পরশ্রীকাতর বাঙালি

মোস্তফা কামাল

কফিল উদ্দিন মেধাবী ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসনে মাস্টার্স করেছে। বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর চাকরির জন্য ছোটাছুটি করছে। কিন্তু কোথাও কোনো সুখবর নেই। সে মনে মনে বলে, চাকরি আমার ভালো লাগে না। আমার মন চায় লেখালেখি করতে, সাংবাদিকতা করতে। কার কাছে যাই। কে আমাকে সহযোগিতা করবে?

কফিল উদ্দিন জানতে পারে, তার এলাকার এক বড় ভাই হুমায়ুন কবির বিখ্যাত সাংবাদিক। তিনি লেখক হিসেবেও ব্যাপক পরিচিত। কফিল উদ্দিন হুমায়ুন কবিরের কাছে যাবে বলে মনস্থির করে। পরে সে তাঁর কাছে যায় এবং তার পরিবারের টানাপড়েনের কথা জানায়। তারপর সে বলে, আমার জন্য কোথাও কি কোনো ব্যবস্থা করা যায়?

হুমায়ুন কবির বললেন, পত্রিকা অফিসে তুমি কী চাকরি করবে? তোমাকে দিয়ে সাংবাদিকতা হবে? তুমি দুকলম লিখতে পারো?

জি, পারি। আমার অনেক গল্প-কবিতা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।

কোন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে?

কফিল উদ্দিন কিছু পত্রিকা এগিয়ে দিয়ে বলে, এই যে দেখেন!

ধমকের সুরে হুমায়ুন কবির বললেন, দূর মিয়া! এগুলো কোনো পত্রিকা হলো? যাও যাও! লেখালেখি বড় কঠিন কাজ। এসব তোমাকে দিয়ে হবে না। তুমি অন্য চেষ্টা করো। বুঝতে পারছ?

হুমায়ুন করিরের কথায় মন খারাপ হলো কফিল উদ্দিনের। সে মনে মনে ভাবে, সেও একদিন হুমায়ুন কবিরের মতো বড় সাংবাদিক হবে। বড় লেখক হবে।

কফিল উদ্দিন ঢাকা শহরে বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে যায়। একটা চাকরির সন্ধান করে। কেউ তাকে চাকরি দিতে রাজি হয় না। গল্প, কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠায়। কেউ ছাপায় না। কফিল উদ্দিন মনে মনে ভাবে, হঠাৎ কী হলো! তাহলে কি আমার লেখা কিছুই হচ্ছে না! অবশ্যই আমাকে ভালো লিখতে হবে।

এভাবে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু সে ধৈর্য হারায় না। সে লেগে থাকে। অপেক্ষা করতে করতে একদিন তার সুসময় আসে।

দেশের একটি বড় পত্রিকায় কফিল উদ্দিনের কবিতা ছাপা হয়। তারপর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। বিভিন্ন পত্রিকায় তার গল্প-কবিতা ছাপা হয়। সে গল্প-কবিতা চোখে পড়ে হুমায়ুন কবিরের। তিনি মনে মনে ভাবেন, কফিল উদ্দিন ছেলেটা আমার এলাকার না! ও তো আমার কাছে এসেছিল। ও তো দেখছি আমার চেয়ে বড় লেখক হয়ে যাচ্ছে! এলাকায় সবাই জানে, আমি একাই লেখক-সাংবাদিক। এই ছেলে তো দেখছি আমাকে পেছনে ফেলে দেবে! এটা কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না।

হুমায়ুন কবির বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদের ফোন দিয়ে বললেন, আপনারা কী সব লেখা ছাপেন ভাই! এসব কোনো লেখা হলো?

সাহিত্য সম্পাদক বললেন—কোন লেখাটা, ভাই?

ওই যে কফিল উদ্দিনের একটা লেখা ছাপলেন।

কেন, ভাই? লেখাটা তো ভালো!

আরে কী বলেন? ওসব কোনো লেখা হলো?

এরপর পর্যায়ক্রমে সব পত্রিকা অফিসে ফোন করে একই কথা বলেন। কিন্তু কফিল উদ্দিনকে দমানোর সাধ্য কার? কফিল উদ্দিন দুই হাতে লিখছে। সেই লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। এর মধ্যে বইও বের হয়ে যায় তার। বই বের হওয়ার খবর দেখে হুমায়ুন কবির ঈর্ষায় জ্বলে-পুড়ে মরেন। তিনি মহাবিরক্ত হয়ে প্রকাশককে ফোন করে বলেন, আরে ভাই! আপনি আর লেখক পাইলেন না?

প্রকাশক বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চান—কেন ভাই, কী হয়েছে? সমস্যা কী?

হুমায়ুন কবির বললেন, কফিল উদ্দিন কোনো লেখক হলো? আপনি তার বই কী বুঝে ছাপলেন?

প্রকাশক পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কী বুঝে ছাপলাম মানে! আপনি আমাকে কী ভেবেছেন, বলুন তো?

না, না! মানে আপনি পড়েছেন কি না বইটা?

অবশ্যই পড়েছি। খুব ভালো লেখা। যে-সে বই কি আমরা ছাপি?

হুমায়ুন কবির কিছুটা হোঁচট খেলেন। তিনি দেখলেন, কফিল উদ্দিনকে কিছুতেই আটকানো যাচ্ছে না। এখন উপায় কী? তিনি মনে মনে ভাবলেন, ওই বই সম্পর্কে নেতিবাচক রিপোর্ট করাতে হবে। পরে তিনি তাঁর পত্রিকার রিপোর্টারকে ডেকে কফিল উদ্দিনের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা দিলেন। রিপোর্টার কফিল উদ্দিনের বই না পড়েই আজেবাজে কথা পত্রিকায় লিখে দেয়। আর তাতে ফল হয় উল্টো। কফিল উদ্দিনের বইয়ের বিক্রি বেড়ে যায়।

হুমায়ুন কবির চিন্তায় পড়েন। তিনি মনে মনে ভাবেন, কফিল উদ্দিনকে আটকানোর পথ কী? ঠিক তখনই একটি জাতীয় পত্রিকার সম্পাদক তাঁকে ফোন করেন। হুমায়ুন ভাই, কফিল উদ্দিনকে চেনেন নাকি?

কেন, ভাই? কোনো সমস্যা করেছে নাকি? হুমায়ুন কবির জানতে চান।

না, না। সমস্যা করেনি। সহসম্পাদকের চাকরির আবেদন করেছে। সেখানে আপনার নাম রেফারেন্স হিসেবে দিয়েছে।

হুমায়ুন কবির বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, ও মাই গড! সে এখন আমার নাম বেচা শুরু করেছে! ওকে চাকরি দিয়েন না, ভাই! ছেলেটা খুব একটা সুবিধার না।

তাই! কিন্তু আমার তো বেশ ভালো মনে হলো!

তা হলে দেন। দিয়ে ধরা খান। আমার ওপর তখন দোষ চাপাবেন না।

ঠিক আছে।

কফিল উদ্দিনের চাকরি হয়ে গেল। লেখালেখিতেও দ্রুতগতিতে এগোতে লাগল। তারপর পুরস্কার পাওয়াও শুরু করল। কফিল উদ্দিনের উত্থান মানতে পারেন না হুমায়ুন কবির। তিনি কফিল উদ্দিনের পেছনে লাগেন। তার খুঁত ধরার চেষ্টা করেন। তার লেখালেখি নিয়ে নানা সমালোচনা শুরু করেন। কফিল উদ্দিনের প্রতি তাঁর ঈর্ষা হিংসায় পরিণত হয়। তাতে বারবার বিদ্ধ হলেও কফিল উদ্দিন কিন্তু মনোবল হারায়নি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

(কালের কন্ঠ অনলাইন থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন