অটিজম :কী, কেন এবং করণীয়

ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া 

কোনো পরিবারে যদি প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হয়; তাহলে বাবা-মা’র প্রথম প্রশ্নটাই হলো-এমন কেন হলো? ‘কেন’ এই প্রশ্নটা অন্য দশজন মানুষের কাছে যতোটা সহজাত, ততোটা সহজাত নয় সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া একজন প্রতিবন্ধী শিশুর মা-বাবার কাছে। এই ছোট্ট প্রশ্ন বুকের গহীনে ঝড় তুলে যায়। কখনো উত্তর মেলে আবার কখনো নিরুত্তর থেকে যায় জীবন অবধি! পৃথিবীর পরিপূর্ণ রূপ-রস না বুঝার আগেই এই জীবনের সাথে যখন জড়িয়ে ছিল আমারও ‘প্রতিবন্ধিতা’, তখন না বুঝলেও এখন বুঝি এই প্রশ্নের পরিধি ও গভীরতা কত! এ পর্যায়ে পাঠকদের তৃষ্ণা নিবারণে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘অটিজম’ কী এবং  কেন হয় এবং এক্ষেত্রে করণীয় কী এই বিষয়ে কিছুটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব।

অটিজম কয়েক ধরনের, যেমন- অ্যাসপারগার সিনড্রোম, পারভেসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, রেট সিনড্রোম এবং চাইল্ডহুড ডিসইন্ট্রিগ্রেটিভ ডিজঅর্ডার। অটিজমগুলো সাধারণ অন্যসব রোগের মত রক্ত পরীক্ষা, ব্রেন স্ক্যান, ইইজি, বুদ্ধির পরীক্ষা বা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের সাহায্যে এই অবস্থাগুলো নির্ণয় করা যায় না। শুধুমাত্র রেট সিনড্রোম ধরনের অটিজম হলো ব্যতিক্রম; যেটি একটি বিশেষ জিন পরীক্ষা করে নির্ণয় করা যায়। এক এক ধরনের অটিজমে আক্রান্ত শিশুর এক এক ধরনের আচরণ পরিলক্ষিত হয় এবং অটিজম মাত্রারও ভিন্নতা রয়েছে। যেমন: মৃদু, মাঝারি ও চরম মাত্রার অটিজম। তবে যে কোনো ধরনের অটিস্টিক শিশুর তিনটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে, যথা: এক. সামাজিকভাবে ভাষা ব্যবহার করা বা অন্যের ভাষা বুঝতে পারার ত্রুটি বা অভাব; দুই. সামাজিক বন্ধন তৈরিতে ঘাটতি বা অভাব, অথবা পারস্পরিক সামাজিক আদান-প্রদানে অসক্ষম হওয়া। এবং তিন. প্রতীকী  খেলার ঘাটতি এবং একই কাজ বার বার করার প্রবণতা।

১৯৬৭ সালে বেটেলহাইম ‘দ্য এম্পটি ফোট্রেস: ইনফ্যান্টাইল অটিজম অ্যান্ড দ্য বার্থ অব দ্য সেলফ’ বইয়ে অটিজম শিশুর জন্ম হওয়ার কারণ উল্লেখ উদঘাটন করতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে শিশুর হূদয়ানুভূতির বিচ্ছিন্নতাকে দায়ী করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বরফের মতো উষ্ণতাহীন, কঠিন, ভাবাবেগবর্জিত মায়ের মনই শিশুর অটিজমের জন্য দায়ী। তবে বর্তমানে অটিজমের কারণ হিসেবে ইংরেজ মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক মাইকেল রাটার-এর একমাত্র জিনজনিত তত্ত্ব ছাড়া অন্য কোনো তত্ত্ব এখনো প্রমাণিত হয়নি। তাছাড়া বেশি বয়সে বাবা-মা সন্তান নিলে শিশু প্রতিবন্ধী হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে অটিজম শিশুও হতে পারে।

শিশু অটিস্টিক হলে আমরা প্রায়শ ডাক্তারের কাছে যাই। এ কথা নির্মম হলেও সত্য সাধারণত কোনো ধরনের টেস্ট করে ওষুধ খাইয়ে অটিস্টিক শিশু ভালো করা যায় না। হয়তোবা কোনো কোনো লক্ষণ অন্য কোনো উপায়ে সহনশীল মাত্রায় রাখা যায়। গত ষাট বছরে নানাবিধ চিকিত্সা চালু হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেউ কেউ এর সুফলও পেয়েছেন এরকম কয়েকটি বিকল্প ধরনের চিকিত্সা পদ্ধতির নাম এখানে অবতারণা করছি। যেমন: মিউজিক থেরাপি, সোশ্যাল স্টোরিস (গল্পের মাধ্যমে সামাজিক আচার-ব্যবহার সম্বন্ধে এবং শিশুকে দৈনন্দিন যে সমস্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় সেগুলো সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়া), সান-রাইজ প্রোগ্রাম (সানরাইজ প্রোগ্রামের মূল নীতি হলো- অটিস্টিক শিশুকে তার নিজের শর্তে সে যেমন সেভাবেই তাকে ভালোবেসে গ্রহণ করা এবং তার অস্তিত্বের স্তরে নেমে এসে তার জগতের অংশ হওয়া। বিশেষ করে অটিস্টিক শিশুর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে খেলার মাধ্যমে তাকে সামাজিকতা এবং ভাবের আদান-প্রদান শেখানোর উপর জোর দেওয়া, মাসাজ বা মালিশ বিশেষ আকুপ্রেসারের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাছাড়া নানারকম ভিটামিন, খাদ্যকণিকা, ফ্যাটি অ্যাসিড ইত্যাদির সাহায্যেও অটিজমের কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত অটিজম বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সুনীতি চক্রবর্তী (বর্তমানে ইংল্যান্ডে সিটিজেন) তাঁর অটিজম বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ভিটামিন বি সিক্স; যার অন্য নাম হলো পিরিডক্সিন এবং ম্যাগনেশিয়ামের সাহায্যে অটিজমের চিকিত্সা করা যায়। তবে  বিজ্ঞানসম্মত তত্ত্বাবধান ছাড়া এ ধরনের চিকিত্সা শিশুদের জন্য করা ঠিক নয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

লেখক : গবেষক ও প্রতিষ্ঠাতা, মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন

mahbuburrahman77@gmail.com

(ইত্তেফাক থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন