অপেক্ষা করতে হবে

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনঃ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছর কারাদণ্ড হয়েছে। তার পুত্র ও দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা তারেক রহমানও সাজাপ্রাপ্ত হলেন। এটি আইনি প্রক্রিয়া, স্পর্শকাতর। সঙ্গত কারণেই মন্তব্য করা চলে না। আদালতে দীর্ঘদিন মামলা চলেছে। উভয় পক্ষ বক্তব্য রেখেছে এবং আমরা তা সংবাদপত্রে দেখেছি। তবে এ মামলার রাজনৈতিক দিক রয়েছে।

অনেকেই মনে করতে পারেন যে, যদিও দুর্নীতির অভিযোগে বিএনপির দুই শীর্ষনেতার কারাদণ্ড হয়েছে, কিন্তু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফায়দা এ দলটির হতেই পারে। আমাদের দেশে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এটা প্রচলিত যে, জেল-জুলুমের শিকার রাজনৈতিক নেতাদের জনপ্রিয়তা বাড়ে। তারা জেল থেকে মুক্তিলাভের সময় সংবর্ধনা পান, ফুলের মালা পরানো হয়। এমনকি জামিনে মুক্ত হলেও তাদের বরণ করে নেওয়া হয়, যদিও মামলা তখনও বিচারাধীন। বেগম খালেদা জিয়া কবে কারাগার থেকে বের হয়ে আসবেন, সেটা এখনও অজানা। মুক্ত হলে তার সমর্থকরা কীভাবে তাকে স্বাগত জানান, সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

এ মামলাটি আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত। তবে অর্থের পরিমাণ খুব বেশি নয়। বাংলাদেশে দুর্নীতি আছে এবং সেটা ওপেন সিক্রেট। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি হয়। ব্যাংকের অর্থ ঋণ হিসেবে নিয়ে ফেরত দেওয়া হয় না। একাধিক সরকারি ব্যাংকে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ আমরা দেখি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিয়ম-বহির্ভূতভাবে ঋণ দিয়ে তা আদায় করতে পারছে না। সম্প্রতি এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ প্রদানের খবর চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের ঋণের কারণে ব্যাংকের আর্থিক ভিত দুর্বল হয় এবং তার দায়ভার চাপানো হয় জনগণের ওপর- তাদের ট্যাক্সের অর্থ দিয়ে এ ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া হয়। খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার পর সরকারের অভ্যন্তরে দুর্নীতির বিষয়ে সচেতনতা বাড়লে সেটাই হবে বড় পাওনা। একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাজা হওয়ায় এ ধারণা বদ্ধমূল হতেই পারে যে, এখন থেকে অন্যায় করলে কেউ পার পাবে না। তবে মামলাটির এখনও অনেক প্রক্রিয়া বাকি। তিনি উচ্চ আদালতে যাবেন বলে জানিয়েছেন। প্রথমে জামিন নিয়ে ফের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন। উচ্চ আদালতে সাজা বহাল থাকতে পারে। দণ্ড কমতে বা বাড়তে পারে। খালাস পেতে পারেন। এ জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। বিএনপিকে ধন্যবাদ যে, তারা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে। এটা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত নতুন সংযোজন। এটা অনুকরণীয় হবে, তেমন প্রত্যাশা করাই যায়। তবে বাস্তবে সেটা ঘটবে কি-না সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

রায়ের আগে ও পরে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। তারা মনে রাখেনি যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন আসলে নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত লোক রয়েছে।

আরেকটি প্রশ্ন- এ রায়ের কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ কতটা প্রভাবিত হবে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, প্রভাব পড়বে। তেমনটি যেন না ঘটে তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সরকারের দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা। বিএনপি নির্বাচনে আসবে এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো বয়কটের পথে যাবে না, সেটাই আমার ধারণা। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি তাদেরও ভূমিকা রয়েছে। এ রায় প্রত্যাশিত ছিল। দুর্নীতির জন্য অবশ্যই শাস্তি হওয়া দরকার, তা সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন। তবে এখন আমাদের আরেকটি বিষয়ের জন্য অধীর অপেক্ষা- আর্থিক দুর্নীতির এ মামলায় আদালত কী পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, সেটা জানার।

লেখক- রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও অধ্যাপক ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

শেয়ার করুন