দারিদ্র্য নির্মূলে উজ্জ্বল সাফল্য আর উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ

ড. শামসুল আলম

রাষ্ট্র ও সমাজের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনে দারিদ্র্য বিমোচন একান্ত জরুরি। মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি)-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০০০-২০১০ সাল মেয়াদে গড়ে প্রতি বছর দারিদ্র্য কমেছে ১.৭৪% হারে, যা কিনা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রতি বছর ১.২% হারে দারিদ্র্য কমানোর লক্ষ্যের চেয়ে বেশি। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৬.৭%, যা ২০১৬ সালে হ্রাস পেয়ে ২৪.৩% এ দাঁড়িয়েছে।

দারিদ্র্য হ্রাসে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্জিত গতিশীলতা এবং হতদরিদ্রদের জন্য টেকসই নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা, অতিদরিদ্র ও দুস্থদের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য ও টেস্ট রিলিফ, জিআর ছাড়াও সরকার-উদ্ভাবিত একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ, গৃহায়ণ, আদর্শ গ্রাম, গুচ্ছগ্রাম, ঘরে ফেরা প্রভৃতি কর্মসূচির পাশাপাশি ওএমএস, ফেয়ার প্রাইস কার্ড, ভিজিডি, প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতা, বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা, দুস্থ মহিলা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা, চর জীবিকায়নসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ব্যয় ছিল ১১ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ভাতার পরিমাণ ও আওতা বৃদ্ধিপূর্বক  ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ‘খানা আয় ও ব্যয় জরিপ-২০১৫-১৬’ থেকে দেখা যায়, ২৮ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাভুক্ত। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে আরো যুগোপযোগী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকার প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল’ প্রণয়ন করেছে।

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও এখনো মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। আর এর জন্য প্রয়োজন সঠিক নীতি-নির্ধারণ এবং তার যথার্থ বাস্তবায়ন। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠনে মহাজোট সরকারের উন্নয়ন দর্শন ‘রূপকল্প ২০২১’ অনুযায়ী অগ্রাধিকারভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি, প্রকল্প ও নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এই পরিকল্পনাসমূহের মূল লক্ষ্য হচ্ছে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসন ও আয় বৈষম্য দূরীকরণ এবং অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা।

‘রূপকল্প: ২০২১’কে সামনে রেখে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ‘বাংলাদেশ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২১)’ প্রণয়ন করা হয়। এ পরিকল্পনার উন্নয়ন ভাবনাকে বাস্তব রূপান্তরের লক্ষ্যে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে প্রণীত ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-১৫) এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০) গ্রহণ করা হয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন শেষে বর্তমানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এই ‘রূপকল্প: ২০২১’-এ বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা এবং দারিদ্র্যের হার ১৩.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় এমডিজি অর্জনে অভূতপূর্ব সাফল্য বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। সর্বক্ষেত্রে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় দেশ আজ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। এবং উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করবে।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধির সুফল বাংলাদেশের সর্বত্র সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া। এ লক্ষ্যে স্বল্প প্রবৃদ্ধির অঞ্চলসমূহে— বিশেষত উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলে এবং যমুনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার চরাঞ্চলে, যেখানে দারিদ্র্যের প্রকটতা বেশি, সেখানে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এমডিজি অভিষ্ট লক্ষ্য-১ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই দারিদ্র্য অর্ধেকে নামিয়ে আনার জন্য জুন ২০১৩ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কাছ থেকে ‘ডিপ্লোমা অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। নির্ধারিত সময়সীমার অনেক আগেই দারিদ্র্য নিরসনের এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিচক্ষণতার সাথে নেতৃত্বদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। এই পুরস্কার ছাড়াও বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মোকাবিলায় অভাবনীয় অগ্রগতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় ইকোনোমিষ্ট পত্রিকাসহ অন্যান্য পত্র-পত্রিকার প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মাথাগুনতি দারিদ্র্য ২০১০ সালের ৩১.৫ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ২২.৫ শতাংশে কমিয়ে আনার প্রয়াস নেওয়া হয়। দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্য সংগঠনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে এবং চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। দারিদ্র্য ২২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে এবং চরম দারিদ্র্য নেমে এসেছে ১৩ শতাংশেরও নিচে।

