জলে ভাসা নাম সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত

।। শাহরিয়ার চৌধুরী বিপ্লব ।।
ঐ দূরের তালগাছ। ওই কাছারি ঘর। জারমুনি ফেনার ভাসা ভাসা ছোবা। মাঝ হাওরের খিইল্যা নৌকার মাঝি। ভাটিয়ালি গানের আবছা আবছা সুরের রেশ। রাজহংসের দল বেঁধে চলা। পাখিদের কল কাকলী।
যতবার গ্রামে যেতে চাই। যতবার মেঠো পথে হাঁটতে চাই। যতবার কৃষকের লাঙল নিয়ে মাঠে যাই, ততবার ফিরে ফিরে চাই। কালনী নদীতে যতবার ঢেউ উঠে, ততবার মাঝি গলা ছেড়ে গায়, আয়-আবার ফিরে আয়। আমার হাওরের রাজপুত্র- হাওরেই ফিরে আয়।
একটি বছর গত হলো। চোখের পলকে মহাকালের গর্ভে বিলীন হলো ৩৬৫ দিন। পৃথিবী সূর্যকে ঘুরে আবার তার জায়গায় ফিরে এসেছে। আবার কৃষ্ণপক্ষে চন্দ্রীমার আলো এসেছে। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। চলবে। প্রেমিকারা বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। আবার গর্ভধারিণী হবে আগামীদিনের সন্তানের মাতা, আবার রাজপথে শ্লোগান হবে, উত্তেজিত হবে ভোটের মাঠ, প্রকম্পিত হবে রাজনীতির মঞ্চ।
শুধু আসবেন না একজন। আসবে না কোনদিন ফিরে, সুখের দুঃখগাছ, রাজনীতির রাজপুরুষ, হাওরের বন তুলসি সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত।
নিজে নিজে বেড়ে উঠা, হাওরের হাজারো উদ্ভিদের মতো নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছিলেন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। নিজেকে যিনি ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন নিজের যোগ্যতায়।
আজ তিনি দূরে, বহু দূরে। তবুও কাছে, হাতের কাছে। ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। তবুও স্পর্শ পাই। দেখি, চোখ বন্ধ করে দেখি, এখন অনেক বেশী দেখি, যখন দেখতাম না, তার চেয়েও বেশী দেখি। অনুভূতি পাই। অনুভবের অলিন্দে। হৃদয়ে হৃদয়ে জেগে আছে। কখনো ঘুমে। কখনো জাগরণে। ডাকতে ইচ্ছে হয়। একটু ডাকি। একটা ফোন কল দেই। এইতো নাম্বার। সবই করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু কিছুই করা হয় না।
মাঝে মাঝেই ডাকি। কথা বলতে ইচ্ছে হয়। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে যতবার বিতর্ক হয় চায়ের টেবিলে, অফিসের আড্ডায়, কিংবা পত্রিকার ছাপাখানায়, তখনই মনে হয় একটা কল দিয়ে বলি, কাকা দেন না একটা তুড়ি মেরে। 1486316458_p-20
এখন আর সংসদে বিতর্ক হয় না, তার চেয়ে বেশী হয় বাজারের গলিতে। মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে হয়, একটা মন্তব্য দেন না, হয়ে যাক ব্রেকিং নিউজ কিংবা সারাদিনের স্ক্রল।
হাওরের বিশাল সর্বনাশ হয়ে গেল। ক্ষেতের কাদা মেখে, বানের জলে ভিজে, পাঞ্জাবীর কোণা ছিড়ে, বুকের বোতামটা খুলে পড়ে গেছে তবুও খোলা বুক নিয়ে কেউ দৌঁড়ে আসে নাই ডিসি অফিসের ঘুম হারাম করে দিতে। প্রেসক্লাবে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে কেউ সাংবাদিকদের ব্যস্ত করে নাই।
সংসদে সবাই যান। বেতন ভাতা সবাই তোলেন। ক্যাফেটেরিয়ায় স্যুপ খান সবাই। সেই আগের মতোই আছে রুপালী দালান। লাল ইটের বারান্দা, কিংবা মার্বেলের মেঝে। সেই কর্মচারীরাও আছে। শুধু নেই আপনি। নেই আপনার পয়েন্ট অব অর্ডার, নেই আপনার জ্বালাময়ী ভাষণ।
প্রতিদিন কথা হয়েছে। বিল এসেছে, পাশ হয়েছে। শুধু হয় নি আপনার টেবিল থাপড়ানো। হয় নি বাধ্য করানো বিবৃতি দিতে, হয় নি একটি সংসদীয় ঝড়, হাওরবাসীর পক্ষে একটা দিন কার্যবিবরণীতে আসে নি। মূলতবি প্রস্তাব আসেনি হাওরের ফসলহানিতে। হয়নি একটি সংসদীয় তদন্ত কমিটি।
কাকা, আপনাকেই ডাকি, আপনাকেই অনুভব করি, প্রতিটি ইভেন্টে, প্রতিটি ঘটিনায় আপনাকেই খুঁজি।
আমার মতো অনেকে। শয়ে শয়ে। হাজারে হাজারে। লাখে লাখে।
সুখে দুখে। আনন্দে। বেদনায়। আশায়। নিরাশায়। হতাশায়। ব্যর্থতায়। প্রাপ্তিতে। অপ্রাপ্তিতে। যারা আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছে তারা ডাকে কিনা জানি না। আমার মতো যারা কিছু পেতে চায় নাই তারা ডাকে। ডাকছে। ডাকবে। ডেকে যাবে আজীবন।
ইতিহাসের দুখু মিয়া। হাওরের দুখু সেন। যতদিন হাওরে জল থাকবে, যতদিন জলা থাকবে, যতদিন কালনী নদী বইবে, যতদিন মাঝিরা বাইবে, পাখিরা গাইবে, ভোরের কুয়াশায়, জোছনার রাতে, হেমন্তের সন্ধ্যায়, গ্রীষ্মের খরতাপে, বরষার অথই জলে ভাসবে। এ নাম ভাসবে। সুরঞ্জিত সেন হাসবে। জলের রশ্মিতে হাসবে।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় ছাত্রলীগ, সুনামগঞ্জ জেলা।

শেয়ার করুন