একাত্তরে অর্জিত স্বাধীনতা এবং আমাদের প্রাপ্তি

পিযুষ চক্রবর্তী

বাঙালি জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য হাজার বছর ধরে লালিত হয়ে আসছে, কার্যত ১৯৭১সালের ২৬শে মার্চ পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে স্বাধিকার রক্ষা ও বাংলাদেশ নামক একটি ভূখন্ড প্রতিষ্টা লাভ করে বিশ্ব দরবারে। বিভিন্ন সময় ভিনদেশী ও অবাঙালিদের দ্বারা বাংলা নামক ভূখন্ডের অধিবাসীরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ও ষড়যন্ত্রের শিকার হন। নিজেদের অধিকার ও স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠায় বাঙালিরা ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে বিভিন্ন দাবিদাবা আদায়ে চেষ্টা করেন।

১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে মহান ২১শে ফেব্রুয়ারী সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার প্রমূখ আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। । ভাষার অধিকারের পথ ধরেই গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক অধিকারের দাবি উচ্চকিত হয়েছিল। শুরু হয়েছিল স্বায়ত্ত্বশাসন ও স্বাধিকারের সংগ্রাম। এর পর সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সর্বভোম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বাঙালির স্বকীয়তা ধরে রাখতে ও পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি আনয়নে বাঙালিরা খুব কম সময়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং আপন সত্ত্বা ও বাংলা নামক ভূ-খন্ড রক্ষায় সচেষ্ট হন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, ভাষা আন্দোলনই ছিল মহান স্বাধীনতা অর্জনের জন্য চেতনা সৃষ্টিকারী। কবির ভাষায়- স্বাধীনতা তুমি / রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশীগান স্বাধীনতা তুমি / কাজী নজরুল ঝাঁকড়া দুলের বাবরি দোলানো / মহান পুরুষ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা/ স্বাধীনতা তুমি শহীদ মিনারের অমন একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জল সভা….। কবি শামসুর রহমান তাঁর কবিতায় এভাবেই স্বাধীনতার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটান।

স্বাধীনতার মানে হচ্ছে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়া, অন্যের দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করা। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ। যার কারনে বিদেশীরা ভ্রমণ, ও ব্যবসা- বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভারত তথা বাংলায় আসতে শুরু করে। তুর্কি, পাঠান, ও ইংরেজরা শত শত বছর এ দেশকে শোষণ করতে থাকে । অশিক্ষা, কুসংস্কারচ্ছন্ন ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে ইংরেজরা বিশাল এই ভারতবর্ষে প্রায় দুইশ বছর রাজত্ব করে। নানা বিদ্রোহ আন্দোলনের ফলে ইংরেজরা ভারতবর্ষ ছাড়তে বাধ্য হয়। শুধু ধর্মের ওপর ভিত্তিকরে ভাগ করা হয় দুটি রাষ্ট্রের। পাকিস্তানের একটি অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান অপরটি পশ্চিম পাকিস্তান । ধর্মীয় সাদৃশ্য ছাড়া ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস কোনো কিছুতেই পাকিস্তানের দুটি অংশের মধ্যে কোনো মিল ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল হাজার মাইলের দূরত্ব। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের সীমাহীন দুর্নীতি, শোষন ও বাঙালিদের প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের শাসকদের ওপর আস্তা হারিয়ে ফেলে। অসন্তোষ জমাট বাঁধতে থাকে তাদের মধ্যে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য চলতে থাকে। ৭০এর নির্বাচনে পূর্ব বাংলার পক্ষে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও যখন পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বাংলার অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব মেনে নিতে চায়নি, তখন থেকে এদেশেরে মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন লালন করতে থাকে। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ডাক দেন স্বাধীনতা সংগ্রামের- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। শুরু হয় বাঙালির অস্তিত্ব¡ রক্ষার সংগ্রাম। ১৯৭১ সালে বাঙালি মুক্তি সংগ্রামে উজ্জীবিত হয়। দীর্ঘ ৯মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সময় প্রায় ১ কোটি লোক শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হয় এবং অগনিত লোক আহত হয়। ২লক্ষ মা- বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ও প্রতিবেশি দেশ ভারতের সহযোগিতায় বাংলার মানুষ অর্জন করে মহান স্বাধীনতা। ৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর এ দেশ শত্রু মুক্ত হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন জাতি আজও স্বাধীনতার জন্য রক্ত ঝড়াচ্ছে। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, চেচনিয়ায় প্রানহানি ঘটছে প্রতিনিয়ত। স্পেনের কাতালান, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ভারতের ত্রিশগড়, চীনের তিব্বতের জনগন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর। এসব মুক্তিকামী মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বাধীনতা অর্জন করা। পূর্বতিমুর, কসোভো দক্ষিণ সুদান দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী- সংগ্রামের ফলে অর্জন করেছে স্বাধীনতা।

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা খুবই কঠিন। বাঙালি জাতি সত্তার বিকাশ, অস্তিত্ব¡ রক্ষা, অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়নে মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজি রেখেছিলেন ১৯৭১ সনে। দুঃখজনক হলেও সত্যি ২৬শে মার্চ বাঙালি জাতি ফিরে পেল স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ ভোগ ও যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা আজও পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। চারিদিকে অভাব, ফুটপাতে মানুষের ভাসমান বসতি, সু-শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, দুর্বল সমাজ ব্যবস্থা, মতানৈক্য ও প্রায় ভঙ্গুর যৌথ পরিবার ব্যবস্থা। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসার অব্যবস্থাপনা, দেশে কর্মক্ষেত্র অপ্রতুল যার জন্যে শিক্ষিত লোকের বেকারত্ব বাড়ছে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা জনিত অশান্তি ও জনমনে সংশয়সহ অপসংস্কৃতির দৌরাত্ব, স্বাধীনতা বিরোধীরা কৌশলী ষড়যন্ত্রে লিপ্তসহ নানাবিধ কারণে স্বাধীনতার সুফল ও কাঙ্খিত প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তিতে ব্যবধান অনেক।

তবে এ কথা বলতেই হয় যে, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় পদক্ষেপ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে আজকে আমরা বাঙালিরা বিশ্বের বুকে স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছি। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আমরা আবদ্ধ নই। যদিও স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ আমরা আজ ও গ্রহণ করতে পারিনি, কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক মুক্তি আমাদের আজও হয়নি। তবুও আজ আমরা বলতে পারি আমাদের নিজস্ব সত্তা আছে। আছে বর্ণ, ভাষা, শিক্ষা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, বাঙালি সংস্কৃতিসহ নিজস্ব মানচিত্র ও লাল সবুজের পতাকা। স্ব-গৌরবান্বিত স্বাধীন বাংলাদেশ, আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক।

লেখক : কলামিস্ট ও কবি, সিলেট।

 

শেয়ার করুন