ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে মাদকের আগ্রাসন

মীর আব্দুল আলীম

মাদকে সয়লাব দেশ। মানুষ মাদক ব্যবসায়ী আর মাদকাসক্তদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। পুলিশও যেন অসহায়। এ নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)-এর কণ্ঠেও যেন কিছুটা হতাশার সুর। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং জঙ্গি দমনে সারাবিশ্বে রোল মডেল হওয়া সত্ত্বেও তার এ অসহায়ত্ব আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে বৈকি। মাদকের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় অসহায় মানুষ কোথাও কোথাও মাদকের বিরুদ্ধে নাগরিক কমিটি গঠন করেছে। গত ৬ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকার পাশের রূপগঞ্জের বরাব এলাকার এক নাগরিক কমিটির সমাবেশে প্রধান আলোচক হিসেবে আমি উপস্থিত ছিলাম। সমাবেশের বক্তাদের আলোচনা শুনছিলাম। রূপগঞ্জের ওসি ইসমাইল হোসেন মাদক নির্মূল নাগরিক কমিটির সভাপতির হাতে লাঠি তুলে দিয়েছেন। সেখানে গিয়ে বুঝতে পেরেছি মানুষ মাদক বিক্রেতা আর সেবনকারীদের কাছে কতটা অসহায়।

দেশ থেকে কেন মাদক নিয়ন্ত্রণ হয় না? আমি বলবো, যারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করবেন কী করছেন তারা? মাদক পাচার, ব্যবসা ও ব্যবহারকারীর ক্রমপ্রসার রোধকল্পে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে নানারকম কার্যক্রম দেখা গেলেও তেমন কোনো ইতিবাচক ফল মিলছে না। মাদক শুধু একজন ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারের জন্যই অভিশাপ বয়ে আনে না, দেশ-জাতির জন্যও ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনছে। নানারকম প্রাণঘাতী রোগব্যাধি বিস্তারের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ করে তুলছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের সহযোগিতায় দেশের অভ্যন্তরে মাদকের বিকিকিনি এবং বিভিন্ন সীমান্তপথে দেশের অভ্যন্তরে মাদকের অনুপ্রবেশ নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। দেশের প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় মাদকদ্রব্য বিকিকিনির বিষয়টি এ দেশে বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট। বিভিন্ন সময়ে পুলিশি অভিযানে মাদকদ্রব্য আটক এবং এর সঙ্গে জড়িতদের আটকের কথা শোনা গেলেও মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা ‘গডফাদার’দের আটক করা হয়েছে কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে এমন কথা শোনা যায় না। এ কথা সত্য যে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রকট রূপের পেছনে মাদক অন্যতম বড় একটি উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। অভিযোগ আছে, খোদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মাদক বিকিকিনি হয়। আর এর অর্থের বড় একটি অংশ যায় কারারক্ষীদের পকেটে। বাকি অংশ কয়েদি এবং মাদক ব্যবসায়ীরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। কারাগার মাদক ব্যবসার নিরাপদ স্থান হলে এর মতো উদ্বেগজনক ঘটনা আর কী হতে পারে?

আশির দশকে বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার শুরু হয় মর্মে বিভিন্ন তথ্য মেলে। এসময় লুকিয়ে-চুরিয়ে, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক বিক্রি করা হতো। মাদক বিক্রি এখন আর অতটা গোপনে নেই বলেই প্রতীয়মান হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, রাজধানীতে ডিজে পার্টির নামে বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় মাদকের রমরমা আসর বসে। এখানে সাধারণত ধনী পরিবারের তরুণ-তরুণীদের যাতায়াত। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণ-তরুণীরাই মূলত মাদকের মূল টার্গেট। মাদক এখন আর বস্তির অলিতে-গলিতে নয়, এর বিস্তার ঘটেছে ভদ্রসমাজেও। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। এ কথা সত্য যে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন শুধু নগর-মহানগরেই সীমাবদ্ধ নেই, গ্রাম-বাংলা পর্যন্ত মাদক এখন সহজলভ্য। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মাদক। তবে মাঝেমধ্যে মাদকদ্রব্য বহনের দায়ে কেউ কেউ ধরা পড়লেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে। প্রশাসনের কিছু লোকজনও যে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত, কারা অভ্যন্তরে মাদকের প্রসারই এর প্রমাণ।

দৃশ্যের আড়ালে এই অদৃশ্য মহাশক্তিধর চক্রটির জন্যই মাদকের ক্রমবিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। সর্ষের ভেতরে ভূত রেখে যেমন ভূত তাড়ানো যায় না, মাদক যারা রোধ করবে তারাই মাদকের সঙ্গে যুক্ত হলে মাদক ব্যবসা রোধ কতটা সম্ভব? সুতরাং আমরা মনে করি মাদকসংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ব্যাপারেই আইন প্রয়োগে সরকারকে কঠোরতা দেখাতে হবে। কারাগারে মাদক ব্যবসার মতো লজ্জাজনক ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারারক্ষীসহ অন্যদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি আইনের কঠোর প্রয়োগই মাদকের ভয়াবহতা রোধে সহায়ক হতে পারে।

লেখক :গবেষক

ই-মেইল : newsstore13@gmail.com

উৎস: ইত্তেফাক

শেয়ার করুন