হাওরের পানি কি আশীর্বাদ না অভিশাপ?

আজ বিশ্ব পানি দিবস

কাসমির রেজাঃবছরের ছয় মাস পানি বেষ্টিত হাওর অঞ্চল বাকি ছয় মাস হয়ে উঠে সবুজ ধান ক্ষেত কিংবা চারণভূমি। যেই পানির উপর নির্ভর করে হাওরবাসীর জীবন ও জীবিকা, সেই পানির ভয়েই বছরের একটা সময় তাদের ঘুম আসে না। যেই পানিকে হাওরে প্রবেশে বাধা দিতে সরকার শতকোটি টাকা ব্যয় করে বাঁধ নির্মাণ করে সেই হাওরের পানি থেকেই সরকার পায় শতকোটি টাকার রাজস্ব। যেই পানিতে মাছ শিকার করা তাদের প্রধান পেশা, সেই পানিই কখনো দানব হয়ে তছনছ করে সোনার ফসল।

জলাবদ্ধতার কারণে হাওর থেকে দেরিতে পানি নামছে। অন্যদিকে অকাল বন্যার সময়টা আরও এগিয়ে আসার কারণে হাওরে ধান উৎপাদনের সময় কমে আসছে। তাই শুধুমাত্র ধানের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা হাওরবাসীর জন্য ক্রমেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য মাছের দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে।

হাওরে মাছের উৎপাদন কয়েকগুণ কমার পরও বর্তমানে দেশের মিঠা পানির মাছের এক তৃতীয়াংশ উৎপাদিত হয় হাওরে। কার্যকর গবেষণা ও সুষ্টু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাছের উৎপাদনে বিপ্লব ঘটনো সম্ভব।  মৎস উৎপাদনে এই বিপ্লব ঘটাতে পারলে মাছের উৎপাদন ৫/৬ গুণ বাড়ানো সম্ভব। এতে হাওরের পরিবারগুলোর আয় রোজগার যেমন বাড়বে তেমনি তা দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ও বাড়িয়ে দিবে। হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রতিটি হাওরে মৎস অভয়াশ্রম গড়ে তোলা দরকার। হাওরে মৎস হ্যাচারি ও মৎস গবেষণাগার স্থাপন করতে হবে।

হাওরগুলো ইজারা দেওয়ার কারণে হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়লে মূলত ইজারাদাররাই উপকৃত হন। সাধারণ জেলেরা খুব বেশি উপকৃত হন না। কিন্তু নীতিমালা মেনে প্রকৃত মৎসজীবীদের ইজারা দিলে সাধারণ জেলেরা উপকৃত হবে। এজন্য জলমহাল নীতিমালা ২০০৯ এ কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। ইজারামূল্য কম না হলে এবিং জেলেদের কম সুদে ঋণ না দিলে প্রকৃত মৎসজীবীরা ইজারা পাবে না। সাধারণ জেলেরা হাওরের পানি থেকে উপকারও পাবে না।

হাওরের জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার আট ভাগের এক ভাগ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অনেক বড় অংশই বেকার ও অদক্ষ শ্রমিক। তাদের কাজে লাগানোর জন্য তাদের মৎস উৎপদান, বিপণন বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এটিও দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

প্রতিবছর হাওরে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয় তা দিয়ে সারা দেশের মানুষকে তিন মাস খাওয়ানো যায়। কয়েক বছর খাদ্যে উদ্ধৃত থাকার পর গতবছর হাওরে ফসলহানীর কারণে আমাদের বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হয়েছিল। নদী খনন করে সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাওরের ফসল সুরক্ষা করতে পারলে অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকার ফসল প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়।

হাওরে ধানের ফলন নিশ্চিত করতে চাইলে হাওরাঞ্চলের নদীগুলো ক্যাপিটাল ড্রেজিং এর আওতায় এনে ব্যাপকভিত্তিক নদী খনন করতে হবে। শুধু নদী খনন করলেই হবে না নদীর সাথে সাথে খাল বিল এবং হাওরও খনন কর‍্যে হবে।এসব খনন কাজ করতে হবে সঠিক ভাবে। নিশ্চিত করতে হবে যেন নদীর মাটি আবার নদীতেই ফিরে না আসে। একই সাথে খননের নামে যেন সরকারি অর্থ আত্মসাতের মহোৎসব না চলে তা-ও খেয়াল রাখতে হবে। যা সত্যি একটি কঠিন কাজ।

ফসল রক্ষার নামে যত্রতত্র অপ্রোয়জনীয় বাঁধ নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের নামে সরকারী অর্থ লোটপাটের উৎসব বন্ধ করতে হবে। হাওরের বাঁধ নির্মাণে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, প্রশাসক ও জনপ্রতিনিধিদের অভিনন্দিত করাও জরুরী।

আমাদের মনে রাখতে হবে হাওরের পানি হাওরের জন্য আশীর্বাদ হয়েই আসে। যুগ যুগ ধরে এই পানিই মায়ের মত স্তন্যদান করেছে হাওর এলাকায়, উপার্জনের উপায় হিসাবে কাজে এসেছে। বহুল ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে পরিবহণ ও যাতায়াতের উপায় হিসাবে। সাম্প্রতিককালে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এই পানিই হাওরবাসীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নষ্ট করছে স্বপ্নের ফসল। এই পানিকে যদি নদী দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করার সুযোগ করে দেওয়া যায় এবং উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা যায় তাহলে এই পানি আবারও হাওরবাসীর জন্য আশীর্বাদই হবে অভিশাপ নয়।

লেখক: কাসমির রেজা, সভাপতি, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা।

শেয়ার করুন