বিচার মানি, কিন্তু যশোর রোডের গাছ আমার

প্রভাষ আমিন 

এক পাগল গুলতি দিয়ে শহরের বিভিন্ন বাড়ির গ্লাস ভাঙত। তাকে পাগলা গারদে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হলো। মোটামুটি ভালো হওয়ার পর ডাক্তাররা তাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ছাড়ার আগে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তারা তার সঙ্গে কথা বলছিলেন। ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন, ছুটি পেলে আপনি কোথায় যাবেন? তিনি তার প্রিয় এক বান্ধবীর কাছে যাওয়ার কথা বললেন। ডাক্তাররা ভাবলেন, যাক সুস্থ মানুষের মতোই আচরণ। ডাক্তাররা জানতে চাইলেন, তারপর কী করবেন? তিনি বললেন, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হব। খুশি গোপন করে ডাক্তার বললেন, তারপর? তিনি বললেন, এরপর তার পোশাক খুলব। ডাক্তাররা তার সুস্থতা নিশ্চিত হয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। পাশ থেকে এক দুষ্টু ডাক্তার জানতে চাইলেন, এরপর কী করবেন? এবার ক্ষেপে গিয়ে সেই পাগল বললেন, তার ব্রা’র ফিতা দিয়ে গুলতি বানিয়ে জানালার গ্লাস ভাঙব। আমার অবস্থাও এই গল্পের পাগলের মতো।

গত ১০-১২ দিন ধরে আমি যশোর রোডের গাছ নাকাটার দাবি জানিয়ে আসছি। এই সময়ে ফেসবুকে, অনলাইনে, অফলাইনে, টিভি টক শো’তে গাছ বাঁচানোর পক্ষে কথা বলেছি, লিখেছি, তর্ক করেছি। এটা করতে গিয়ে গাছ কেন কাটতে হবেই, তার পক্ষে অনেকগুলো অকাট্য যুক্তি শুনেছি। সত্যি বলছি, অনেকগুলো যুক্তির সামনে আমার জবাব ফুরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সব যুক্তি শুনেটুনে আমার অবস্থা সেই পাগলের মতো। সব ঠিক আছে, কিন্তু গাছ কাটা যাবে না। বিচার মানি, কিন্তু যশোর রোডের গাছ আমার চাই-ই চাই।

যশোর রোডের অনেক ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে। ১৮৪০ সালে জমিদার কালি পোদ্দার তার মা যশোদা দেবীর গঙ্গা স্নানের আকাঙক্ষা পূরণ করতে মাত্র দুই বছরে যশোর থেকে কলকাতার কালিঘাট পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। পরে মায়ের ইচ্ছাতেই সেই রাস্তায় বিদেশ থেকে এনে দ্রুত বর্ধনশীল নানা গাছ লাগিয়েছিলেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই রাস্তা ধরেই কোটি শরণার্থী পাড়ি জমিয়েছিলেন ভারতে। মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ যশোর রোডের ভারতীয় অংশ ঘুরে শরণার্থীদের দুর্দশা দেখে ফিরে গিয়ে লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। যে কবিতায় পরে সুর দিয়ে গেয়েছিলেন তার বন্ধু বব ডিলান। পরে সেই গানের বাংলা অনুবাদ গেয়েছেন মৌসুমী ভৌমিক। যারা গাছ কাটার পক্ষে তার এক কথায় এইসব জোলো আবেগ উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাদের কথা হলো, আবেগ দিয়ে পেট ভরবে না। আমাদের চাই উন্নয়ন। আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে হলে তো গোটা বাংলাদেশই সংরক্ষণ করতে হবে। দারুণ অকাট্য যুক্তি। আজকের লেখায় তাই আমি কোনো আবেগের কথাই বলব না।

কয়েক দিন আগে একটা সিনেমার পোস্টার দেখেছিলাম, ‘মা বড় না বউ বড়’। এই প্রশ্নের কী জবাব আছে আপনার কাছে? যারা গাছ কাটার পক্ষে তারাও মুখের ওপর প্রশ্ন করেন, ‘আপনার কাছে মানুষ বড় না গাছ বড়?’ গাছ না কেটে রাস্তা সম্প্রসারণ করলে নাকি অনেক ঘরবাড়ি ভাঙা পড়বে, উচ্ছেদ হবে অনেক মানুষ। গাছ কাটার এমন অকাট্য যুক্তির কী জবাব দিই বলুন তো। অনেকে বলছেন, এমনিতেই এই গাছগুলোর বয়স হয়ে গেছে। সময় ফুরিয়ে গেছে। তাই এই গাছগুলো কেটে রাস্তা সম্প্রসারণ করে পরে প্রয়োজনে আবার গাছ লাগানো যাবে। অনেকে বলছেন, মহাসড়কের পাশে গাছ লাগানোরই দরকার নেই। উন্নত বিশ্বের নাকি কোথাও মহাসড়কের পাশে গাছ নেই। রাস্তায় গাছ থাকলে নাকি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। গাছের ডাল পড়ে মানুষ মারা যায়। তারা যশোর রোডে এমন অনেকগুলো দুর্ঘটনার উদাহরণও দেন। তাদের যুক্তি শুনে আমার গাছপ্রেম টলে যায়। ইচ্ছা হয়, এক্ষুনি কুড়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি এবং দেশে সড়কের পাশে যত গাছ আছে সব কেটে সাবাড় করে ফেলি। আগে তো মানুষের জীবন, তারপর গাছ। গাছের জন্য মানুষ না মানুষের জন্য গাছ। কেউ কেউ এমনও বলছেন, আগে মানুষ হেঁটে চলাচল করত বলে ছায়ার জন্য রাস্তার পাশে গাছ লাগা। এখন তো মানুষ চলাচল করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে। তাই ছায়া দিয়ে সে কী করবে? এত সব যুক্তি শুনে আপনার কী মনে হচ্ছে? আমার তো ইচ্ছা হচ্ছে, শুধু রাস্তার পাশের নয়, দেশের সব বন-জঙ্গল উজাড় করে সেই কাঠ দিয়ে ফার্নিচার বানাই। আর খালি জায়গায় ফরেস্ট হাউজিং বানিয়ে সুরম্য সব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন বানাই। ভাবুন তো কত হাজার কোটি আয় করা সম্ভব? আমার মতো কিছু অবুঝ লোক আর উন্নয়নবিরোধী পরিবেশবাদীরা গাছের জন্য মায়াকান্না কেঁদে আসলে উন্নয়নের জোয়ার আটকে দিতে চাইছি। এই পরিবেশবাদীরা নিশ্চয়ই বিএনপি-জামায়াতের চর, মানবতাবিরোধী অপরাধী।

এসব যুক্তি শুনে আমি হাসব না কাঁদব ভেবে পাই না। এমনিতে সুন্দরবনের বাঘ বাঁচাতে বিশ্বজুড়ে নানা উদ্যোগ আছে। বেশ কয়েক বছর আগে খবর আসছিল, সুন্দরবনের বাঘ লোকালয়ে এসে মানুষকে মেরে ফেলছে। তখন জয়নাল হাজারী সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি তখন যুক্তি দিয়েছিলেন, বাঘ যেহেতু মানুষ মারছে, তাই সব বাঘ গুলি করে মেরে ফেলা হোক। বাঘ রেখে লাভ কী? এ যুক্তি মানলে বিশ^কে মানুষের জন্য বাসযোগ্য ও নিরাপদ করতে বাঘ, সিংহ, হাতি, কুমির, সাপসহ সব সব হিংস্র ও ভয়ংকর প্রাণী হত্যা করা উচিত। তাহলেই মানুষ আরাম করে ঘুরে বেড়াতে পারবে।

যারা এসব যুক্তি দেন এবং বিশ্বাস করেন; তাদের বোঝানোর সাধ্য আমার নেই। আমি বড়জোর তাদের জন্য করুণা করতে পারি। সবকিছু যারা টাকার অঙ্কে মাপে তারাই আসলে মানবতার শত্রু, উন্নয়নের শত্রু। এই পৃথিবীটা কিন্তু শুধু মানুষের বাসের জন্য নয়। গোটা বিশ্বই একটা দারুণ সুতায় গাঁথা। প্রকৃতি নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারে। আমরা মানুষরা প্রকৃতির সেই স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দিই। এবং বিশ্বকে ক্রমেই বাসের অযোগ্য করে তুলি। এভাবে একদিন পৃথিবী ধ্বংস করবে মানুষই। এভাবে গাছ কেটে, বন উজাড় করে, নদীতে বাঁধ দিয়ে, পাহাড় কেটে পৃথিবীকে আমরা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছি। প্রকৃতিকে বাধা দিলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। এই যে এখন পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে, বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হয়ে যাচ্ছে, বৃষ্টিও বেশি হচ্ছে, শীতও বেশি পড়ছে, তুষারপাতও বাড়ছে, পাহাড়ধস হচ্ছে। এসবই কিন্তু প্রকৃতির প্রতিশোধ। আপনি গোটা বিশ্বকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করে ফেলতে পারবেন?

সমস্যাটা হলো যশোরের স্থানীয় মানুষ, জনপ্রতিনিধি সবাই গাছ কাটার পক্ষে। আমরা যারা বিরোধিতা করছি, তাদের দরদটা ‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’ মনে হতে পারে। চোখের সামনে বেড়ে ওঠা এই শতবর্ষী গাছগুলোর জন্য তাদের মায়া নেই কেন? হিসাবটা সহজ। গাছ না কেটে, এক পাশের গাছকে ডিভাইডার করে রাস্তা বড় করতে হলে নতুন অনেক জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। শুধু যশোর রোডে নয়, যে কোনো উন্নয়নকাজ করতে হলেই মানুষ উচ্ছেদ করতে হবে। পদ্মা সেতুর জন্য করতে হয়েছে। নতুন বিমানবন্দর করতে হলে লাগবে। কিন্তু মানুষের ঘরবাড়ি আর উচ্ছেদের কথা ভাবলে তো কোনো উন্নয়ন কাজই  এগোবে না। বাস্তবতা হলো, উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, পুনর্বাসন করতে হবে। অনেকে একটি গাছ কেটে পরে পাঁচটি গাছ লাগানোর যুক্তি দেন। বা গাছের বয়স হয়ে যাওয়ার অজুহাত দিচ্ছেন। প্রথম কথা হলো, গাছ পড়ে দুর্ঘটনার জন্য তো গাছ দায়ী নয়, মানুষই দায়ী। বয়স হলে মানুষের যেমন পরিচর্যা লাগে, গাছেরও লাগে। পরিচর্যা না করলে তো গাছ আপনার মাথার ওপরই পড়বে। আর একশটি গাছ লাগিয়েও একটি শতবর্ষী গাছের ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। একটি শতবর্ষী গাছ তৈরি করতে আপনার তিন প্রজন্ম লাগবে। রেইনট্রি গাছ ৫০০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। আপনি তাকে দেড়শ বছরেই কেটে ফেলতে চাইছেন। যশোর রোডের দুই হাজার ৩১২টি গাছকে ঘিরে সেখানে জীববৈচিত্র্যের যে বিশাল আবহ গড়ে উঠেছে; আপনি কত হাজার কোটি টাকায় তা পুনর্নির্মাণ করতে পারবেন?

গাছ যতই অপ্রয়োজনীয়, বিপজ্জনক হোক; গাছ বাঁচাতে দেশে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় নামে একটি মন্ত্রণালয় আছে। সে মন্ত্রণালয়ের একজন পূর্ণ মন্ত্রীও আছেন। কিন্তু যশোর রোডের গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে মন্ত্রণালয়কে জিজ্ঞাসাও করা হয়নি। সংবিধান অনুযায়ীও পরিবেশ রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। আর সরকারকে সে দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ছয় মাসের জন্য যশোর রোডের গাছ কাটা স্থগিত ঘোষণা করেছেন। আশা করি, এই ছয় মাসে সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। টাকার অঙ্কে গাছের মূল্য মাপবেন না তারা। গাছ যে অমূল্য, সেটা তারা বুঝতে পারবেন। এবং আবেগ ঊর্ধ্বে তুলে ধরেও প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশের স্বার্থ বিবেচনা করে গাছগুলো রক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

প্রভাষ আমিন: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ

শেয়ার করুন