একুশে পদক পেলেন সিলেটের মনজুরুল ও সুজেয় শ্যাম

সিলেটের সকাল রিপোর্ট :: একুশে পদক বাংলাদেশের একটি জাতীয় ও সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে ১৯৭৬ সালে এই পদক চালু করে সরকার। প্রতি বছর সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, ভাষাসৈনিক, ভাষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানকারী, সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পর্যায়ে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

এবছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় দেশের ২১ জন গুণী ব্যক্তিকে একুশে পদক প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চারজন পেয়েছেন মরণোত্তর পুরস্কার। বৃহস্পতিবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ঘোষিত বিজ্ঞপ্তিতে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। পদক প্রাপ্তদের মধ্যে ভাষা সাহিত্যে অবদানের জন্য সিলেটের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং শিল্পকলার সংগীত বিভাগে পদক পেয়েছেন সুজেয় শ্যাম । আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গণগ্রন্থগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে পদকপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দিবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলাদেশের একজন গল্পকার সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি ১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি সিলেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ আমীরুল ইসলাম এবং মাতা রাবেয়া খাতুন। তিনি সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে মাধ্যমিক পাশ করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন সিলেট এমসি কলেজ থেকে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইয়েটস-এর কবিতায় ইমানুয়েল সুইডেনবার্গের দর্শনের প্রভাব বিষয়ে পিএইচডি করেন।

পেশাগত জীবনে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ এর অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন। ইংরেজির শিক্ষক হলেও বাংলা ভাষা সাহিত্যেও তার রয়েছে অনেক খ্যাতি। তিনি লিখেছেন একাধিক গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থ। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়।

অন্যদিকে, সুজেয় শ্যাম ১৯৪৬ সালের ১৪ মার্চ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সিলেট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা অমরেন্দ্র চন্দ্র শাহ ছিলেন একটি বিদ্যালয়ের সহকারী এবং ‘ইন্দ্রেশর-টি’ নামে একটি চা বাগানের মালিক। তার শৈশব কেটেছে সিলেটের চা বাগানে আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি এলাকায়। দশ ভাইবোনের মধ্যে সুজেয় ষষ্ঠ। সঙ্গীতে আগ্রহ জন্মায় সকালে প্রাথনা সঙ্গীত শুনে। তাছাড়া তার ছোট বোন ও ভাই বেতারে গান গাইত। মা বাবাও ছিলেন নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ।

সুজেয় শ্যাম একজন গীটার বাদক ও শিশুতোষ গানের পরিচালক হিসেবে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান চট্টগ্রাম বেতারে যোগদান করেন। পরে বড়দের অনুষ্ঠান পরিচালনা শুর করলেও ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম বেতারে চাকরী ছেড়ে ঢাকা বেতারে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ঘোষণার পর শহীদুল ইসলাম রচিত তার সুরকৃত ও তার কণ্ঠে “বিজয় নিশান উড়ছে ওই” গানটি স্বাধীন বাংলা বেতারে বেজে উঠেছিল। ২০০১ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতার থেকে প্রধান সঙ্গীত প্রযোজক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি টুনাটুনি অডিও নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।

১৯৬৯ সালে সঙ্গীত পরিচালক রাজা হোসেনের সাথে পরিচিত হন এবং একত্রে রাজা-শ্যাম নামে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন। সত্তর-আশি দশকে তারা একত্রে সূর্য গ্রহণ, সূর্য সংগ্রাম, ভুল যখন ভাঙ্গলসহ পচিশটি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

সূর্য গ্রহণ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করে অর্জন করেন বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার ১৯৮৬ সালে আবদুল লতিফ বাচ্চু পরিচালিত বলবান ও অবাঞ্ছিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এককভাবে সঙ্গীত পরিচালন শুরু করেন। একবিংশ শতকের প্রথমে হাছন রাজাকে নিয়ে নির্মিত হাছন রাজা চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরচালনা করে লাভ করেন তার প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলামের বিশেষ অনুরোধে এই চলচ্চিত্রের একটি গানেও কণ্ঠ দেন তিনি। পরবর্তীতে জয়যাত্রা ও অবুঝ বউ চলচ্চিত্রের গানের সঙ্গীত পরিচালনা করে যথাক্রমে ২০০৪ ও ২০১০ সালে এই পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৪ সালে একাত্তরের ক্ষুদিরাম ও একাত্তরের মা জননী নামে দুটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

২০০৬ সালে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত ৪৬টি গানের সংকলন নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের গান শিরোনামের একটি অ্যালবামের সঙ্গীত পরিচালনা করেন। এর ধারাবিহিকতায় পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আরও ৫০টি গানের সংকলন নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের গান – ২ নামে আরেকটি অ্যালবামের সঙ্গীত পরিচালনা করেন।

সৈয়দ মনজুরুল এবং সুজেয় শ্যাম ছাড়াও যারা একুশে পদক পেয়েছেন তারা হলেন- ভাষা আন্দোলনে মরহুম আ. জা. মা. তকীউল্লাহ (মরণোত্তর) ও অধ্যাপক মির্জা মাজহারুল ইসলাম পেয়েছেন একুশে পদক ২০১৮। শিল্পকলার সংগীত বিভাগে যথাক্রমে শেখ সাদি খান, ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, খুরশীদ আলম ও মতিউল হক খান, শিল্পকলার নৃত্যে বিশেষ অবদানের জন্য নৃত্যশিল্পী মিনু হক, শিল্পকলার অভিনয় বিভাগে অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন।

এছাড়া শিল্পকলার নাটকের জন্য নিখিল সেন (নিখিল কুমার সেনগুপ্ত), শিল্পকলার চারুকলায় কালিদাস কর্মকার ও শিল্পকলার আলোকচিত্রে গোলাম মুস্তাফা পেয়েছেন একুশে পদক।

সাংবাদিকতায় ২০১৮ সালের একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক হলেন রণেশ মৈত্র। গবেষণায় মরণোত্তর পদক পেয়েছেন ভাষাসৈনিক প্রফেসর জুলেখা হক। অর্থনীতিতে ড. মইনুল ইসলাম, সমাজসেবায় অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন এবং ভাষা সাহিত্যে সাইফুল ইসলাম খান (কবি হায়াৎ সাইফ), সুব্রত বড়ুয়া, রবিউল হুসাইন ও মরহুম খালেকদাদ চৌধুরী একুশে পদক পেয়েছেন।

শেয়ার করুন