁর চিত্ত বিশুদ্ধ, নৈতিকতায় প্রোজ্জ্বল, লোভ-দ্বেষ-মোহমুক্ত এবং প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত।’

চিন্তার স্বাধীনতা ও নৈতিকতা বুদ্ধের দর্শনের অনন্য দিক। বুদ্ধ মানুষকে কোনো ধরনের বন্ধনে আবদ্ধ করেননি, কখনো বিশ্বাসরূপী শৃঙ্খল দ্বারা বাঁধেননি এবং মুক্তিদাতা হিসেবেও নিজেকে উপস্থাপন করেননি। তিনি আরাধনা, প্রথাগত বিশ্বাস ও আচারের চেয়ে মানুষের বুদ্ধি, বিবেক ও বোধকে প্রাধান্য দেন।

মৈত্রী করুণা বা ভালোবাসা প্রদর্শন বুদ্ধের জীবন-দর্শনের প্রকৃষ্ট দিক। তাঁর ধর্মের আবেদন : সব প্রাণী সুখী হোক, শত্রুহীন হোক, হিংসামুক্ত থাকুক, সুখে কাল যাপন করুক, প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হোক। তাবৎ বিশ্বের সব প্রাণীর প্রতি বুদ্ধের এই মমত্ববোধ অবহেলিত, বঞ্চিত ও উপেক্ষিত মানুষের মনে এক গভীর আবেদন সৃষ্টি করে, তাদের স্বীয় অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে এবং মৈত্রীপরায়ণ হতে উদ্বুদ্ধ করে। বুদ্ধ জগৎ জয় অপেক্ষা আত্ম জয়কে শ্রেষ্ঠ জয় বলে অভিহিত করেছেন। তাই তিনি হিংসাকে অহিংসা দিয়ে, শত্রুকে মৈত্রী দিয়ে জয় করার উপদেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে, হিংসাত্মক মনোভাব মানুষকে উত্তরোত্তর সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। এই শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা দিবসে আমাদের প্রত্যাশা : ‘শান্তিতে ভরে উঠুক বিশ্ব; বিশ্বের সব মানুষ মানবিক অধিকার নিয়ে সুখে থাকুক। সুখে থাকুক সব প্রাণী।’

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান

পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন