আমাদের শিক্ষক নিয়োগ, নীতি ও আমরা

গোলাম কবির

রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যজগতের কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বিশ্বসমাজের মানবভাবনার মাঝে নিজেকে একাত্ম করেছিলেন। সমাজের যাবতীয় বিষয়ের প্রতি তাঁর তীক্ষ পর্যবেক্ষণ ছিল। তিনি দেশীয় শিক্ষার উন্নয়নের জন্য নিজে কর্ম সম্পাদন করে দেখিয়ে যেতে চেয়েছিলেন শিক্ষক ও শিক্ষার স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত। ১৯১২ সালে ইউরোপ যাত্রার সময় এবং সেখানে অবস্থানের দিনগুলোতে তাঁর চেতনায় যেসব ভাবনা উদিত হয়, সেগুলোকে ‘পথের সঞ্চয়’ গ্রন্থে মুদ্রিত করেন। এ গ্রন্থে ‘ইংলন্ডে পল্লীগ্রাম ও পাদ্রি’ রচনার প্রথমে যে বোধটুকু অঙ্কিত হয়েছে তা আজকের দিনের শিক্ষক ও শিক্ষা সম্পর্কেও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন,  ‘সকল সময়েই মানুষ যে নিজের যোগ্যতা বিচার করিয়া বৃত্তি অবলম্বন করিবার সুযোগ পায় তাহা নহে, সেই জন্য পৃথিবীতে কর্মরথের চাকা এমন কঠোর স্বরে আর্তনাদ করিতে করিতে চলে। যে মানুষের মুদির দোকান খোলা উচিত ছিল সে ইস্কুল-মাস্টারি করে…।’ রবীন্দ্রনাথের এই কঠিন সত্য উপলব্ধিকে আমরা আমলে আনিনি বলে আমাদের শিক্ষার এই বেহাল।

বহু পুরনো একটি কথা এখনো প্রচলিত, শিক্ষক তৈরি করা যায় না; প্রকৃত শিক্ষক, শিক্ষক হয়েই জন্মান। এ সত্য রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধিতে ছিল। শিক্ষক সম্পর্কে তাঁর ছেলেবেলার অভিজ্ঞতা অবিমিশ্র মধুর ছিল না। জাত শিক্ষকের সন্ধানে তিনি আমৃত্যু ব্যাপৃত থেকেছেন। শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতা করেছেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতার সুযোগ তাঁর হয়েছে। ইউরোপের প্রখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের দুর্ভাগা দেশের শিক্ষক নামের কিছু শিক্ষাব্যবসায়ী ব্যক্তির কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে উদ্ধৃত উক্তিটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের এখনকার শিক্ষা ও শিক্ষকতার ভয়াবহ অবস্থা দেখে যাওয়ার দুর্ভাগ্য তাঁর হয়নি। হলে হয়তো নির্বাক হয়ে যেতেন।

পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর জামাতা কুঞ্জলাল ঘোষকে রবীন্দ্রনাথ জাত শিক্ষকের আসনে অধিষ্ঠিত করতে কুণ্ঠিত ছিলেন। অথচ ভবঘুরে ইংরেজ যুবক লরেন্সের সযত্নে শিক্ষাদানের কর্মপদ্ধতিতে চমত্কৃত হয়ে শিলাইদহের গৃহবিদ্যালয়ে তাঁকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। অমৃতসরের তরুণ জিয়াউদ্দিন তাঁর মনোনীত শিক্ষকদের অন্যতম। তাঁর অকালপ্রয়াণে কবি ব্যথিত চিত্তে একটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন, ‘নবজাতক’ কাব্যে যার স্থান হয়েছে। ১৯২২ সালের ১২ মে রবীন্দ্রনাথ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বিশ্বভারতী সংসদের সদস্য হিসেবে বরণ করার জন্য পত্রে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমরা কিছু শিক্ষক ও শিক্ষাবিদের নাম উচ্চারণ করলাম এ উদ্দেশ্যে যে রবীন্দ্রনাথ যথার্থ শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে ভেদবুদ্ধির গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেননি, কিংবা সুপারিশের ভিত্তিতে জীবন জগতের কঠিন দায়িত্ব শিক্ষকতায় প্রবেশের সুযোগ দেননি। নানাভাবে আমরা তাঁর বিপরীতে চলছি।

আমাদের দেশের শিক্ষক ও শিক্ষার প্রতি যাঁরা নজর রাখছেন তাঁরা লক্ষ করছেন, কী ভয়াবহ অবস্থা শুদ্ধ শিক্ষাকে লুপ্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত। তখনকার দিনে কিছু উন্নাসিক ব্যক্তি শিক্ষার নিবেদিতপ্রাণ মানুষের ব্রতকে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, সমাজের সবচেয়ে ‘ওঁচা’ পদ মনে করতেন। জনান্তিকে বলে রাখা ভালো, আমরা বোধকরি সেই পথে ধাবিত হচ্ছি। দেখা যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মেধার সনদধারীদের জন্য শিক্ষা ক্যাডার নির্ধারিত হয়েছে। (১৯৭৫ সালের আগে এমনটি ছিল না।) এখানেই শেষ নয়, সরকারীকরণের প্লাবনে শিক্ষাকে ভাসিয়ে দেওয়ার মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে গত শতকের শেষের দিক থেকে। যার গতি বিরামহীন।

প্রমথ চৌধুরী মনে করতেন জ্ঞানে বড় না হলে ধনে বড় হওয়া যায় না। এ সত্য আমরা বুঝতে রাজি নই। যাঁরা সরকার পরিচালনায় আসেন। তাঁরা দেশের কল্যাণ করার জন্য প্রচেষ্টা চালাবেন। এটা স্বতঃসিদ্ধ। তাই বলে শিক্ষা এবং শিক্ষকতার মতো জাতির ভবিষ্যৎ সৃষ্টির অবলম্বনকে ক্ষমতায় যাওয়ার সোপান হিসেবে ব্যবহার করলে সর্বনাশের ষোলোকলা পূর্ণ হওয়ার বাকি থাকে কি? তাঁদের নীতিনির্ধারকরা হয়তো ভাবেন, সমাজের ‘ওঁচা’ পদে শিক্ষকরাই থাকুক না কেন! (রবীন্দ্রনাথ বড় দুঃখে ও বেদনায় আক্ষেপের সুরে শিক্ষকতা পেশা সম্পর্কে ওই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।) তাই বিভিন্ন ধরনের কোটা দিয়ে আর খতিয়ে না দেখে সরকারীকরণ করে শিক্ষকতাকে সুলভ প্রাপ্তির বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে।

উনিশ শতকে সরকারিভাবে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলেও তা আজকের দিনের মতো শিক্ষকতার ব্রতকে ক্যাডারের তলানিভুক্ত করা হয়নি। আমাদের মেধাবী সন্তানরা অন্যান্য ক্যাডারের ক্ষমতা, মর্যাদা এবং অলিখিত কিছু সুবিধা প্রাপ্তির জন্য বেশি ধাবিত হচ্ছে। এই প্রবণতায় বাঁধ তৈরি করতে হলে শিক্ষকদের যথাযোগ্য মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। তা ছাড়া যত্রতত্র সরকারীকরণ এবং নানা কিসিমের কোটায় শিক্ষকতার পেশায় নিয়োগ পরিহার করতে হবে।

সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে কোনো মানুষের অবদানের অবশ্যই মূল্য দিতে হবে। তাই বলে শিক্ষকের নিয়োগ পোষ্য কিংবা অন্যান্য কোটায় নয়। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা এই কোটার কারণে অনেকটা ধ্বংসোন্মুখ। পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সর্বত্রই যদি কোটার খেলা চলতে থাকে এবং সরকারীকরণের হিড়িক বন্ধ না হয়, তবে ভবিষ্যতে মেধাবীরা শিক্ষকতায় বাধ্য না হলে আসতে চাইবে না। তখন আমাদের হয়তো রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মুদির দোকান’ খোলা ব্যক্তিদের দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হবে। যার অনিবার্য ফল জাতিকে পেছনের পানে নিয়ে যাবে।

রবীন্দ্রনাথ শিক্ষক নির্বাচনের ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন বলে তাঁর বিশ্বভারতী বিশ্বপরিচিতি পেয়েছে।

শিক্ষকতার বিষয়টিকে আমরা সুলভ প্রাপ্তির বিষয় হিসেবে গণ্য করায় আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্বমানের হয়ে উঠছে না বলে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

(কালেরকণ্ঠ অনলাইন থেকে সংগ্রহীত)

শেয়ার করুন