প্রান্তিক মানুষের জয়ী হওয়ার গল্প

আবদুল বায়েস

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পের কথা নিশ্চয়ই অনেকের জানা থাকার কথা। একবার অসুস্থ জয়নাবের খুব ইচ্ছা হয়েছিল দুধভাত খেতে। তাঁর ইচ্ছাটা গরিবের ঘোড়ারোগ নয়, খুব মামুলি একটা শখ। জয়নাবদের অবশ্য একটা গাভি ছিল কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে সেটা হাতছাড়া হয়ে যায়। তা ছাড়া যখন গাভি ছিল তখন দুধের বিনিময়ে চাল আনতে হতো। ব্যাপারটি এমন যে দুধ দুইয়ে নিত সচ্ছল প্রতিবেশী আর গাভির মালিক প্রতিবেশীর দোকান থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে আনত। যা হোক, বছরে দু-একবার স্বামী কসিমুদ্দিন মক্তব থেকে বাড়ি এলে পোয়া দেড়েক দুধ ঘরে রাখার রেওয়াজ ছিল। জয়নাব দেড় পোয়া দুধের সঙ্গে দেড় সের চালের ভাত দিয়ে, গুড় দিয়ে ও একটা শবরি কলা দিয়ে মাখাত। সেই মাখানো ভাত খেত বাপ-বেটা ঝিয়ে মিলে ছয়জন। জয়নাবের জন্য বরাদ্দ থাকত শেষ দুই লোকমা। এবার যখন জয়নাবের দুধভাত খাওয়ার ইচ্ছা জাগল, ভুলবশত চালের গুঁড়িসহ ভাতকে দুধভাত মনে করে সে পিত্তজুড়ে খায় এবং এ সময়েই তার রক্তবমি শুরু হয়। ‘চাওয়ার অপূর্ণতা’ নিয়ে শেষ যাত্রা করে জয়নাব।

আমি এখন সিলেট জেলার বানিয়াচং উপজেলার চার জয়নাবের কথা বলব। ‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পের জয়নাবের মতো জীবনযাপনকারী চারজন নারী তথা তাঁদের পরিবারের কাছে একটা সময় ছিল যখন ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। সবারই কমবেশি দুধভাত খাওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল। কারো পান্তা ছিল কিন্তু নুন ছিল না আবার কারো কপালে পান্তাই ছিল না, নুন তো দূরের কথা। আমার কাছে মনে হয়েছে, যে চার নারীর কথা বলতে যাচ্ছি, তাঁরা নক্ষত্রসম। এঁদের সবার দুধভাত খাওয়ার প্রচণ্ড শখ ছিল এবং সেই শখ সবটুকু না হলেও আংশিক পূর্ণ হয়েছে। তাঁদের বাড়ি এমন অনুন্নত এলাকায় যেখানে যেতেই জীবন প্রায় জেরবার। বানিয়াচং ব্র্যাক অফিসে চার ‘জয়নাবের’ মুখোমুখি আমি এবং সহকর্মী শোয়েব আহমেদ। হাওরাঞ্চলের হা-হুতাশ বিশেষত গেল প্রলয়ংকরী বন্যার পর কান্নাকাটিতে যখন আকাশ ভারী, ভাবলাম তখন সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে কি বাতি নেই, নেই কোনো বাতিঘর? এখন যে চার নারীর কথা বলব, তাঁরা সরকারি কিংবা দাতাদের নথিতে হতদরিদ্র হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ দৈনিক মাথাপিছু মাত্র এক হাজার ৮০০ ক্যালরি গ্রহণ করেন, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন দুই হাজার ১০০ ক্যালরির চেয়ে প্রান্তিক বেশি। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে এঁরা থাকার কথা এবং থাকছেন কেউ কেউ। তবে কারো কাছে সরকারি সুবিধা অনেকটাই সোনার হরিণ।

ধান ভানতে শিবের গীত শেষে পাঠকের সঙ্গে প্রথমে আলাপ করিয়ে দিই আনোয়ারা বেগমকে। বয়স বড়জোর ৪৫, লেখাপড়া নেই, তবে যে করেই হোক দস্তখত দিতে শিখেছেন। শুধু তা-ই নয়, মোবাইল ফোনের নম্বরটি চাওয়া মাত্র গড়গড় করে ইংরেজিতে সংখ্যাগুলো বলার পর মনে হলো তিনি আঁধার পেরিয়ে আলোর পথের যাত্রী। কী করে সর্বহারারা সূর্য ছিনিয়ে আনে সে ইতিহাসে পরে আসব, তার আগে পূর্বকথন পাঠ করা যাক।

আনোয়ারা আপার স্বামী সাবির মিয়া (৫০) একজন নিরেট দিনমজুর। খানাটির নিয়ন্ত্রণে নিজস্ব কোনো জমি নেই। আক্ষরিক অর্থে দুই ছেলে দুই মেয়েসহ মোট ছয়জন খানেওয়ালার খানা। একমাত্র রোজগেরে দিনমজুর সাবির মিয়া একদিন থেকেও নেই হয়ে গেলেন যখন তাঁর চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম—সংসারে বুকপানি। এসব খানার ঘরদোরের বর্ণনা দেওয়া নিতান্তই বাহুল্য;  ভাঙা ঘর, ভাঙা বেড়া, ভাঙা চালা। দিনে পেটপুরে দুবেলা খেতে পারতেন কি না সন্দেহ। মানুষের বাড়িতে কাজ করেন, মানুষের কাছ থেকে কর্জ করে কোনোমতে সংসার সামাল দিতেন আনোয়ারা বেগম তথা আজকের গল্পের নম্বর ওয়ান।

ওপরের পরিচ্ছেদের বেদনাবিধুর বয়ান চার বছরের পুরনো কাসুন্দি। এরই মধ্যে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় যেমন অনেক জল গড়িয়েছে, সব উত্থান-পতন শেষে  আনোয়ারা আপার বর্তমান অনেকটাই রূপকথার মতো মনে হবে।

বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করি, আপনার খানায় কী কী সম্পদ আছে? প্রথমেই উল্লেখ করলেন সাতটা গবাদি পশুর কথা—চারটা গাভি ও  তিনটা ষাঁড়। বর্তমান বাজারমূল্যে এগুলোর দাম দুই লাখ টাকার নিচে তো নয়-ই।  হাঁস-মুরগি যে কয়টা তার দাম পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। গেল চার বছরে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করে টিনের ঘর তৈরি করেছেন। আগে একই ঘরে মানুষ ও পশু পাশাপাশি ছিল, এখন আলাদা। এ পর্যন্ত ১০, ১৫, ২০ ও ৩০ হাজার টাকার চার-চারটি ঋণ নিয়েছেন।  যাঁরা মনে করেন ঋণ নেয় ঋণ না পরিশোধের জন্য, সেই সমালোচকদের জবাব দিলেন এই তথ্যে যে শুধু শেষ ঋণের তিনটা কিস্তি বাকি আছে। ঋণের টাকায় ঘি খেতে পারতেন, এবং অনেকে তা-ই করে, কিন্তু মাটি কামড়ে লোভ সামলে উৎপাদনশীল কাজে প্রতিটি পয়সা খরচ করেছেন। আমরা না হয় ঋণের টাকা ব্যবহারসংক্রান্ত একটা হিসাব নিই তাঁর কাছ থেকে। এক. ঋণের টাকায় তিন কেয়ার জমি বন্ধক নিয়ে (২৮ শতাংশ = ১ কেয়ার) ধান পেয়েছেন ৭০ মণ এবং স্বামী সাবির মিয়াকে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসায় নামিয়েছেন। ঘরে থাকা শোকেস ও রঙিন টিভির দাম ১৫ হাজার টাকা; তিনটা ফ্যান ও তিনটা বাতিসহ বিদ্যুৎ খরচ নেহাত কম নয়। আগে ছেঁড়া মাদুরে মেঝেতে শুতেন; এখন ঘরে তাঁর তিনটা চৌকি।

আমার সঙ্গীরা বলতে থাকেন, বলেন বলেন আর কী কী আছে। আমি বলি, যা যা আছে বা ছিল তা তো বলাই হলো। আবার কি। আনোয়ারা আপা লাজুক মুখে বললেন, ‘হ, আছেই তো। ঘরে দুইটা মোবাইল ফোন আছে, আর একটা ১৩ হাজার টাকার ডিপিএস। প্রতি মাসে ২০০ টাকা কিস্তি দেই। স্বামীকে একটা শান মেশিন কিনে দিছি, যাতে কোরবানির ঈদে ছুরি ধারাবার ব্যবসাটা হাতিয়ে নেওয়া যায়; আলাদা গরুর ঘর তো আছেই, ভুইল্লা গেছিলাম।’

আর কিছু কি ভুলে গেছেন বলে মনে হয়? আমি জানতে চাই। ঘোমটায় অবনত শিরে লাজুক স্বরে  শোধালেন ‘হ, ১৬ হাজার টাকার ছয় আনা সোনার কথা ভুইলা গেছিলাম।’

মোট কথা, ২০১৩ সালের ও ২০১৭ সালের আনোয়ারা বেগমের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। ‘আগে ৫০০ টাকা ঋণের জন্য মানুষের পিছে কত ঘুরছি, কেউ গরিব বইলা পাত্তা দিত না; এখন চাইলে ৫০ হাজার টাকা যে কেউ যেকোনো সময় দিতে চায়।’

তেমনি ভালো আছেন দুলেনা আপা। স্বামী ভূমিহীন দিনমজুর। সন্তানের সংখ্যা ছয় ছেলে নিয়ে চার বছর আগে একটা দিন ছিল সাত দিনের সমান। প্রকট অভাবে দিন বড় থাকে। যেন যেতে চায় না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জীবন চলে করুণার পাত্রের। চার বছর বাদে এখন ছেলেরা পড়াশোনা করছে, শুধু বড়জন বাবার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে। বাড়িতে থাকা গবাদি পশুর মূল্য প্রায় এক লাখ টাকা। তার খানার একটা অটোরিকশা থেকে দৈনিক ভাড়া পান ২০০ টাকা; জমা বা সঞ্চয় ৩০ হাজার টাকা, ঘরে তিনটা মোবাইল ফোন; টিভিও আছে। ৫৬ শতাংশ জমি বন্ধক নিয়ে ৩০-৩৫ মণ ধান ঘরে তুলেছেন। তিন রুমের ঘর।

সাদেকা আপার ঘরে এখন বিদ্যুতের বাতি আর ফ্যান, শোকেস, চৌকি। আছে দুটি বীমা, আছে নিজের নামে এক লাখ টাকা দামের দুই শতক জমি। জেসমিন চৌধুরীর গবাদি পশুর দাম প্রায় ৭০ হাজার টাকা; মাছ চাষে ৮০ হাজার টাকার দুটি শেয়ার। চৌকি ও বিদ্যুতের বাতির ফ্যান তো আছেই। সংসার চলছে গাভির দুধ বিক্রি করে, আর ভাইয়ের ব্যবসা থেকে উপার্জন দিয়ে। সন্তানেরা স্কুলে।

এই চার নারী চার বছর আগে ব্র্যাকের Targeting Ultra Poor (TUP), বাংলায় বোধ হয় হবে ‘নিশানা হতদরিদ্র’ কর্মসূচির আওতায় সর্বসাকল্যে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা মূল্যের সম্পদ ও তার সঙ্গে ২৮ সপ্তাহের জন্য ভোগবৃত্তি পেয়েছিলেন। সম্পদ আয়ে রূপান্তরকালে কঠোর নজরদারি ও শৃঙ্খলার মধ্যে থাকতে হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও কেউ উঠে আর কেউ নামে কেন?

এক. সম্পদ হস্তান্তর যথেষ্ট শর্ত নয়। সুবিধা গ্রহণকারীর বয়স অপেক্ষাকৃত কম থাকা বাঞ্ছনীয়। আমাদের আলোচিত চার নক্ষত্রের প্রত্যেকের গড় বয়স ৩০-৪৫ বছর। দুই. সম্পদ স্বত্বাধিকার ও সুযোগের মধ্যে সংযোগ থাকতে হবে। এই চার নক্ষত্রসম নারী দেয় সম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য বাজার উৎসারিত সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পেরেছেন বলে মনে হয়।  তিন. এই চার নক্ষত্রসম নারী প্রথম থেকে শিক্ষার ওপর প্রচণ্ড জোর দিয়েছেন, যদিও নিজেরা লেখাপড়া করার খুব একটা সুযোগ পাননি। চার. এই চারজনের মধ্যে   উদ্যমী ও উদ্যোক্তা আচরণ অত্যন্ত বেশি। তার বড় প্রমাণ আয় বহুমুখীকরণ ও মানব পুঁজি গঠনে তাঁদের নিরন্তর প্রচেষ্টা। তাঁরা ‘উইলিং হর্স’ যাঁরা বহু ক্রোশ হেঁটে গিয়েও পানি পান করতে চান; যাঁরা মনে করেন প্রাপ্ত সুযোগে সামনে ডু অর ডাই পরিস্থিতি আর পিঠ ঠেকেছে পেছনের দেয়ালে; যাঁরা ভেবেছেন এই সুযোগ চলে যাওয়া মানে ট্রেন মিস করে অন্ধকার স্টেশনে, ঘুপচিঘাপচিতে নরপশুদের শিকার হওয়া; সন্তান-সন্ততি নিয়ে দুর্ভিক্ষের শিকার হওয়া।

ঢাকা ফেরার সময় হয়। করোটিতে তখন এই মাত্র পেছনে ফেলে আসা নক্ষত্রসম চার নারী তথা জয়নাবরা। মনে হলো,  মনোজাগতিক ক্ষেত্রে এঁরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আস্থাশীল, সমাজের মানুষ এখন তাঁদের দাম দেয়। এই চারজনই আক্ষরিক অর্থে সংসারের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন; প্রয়োজনবোধে স্বামীর সঙ্গে পরামর্শও করেন। মোটকথা, বদ্ধমুষ্টি উঠিয়ে বলতে পারছেন, আমরা করব জয় এক দিন।

লেখক : সাবেক উপাচার্য
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

উৎস : কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন