মুক্তির স্বাদ পৌঁছে দিতে হবে ঘরে ঘরে

মো. মইনুল ইসলাম

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাক ছিল, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মুক্তি ও স্বাধীনতা—এ দুটি ছিল তাঁর সেই ডাকের মূলকথা। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য আমাদের আরো বহুদূর যেতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। সমরনায়ক শাসিত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের হাত থেকে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ৪৭ বছর হলো আমরা স্বাধীন। বাঙালি অধ্যুষিত এই ভূখণ্ডে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় আমাদের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। আমাদের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের কতগুলো বৃহৎ এবং মহৎ আদর্শ ও উদ্দেশ্য ছিল, যাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও বলি। এই চেতনার অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন। সমাজতন্ত্রের কথাও ছিল। আজকের বাস্তবতায় সমাজতন্ত্র না হোক, সামাজিক ন্যায়বিচার তথা শোষণ-বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র গঠন অবশ্যই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।

রাষ্ট্র এক অর্থে একটি বিমূর্ত প্রতিষ্ঠান। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, একটি পতাকা এবং একটি সরকারই রাষ্ট্র নয়। রাষ্ট্রের প্রাণ হলো জনগণ। তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের কাজ। রাষ্ট্র ততটাই সার্বভৌম এবং জনগণতান্ত্রিক, যতটা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দেশের মানুষ উপভোগ করতে পারে। তাই জনগণের উপরোক্ত স্বাধীনতাগুলো কতটা অর্জিত হয়েছে সেটা মূল্যায়ন করতে হবে।

এখানে বিদ্যমান রাজনৈতিক স্বাধীনতার কথা কিছুটা আলোচনা করা যেতে পারে। নাগরিকের মৌলিক স্বাধীনতা বা Civil liberties-গুলো আমাদের সংবিধানে মোটা দাগে স্বীকৃত। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো নির্ভীকভাবে চর্চা করার অনেক সমস্যা আছে। রাষ্ট্র এবং সমাজের অনেক অলিখিত নিয়ম স্বাধীন মতামত প্রকাশের বড় বাধা। মনে হলে লেখাকে কাটছাঁট করে থাকে। তা ছাড়া আছে স্বাধীনতা পরিপন্থী সামাজিক ও ধর্মীয় কিছু বিধি-বিধান ও মূল্যবোধ। বিশেষ করে ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ধর্মান্ধতা প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনার বড় অন্তরায়। এর ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছে। তারা এরই মধ্যে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তারই সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হলো ড. জাফর ইকবালের ওপর আক্রমণ এবং তাঁকে হত্যার চেষ্টা। আক্রমণকারী ফয়জুল সেই ধর্মান্ধদেরই দূত। এখানে ধর্মের নামে নারী স্বাধীনতা, বিজ্ঞান মনস্কতা এবং মুক্তি ও বুদ্ধির আলোকে জীবন ও জগেক ব্যাখ্যা এবং বিবেচনা করার স্বাধীনতা অবাধ ও সহজলভ্য নয়।

যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথায় আসি, তাহলে বলতে হয় এখনো দেশের ২৪.৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের হাতে বন্দি। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ হতদরিদ্র, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়।

ধনী-দরিদ্রদের এই আয়বৈষম্য দেশে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান মতে, দেশের মোট আয়ের ৩৮ শতাংশ ভোগ করে সমাজের ওপরের তলার ১০ শতাংশ মানুষ। আর নিচের তলায় বসবাসকারী সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষ ভোগ করে মোট আয়ের মাত্র ১ শতাংশ (প্রথম আলো, ১৮-১০-১৭)। তবে  বেশি বিশ্বাসযোগ্য জরিপটি করেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিপিডি বা Centre for policy Dialogue। তাদের জরিপ মতে, এই আয় বা ধনবৈষম্যটি আরো বড়। এ ধরনের ধনবৈষম্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বেজায় বেমানান।

গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ব্যাপারে আগে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। গণতন্ত্র অর্জন ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য। গণতন্ত্র যদি হয় রাষ্ট্রে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, তাহলে বলব সে অধিকার অর্জনে আমাদের অগ্রগতি খুব সন্তোষজনক নয়। এখনো আমরা নির্বাচনসর্বস্ব গণতন্ত্রের মধ্যেই আটকে আছি। নির্বাচনী ব্যবস্থাও এখনো বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যবস্থাটিকে সুষ্ঠু ও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর অপারগতার জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতার অভাবই বহুলাংশে দায়ী। তবে নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র উপাদান নয়। এর জন্য আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে আইনের শাসন ও সুশাসন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। আমাদের মৌলিক গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকারগুলো সুরক্ষার জন্য শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। আইনের শাসন ও সুশাসনের অভাবও লক্ষণীয়ভাবে প্রকট। তা না হলে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের এমন প্রাবল্য দেশব্যাপী পরিলক্ষিত হতো না। দুর্নীতি এবং সন্ত্রাস আমাদের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও শত্রু। দুর্নীতি সুশাসনের পথে বড় অন্তরায়। অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা স্বাধীনতা অর্জনকেও দুর্নীতি বাধাগ্রস্ত করে। দুর্নীতি বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় ৩ শতাংশ খেয়ে ফেলে; যার অর্থ আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনকে ৩ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে।

দেশে বিরাজমান দুর্নীতির একটি ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায় প্রতিবছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বা টিআইয়ের প্রতিবেদন থেকে। বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির ওপর নজরদারি করে থাকে বার্লিনভিত্তিক টিআই। তাদের এবারকার প্রতিবেদন মতে, জরিপ করা ১৮০টি দেশের মধ্যে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে ১৪৩ নম্বরে। অর্থাৎ বিশ্বে আমরা ১৭ নম্বর দুর্নীতিবাজ দেশ। এ ব্যাপারে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে আমাদের প্রাপ্ত পয়েন্ট হচ্ছে মাত্র ২৮। অথচ বিশ্বের গড় বা Global average পয়েন্ট হচ্ছে ৪৩। অবশ্য গত বছরের তুলনায় আমরা ২ পয়েন্ট বা দুই ধাপ এগিয়েছি।

স্বাধীনতার মাসে আমাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অপূর্ণতার কথাই বেশি বলা হলো। তবে আমাদের সাফল্য তথা অর্জনও কম নয়। আমাদের বার্ষিক জিডিপি প্রায় ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১.৬ বছরে, বেকারত্ব বার্ষিক ৪.২ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে। সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ শতাংশে। মাথাপিছু আয় এক হাজার ৬২৬ ডলারে উন্নীত হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি। স্বাধীনতার এই সুফলগুলো শুধু আমরা ধরে রাখব না; সেগুলোকে ক্রমাগত এগিয়ে নিয়ে যাব। গণতন্ত্রের প্রসার ও জনগণের ক্ষমতায়নেও আমাদের প্রচেষ্টাকে জোরদার করতে হবে। ওপরে আলোচিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের যা কিছু অসাফল্য ও বাধা-বিপত্তি, সেসব কাটিয়ে উঠে মুক্তির স্বাদ পৌঁছে দিতে হবে সবার ঘরে ঘরে।

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

(কালের কণ্ঠ অনলাইন থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন