কাঁকন বিবির ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব পাওয়া না পাওয়া প্রসঙ্গে

আনোয়ার কবির

গত ২১মার্চ আদিবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি ইন্তেকাল করেছেন। উনার বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও শান্তি কামনা করছি। কাঁকন বিবি ছিলেন আদিবাসী খাসিয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা। নিঃসন্দেহে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে উনার বীরত্ব খেতাবপ্রাপ্তদের থেকে কোন অংশে কম নয়।

যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করার চেষ্টা করি তাই মুক্তিযুদ্ধেও ইতিহাসের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কোন বিষয় আসলে গভীর আগ্রহ ও মনোযোগ সহকারে দেখার চেষ্টা করি। চেষ্টা করি মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে কোন ভুল তথ্য উপস্থাপিত হলে যথা সম্ভব সঠিক তথ্য পরিবেশন করতে।

কাঁকন বিবি মারা যাওয়ার পরে অনেক জায়গায় দেখেছি সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে উনাকে‘বীরপ্রতীক’লিখেছেন। নিঃসন্দেহে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো যে কোন বিচারে একটি সফল জনযুদ্ধ। একটি সফল জনযুদ্ধের অনেক ট্র্যাজেডিও থাকে।
তার অন্যতম হলো সকল যোদ্ধার, সকল বীরত্বের যথাযোগ্য মূল্যায়ন না হওয়া। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও অনেকাংশে সেটি ঘটেছে।

যেমন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ জগজ্যোতিকে বীরত্বের জন্য সর্বোচ্চ খেতাব প্রদান করা হবে ঘোষণা করা হলেও যুদ্ধ পরবর্তীকালে সেটির বাস্তবায়ন হয় নি, আবার বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ক্ষেত্রে তার সফল সঠিক প্রয়োগ ঘটেছিলো। সেক্টরকমান্ডার মেজর জলিল, মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর মতো মুক্তিযোদ্ধাও বীরত্বের জন্য কোন খেতাব পাননি অথচও উনাদের অধীনে যুদ্ধ করা অসংখ্য যোদ্ধা উনাদের প্রত্যয়ন, রিকমান্ডেশন বা সাইটেশনে খেতাব পেয়েছেন।

আমি ৯নং সেক্টরের সাব সেক্টরকমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর আহসানউল্লাহ (অব)কে জানি। প্রকৌশল বিশ্বদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায় উনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণগ্রন্থ‘সীমাহীন সমর’-এ উনার বীরত্বের ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে। একটি যুদ্ধে উনি একাই ১৯জন পাকিস্তানি সৈন্যকে আটক করেন।

৯নং সেক্টরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও উনার গৌরব অক্ষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য উনিও কোন খেতাব পাননি। আসলে সকল জনযুদ্ধের ট্র্যাজেডির এগুলো অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর তাই বলে উনাদের গৌরবোজ্জ্বল যুদ্ধ, উনাদের কৃতিত্ব, বীরত্বগাথা কখনো ইতিহাসে ম্লান হয়ে যায়না। যে কোন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, পদক, পুরস্কারের জন্য কিছু স্বাভাবিক নিয়ম কানুন মানা বা পালন করা হয়।

যেমন পুরস্কারের জন্য বোর্ড গঠন করা, নমিনেশন দেওয়া, পুরস্কারের জন্য নমিনেশন বা নাম আসা ব্যক্তিদের কৃতিত্বকে যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। আর বীরত্ব বা কৃতিত্বের জন্য রাষ্ট্রীয় পদক, সম্মাননা বা পুরস্কার হলে মন্ত্রিপরিষদে পাস হওয়া, সরকারি গেজেট হওয়া অন্যতম।

কাঁকন বিবির মৃত্যুর পরে বিভিন্ন মিডিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উনার সম্পর্কে লেখা হচ্ছে, ১৯৯৬ সালে কাঁকন বিবিকে‘বীরপ্রতীক’ খেতাব দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের গবেষক হিসেবে প্রথমে বিষয়টি আমার কাছে খটকা লাগে। পরে দেখলাম, উনার নামে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ১৯৯৬ সালে যে সনদপত্র প্রদান করা হয়, সেখানে নামের সাথে বীরপ্রতীক লেখা আছে।

এক্ষেত্রে সকলের বিভ্রান্তি দূর করার জন্য বলতে পারি, যে সকল মক্তিযোদ্ধা বীরত্বের জন্য বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম, বীরপ্রতীক রাষ্ট্রীয় খেতাব পেয়েছেন, তাদের সরকারি গেজেট ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুর সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদক প্রদান করা হয় নি। পরবর্তী সরকার জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সময়েও হয়নি। ’৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসলে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১৫ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এ পদক প্রদান করেন।

পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ৭ মার্চ ১৯৯৮ সালে একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মাননা পদক প্রদান করেন।

কাঁকন বিবিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে। সেখানে উনার নামের সাথে ‘বীরপ্রতীক’ যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু খেতাবপ্রাপ্তদের সম্মাননা সনদে পরিষ্কারভাবে মুক্তিযুদ্ধে উনাদের বীরত্বের জন্য গেজেট নাম্বার উল্লেখ করে পদকের নাম উল্লেখ করা আছে। কাঁকন বিবির সার্টিফিকেটটি বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট। মুক্তিযুদ্ধে প্রাপ্ত খেতাবের জন্য নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য ২জন মহিলা বীর প্রতীক খেতাব লাভ করেছেন। তারা হলেন, ক্যাপ্টেন সিতারা ও তারামন বিবি।

কাঁকন বিবির সংবাদে অনেকে উনার সার্টিফিকেটের অনুলিপি প্রদান করে লিখেছেন, ১৯৯৬ সালে কাঁকন বিবিকে বীরপ্রতীক খেতাব প্রদান করা হয়। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, ১৯৯৬ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধেও খেতাবপুনঃ সংযুক্তি বা বাতিলের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন কমিটি গঠন করা হয়েছিলো? না, কোন কমিটি গঠন করা হয় নি। বাস্তবতা হলো, বিশেষ করে কাউকে তার সশস্ত্র যুদ্ধে বীরত্বের জন্য খেতাব বা পদক প্রদান করতে হলে জীবিত থাকলে সাধারণত তিনি যার নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছেন বা উনার সহযোদ্ধারাই উনার সাইটেশন প্রদান করতে পারেন।

আর কমিটির কাছে সাইটেশন প্রদান করলে কমিটি সেটি যাচাই-বাছাই বা পরীক্ষানিরীক্ষা করে সুপারিশ করলে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদন, গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে পদকপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক কমান্ডার সহযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেছেন।

জেনারেল সফিউল্লাহ, জেনারেল সিআর দত্ত, লে. কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী ও মেজর রফিকুল ইসলাম বাদে অন্য সকল ফোর্স কমান্ডার, সেক্টর কমান্ডার মৃত্যুবরণ করেছেন। এই বাস্তবতাতেএখন নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের খেতাবের জন্য নাম সংযুক্ত করার কমিটি করাও দূরুহ। আর করা হলে সেটি নানা রকম বিতর্কের জম্ম দেবে।

আসলে সকল জনযুদ্ধের ট্র্যাজেডি, সেখানে অসংখ্য বীরত্ব, অসংখ্য যোদ্ধার সঠিক মূল্যায়ন হয় না। পরবর্তীতে অসংখ্য যোদ্ধার অধঃপতনও হয়। আর এই ট্র্যাজেডি নিয়েই বহমান ইতিহাস!

লেখক : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক।

শেয়ার করুন