বিশ্ব কি চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলা করতে সক্ষম?

জয়া ফারহানা

গণহত্যা বা জেনোসাইডের চেয়ে গুরুতর অপরাধ কী আছে? ভাবছেন, লাখ লাখ মানুষ হত্যার চেয়ে অপরাধ আর কী হতে পারে? কিন্তু যে প্রকল্পে কোটি কোটি মানুষ হত্যার সম্ভাবনা তৈরি হয় কিংবা মানুষ জাতিরই বিলুপ্তির সম্ভাবনা থাকে তা কি জেনোসাইডের চেয়েও মারাত্মক নয়? ইকোসাইড হলো গোটা প্রাণব্যবস্থাকে ধ্বংস করার প্রকল্প। ইকোসাইড জেনোসাইডের চেয়ে গুরুতর অপরাধ তাই। জেনোসাইড লাখ লাখ মানুষ হত্যা। ইকোসাইড কোটি কোটি প্রাণের বিনাশ। মানুষ হত্যা হয় জেনোসাইডে। ইকোসাইডে গোটা প্রাণ ব্যবস্থাপনাই ধ্বংস হয়ে যায়। যে ব্যবস্থা টিকে না থাকলে মানুষসহ কোনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকে না সেই প্রাণব্যবস্থার বিনাশকারীরা গণহত্যাকারীদের চেয়েও বড় অপরাধী। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাই যেকোনো পরিবেশবিনাশী কার্যকলাপকে মানবতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ প্রাণব্যবস্থা টিকে না থাকলে মানুষ, মানবতা, সভ্যতা সব শব্দই অর্থহীন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মনসান্তোকে এই অভিযোগে আসামি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল ২০১৬ সালে। মনসান্তো বিকৃত বীজ ও বিষের মাধ্যমে বিশ্বের দেশে দেশে কিভাবে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের ক্ষতি করেছে সেটা আর এখন কারো অজানা নয়। মনসান্তোর মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিকৃত বীজের বিপদ মোকাবেলা করছে গোটা পৃথিবী। বিপদ আরো আছে। পারমাণবিক অস্ত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশগুলো সিসা, ক্যাডমিয়াম এবং আরো নানা বিষাক্ত বিপজ্জনক বর্জ্যের বর্জ্যাগার হিসেবে ব্যবহার করছে দরিদ্র দেশগুলোকে। দরিদ্র দেশের সমুদ্রগুলো হয়ে উঠছে বর্জ্যের গুদাম। নবায়ন অযোগ্য জ্বালানির নির্বিচার দাপট নীরবে সহ্য করতে হচ্ছে নিরীহ দেশগুলোকে। বাংলাদেশও তা থেকে মুক্ত নয়। সিনজেন্টা, মনসান্তোর মতো প্রতিষ্ঠানের অগাধ-অবাধ পুঁজি যেমন বাজারব্যবস্থাকে বৈশ্বিক বাজারে পরিণত করেছে, দূষণকেও তেমনি বৈশ্বিক দূষণে পরিণত করেছে। দুঃখজনক যে বৈশ্বিক দূষণের অভিঘাতে আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোকেই ভুগতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

তৃতীয় শিল্প বিপ্লব কি প্রকৃতির সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় করতে পেরেছে? পারেনি। বরং তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের উপজাত সমস্যা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এখনো খাবি খাচ্ছে গোটা বিশ্ব। তৃতীয় শিল্প বিপ্লব বিশ্বকে উপহার দিয়েছে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, সিএফসি বা ক্লোরোফ্লোরো কার্বন। এসব ক্ষতিকর গ্যাস উপজাত হিসেবে এসেছে ধনবান সম্পদশালী পরমাণু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারী শিল্পোন্নত দেশগুলোর উৎপাদনব্যবস্থা থেকে। কার্বনের অতিমাত্রায় নিঃসরণ ওজোনস্তরকে ফুটো করেছে। আল্ট্রাভায়োলেট সরাসরি চামড়ায় ঢুকে যাওয়ায় ক্যান্সারসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশুদ্ধ অক্সিজেন বিরল পদার্থে পরিণত হয়েছে। বিশুদ্ধ পানি বিলুপ্তপ্রায়। পরমাণু বোমা নয়, পানিই হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই যে পৃথিবী ক্রমাগত কার্বনের গুদাম হয়ে উঠছে, এর মাসুল বিশ্ববাসীকে দিতে হচ্ছে পদে পদে। জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে। সাইক্লোন, দাবানল, সুনামি বৈশ্বিক উষ্ণতার আঘাত থেকে মুক্ত থাকতে পারছে কোন দেশ? চরম ভাবাপন্ন শীত গ্রীষ্ম বর্ষার অভিঘাত থেকেই বা মুক্ত থাকতে পারছে কোন দেশ? ক্যালিফোর্নিয়ার তাপমাত্রা যখন মাইনাস ৩০ অস্ট্রেলিয়ার তাপমাত্রা তখন ৪৭ ডিগ্রি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এখন বৈশ্বিক শীতলতা বৃদ্ধি নিয়েও ভাবতে হচ্ছে বিশ্ববাসীকে। শুধু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বা শীতলতা বৃদ্ধি নয়, জলবায়ুর যেকোনো অস্বাভাবিক আচরণ গোটা বিশ্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশও কি অস্বাভাবিক জলবায়ুর ক্ষতির শিকার নয়? কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ২০১৬ সালে যেখানে চা উৎপন্ন হয়েছিল ৮৫ মিলিয়ন কেজি, এই বছর সেই চা উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ মিলিয়ন কেজি। অতিবৃষ্টি ও রোদের অভাবে চায়ের পাতার কুঁড়ি ঠিকমতো বিকশিত হতে পারেনি। এবারের রেকর্ডভাঙা শীতের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোরো বীজতলায় কোল্ড ইনজুরি এবং ছত্রাক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর হাওর অঞ্চল মোকাবেলা করেছে অস্বাভাবিক পাহাড়ি ঢল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল। এ বছর আবার যখন বোরো ধানের বীজতলা তৈরির সময়, তখন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চরম ভাবাপন্ন শীতের কারণে। কিভাবে তাহলে জলবায়ুর এসব ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যাবে? বিশ্বায়নের সুফল দরিদ্র বা স্বল্পোন্নত দেশ পাক বা না পাক ক্ষতিটা পাচ্ছে। পশ্চিমের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর জীবনব্যবস্থার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষক। এ জন্যই বোধ হয় ইকোসাইড জেনোসাইডের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। ১ শতাংশের অতিমাত্রায় ভোগসর্বস্ব জীবনব্যবস্থার কারণে গোটা পৃথিবী আজ বিপন্ন। অথচ উৎপাদন ও উন্নয়নের নামে প্রকৃতিবিনাশী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে প্রতিযোগিতা তা থেকে কোনো দেশ বেরিয়ে আসতে রাজি নয়। এই যে আমরা বলছি জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন, এই অস্বাভাবিকতা প্রকৃতি নিজে করেনি, তাকে দিয়ে করানো হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য থাকবে কি থাকবে না সেটা নির্ভর করছে কী ধরনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা ক্ষমতাধর দেশের মানুষ গড়ে তুলল তার ওপর। উৎপাদনব্যবস্থা পরিবেশবিধ্বংসী হলে বৈশ্বিক জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঠেকানোর ক্ষমতা কারো নেই। জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে প্রাণবৈচিত্র্য চুক্তি বাধ্যতামূলক। মজার ব্যাপার হচ্ছে, চুক্তিতে স্বাক্ষর করে আসার পরই ক্ষমতাধর দেশগুলো প্রাণবৈচিত্র্যবিরোধী নীতিমালা প্রয়োগ করতে থাকে। জীব, অণুজীব, কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র  আরো অদৃশ্য কোটি কোটি প্রাণকে প্রতি মুহূর্তে হত্যা করা হচ্ছে। বৃক্ষের মতো সর্বস্ব দানকারী প্রাণকেই বাঁচাতে অনাগ্রহী মানুষ। এ পরিস্থিতিতে প্রাণবৈচিত্র্য শব্দটিও তাই আভিধানিক অর্থের চেয়ে বেশি কিছু তাৎপর্য বহন করে না।

পরিবেশ নিয়ে আমাদের নীতিমালাও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। কেউ যদি দক্ষিণে সুন্দরবন অঞ্চলে যান তো দেখবেন কিভাবে চিংড়ি চাষের জন্য সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেন্ট মার্টিনস প্রতিবেশগত সূত্রে সংকটাপন্ন এলাকা। জাহাজভাঙা টন টন লোহার চূর্ণ চুষে নিয়েছে বঙ্গোপসাগরের স্নিগ্ধতা। পদ্মা মেঘনা যমুনার মতো তিন অমেয় নদীর মোহনা বাংলাদেশ। অফুরন্ত স্রোতোধারার সেই দেশের মানুষকে পানি কিনে খেতে হয়। বাংলাদেশের মানুষ কি কখনো ভেবেছে পানি কিনে খেতে হবে? লালন মরল জল পিপাসায় থাকতে নদী মেঘনার মতো দশা। একসময় যেমন আমরা ভাবতে পারিনি পানি কিনে খেতে হবে; এখন ভাবতে পারছি না বটে, তবে একসময় বিশুদ্ধ বাতাসও কিনে খেতে হবে। গাছ নেই তো অক্সিজেন নেই। চীন যেমন এখন বিশুদ্ধ বাতাস বোতলে কিনে খাচ্ছে। বিপর্যয় যতক্ষণ চোখের সামনে না ঘটছে ততক্ষণ আমরা কিছুই টের পাই না। আমাদের চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পানির উৎস, বন-গাছপালা। তা নিয়ে নীতিনির্ধারকরা খুব চিন্তিত বলে মনে হয় না। গ্রিনহাউস গ্যাস প্রশ্নে, কার্বন নিঃসরণ প্রশ্নে, পরিবেশ ও প্রাণ রক্ষার প্রশ্নে, তাদের নীতি কি, আমরা তাও বুঝি না। সবুজের মৃত্যুর সঙ্গে বাংলাদেশের মৃত্যু অবধারিত। আর সবুজের বাঁচার সঙ্গে এই জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার সম্পর্ক যুক্ত। সেই সবুজের জীবন নিয়ে কী পরিকল্পনা, কী নীতি জানি না। পানি, বাতাস, আলো প্রকৃতির সাধারণ সম্পদ। কিন্তু এই সাধারণ সম্পদের ৮০ শতাংশ ভোগ করছে ২০ শতাংশ মানুষ। বাকি পৃথিবী প্রায় বিনা প্রতিবাদে তা মেনে নিচ্ছে। অবস্থার আরো অবনতি হলে বঞ্চিত এই ৮০ শতাংশ মানুষকে কি পানির মতো বাতাস এবং রোদও কিনে খেতে হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত। আসছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এবং তা নিয়ে বিশ্ববাসীর আগ্রহেরও কমতি নেই। মুনাফাতাড়িত ও তথাকথিত সভ্য দেশের উন্নয়ন দর্শনের পরিবর্তন না হলে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন রোধ অসম্ভব। একই সঙ্গে এও সত্য, বিগত দিনের উন্নয়ন দর্শনের দগদগে ঘা বহাল রেখে যে চতুর্থ বিপ্লব আসবে, তা যে বিশ্বের বহু প্রাণের জন্যই প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। এটা যে নিশ্চিত তা আগাম বলে দেওয়া যায়।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

কালের কন্ঠ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

শেয়ার করুন