প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য নিরসনের সাথে প্রত্যেক নাগরিকের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কর্মকৌশল, নীতি এবং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গড়ে বার্ষিক ৭.৪% হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০২০ সাল নাগাদ ৮ শতাংশে পৌঁছাবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জনের একটি অন্যতম কৌশল হবে অধিক হারে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগে গতিশীলতা আনা। অন্য কৌশলসমূহ হলো: সর্বাধিক কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলা; নতুন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে মূলধন ও শ্রমের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করা; সামষ্টিক অর্থনীতির ধারাবাহিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে সেবা খাত এবং রপ্তানিমুখী প্রক্রিয়াজাত ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ; সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে একটি টেকসই, সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জলবায়ুসহিষ্ণু ভবিষ্যত্ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২০১৬-২০২০ সালের মধ্যে সাফল্যজনকভাবে ৭.১ শতাংশ হতে ৮ শতাংশ এবং গড় প্রবৃদ্ধি ৭.৪ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বাজেটের আকার বৃদ্ধি করা হয়েছে।  ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকায়। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সরকার সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে। বিনিয়োগের ৮০ শতাংশ বেসরকারি ও ২০ শতাংশ সরকারি খাতে হয়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর উন্নয়নবান্ধব ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এতে দারিদ্র্য দিন দিন কমে আসছে। এডিপি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ প্রয়াস নেয়া হয়েছে। সারা দেশে সড়ক নেটওয়ার্কের ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে। গ্রাম-উপজেলা-জেলাসহ সব ক্ষেত্রে সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হওয়ায় এর সুফল পাচ্ছে জনগণ। এখন গ্রামের সাধারণ কৃষক তার উত্পাদিত পণ্য খুব সহজে বিক্রয় কেন্দ্রে আনতে পারছে। এসব কারণে বাংলাদেশে অতি দারিদ্র্য অনেকটাই কমে আসছে। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও এসব কর্মসূচি ভূমিকা রাখছে। শ্রমের প্রকৃত মজুরি অভাবিতপূর্বভাবে বেড়েছে। একদিনের মজুরি দিয়ে কৃষিশ্রমিক ৯-১০ কেজি চাল ক্রয় করতে পারছে। এ কারণে দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমছে।

বেকারত্ব দূরীকরণে উত্পাদনমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশের অদক্ষ জনগোষ্ঠীকে আধা দক্ষ এবং দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের নানামুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের নেয়া কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে— মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদার, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও পূর্ত কাজকে গতিশীল করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পখাতকে উত্সাহিতকরণ, প্রশিক্ষিত যুবক ও যুব মহিলাদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, দুই বছরের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রচলিত ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচিকে পর্যায়ক্রমে সব জেলায় সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে জনশক্তি রফতানি। কৃষি ও সেবাখাতে কর্মসংস্থানের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। বিগত একবছরে ইতিহাসের সর্বাধিক ১০ লাখ মানুষ কর্ম গ্রহণে দেশের বাইরে গিয়েছে।

সরকার দেশের দারিদ্র্য নিরসন সংক্রান্ত নীতিমালাসহ পিছিয়ে পড়া অঞ্চলসমূহের মানুষের উন্নয়নে নানাবিধ কৌশল  গ্রহণ করেছে। দুর্গম এলাকা, চরাঞ্চল ও দারিদ্র্যপীড়িত এলাকাগুলোতে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয়বৃদ্ধিমূলক পেশা নির্বাচন ও বিকল্প আয়ের উত্স সৃষ্টির জন্য ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত এক কোটি পরিবারের প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষকে পর্যায়ক্রমে দারিদ্র্যমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণে এসবই বিশাল কর্মযজ্ঞ।

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে অতি দারিদ্র্যের হার ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে? প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে অতি দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ হবে? এসডিজি-র লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে গড়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে?

২০০০ সালে দেশের মানুষের মাথাপিছু মাসিক গড় আয় ছিল মাত্র ৪২০ ডলার। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বাড়লেও দেশে ধনী-গরিব বৈষম্য বেড়েছে। প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে সবাই পাচ্ছে না। সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি পাচ্ছে সমাজের সচ্ছল শ্রেণি। গরিব শ্রেণির কাছে দেশজ প্রবৃদ্ধির সুফল কম পৌঁছাচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ-২০১৬ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে এ জরিপ হয় প্রতি পাঁচ বছর পর। ২০১০ সালের জরিপের সাথে তুলনায় দেখা যাচ্ছে, ধনী-গরিব বৈষম্য বেড়েছে। ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১০ সালে আয় বৈষম্য কিছুটা কমেছিল। উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেও তার ন্যায্য বণ্টন হচ্ছে না। দেশের মোট আয়ে ধনিক শ্রেণির অংশটি অনেক স্ফীত হয়েছে। অপরদিকে গরিবের ছোট অংশটি আরও ছোট হয়েছে। বিবিএস-এর জরিপ অনুযায়ী ২০১০ সালে জনগোষ্ঠীর নিম্নতম ৫ শতাংশের জাতীয় আয়ে অংশ ছিল দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে নেমে এসেছে দশমিক ২৩ শতাংশে। জনগোষ্ঠীর নিচের দিকের ৫ শতাংশের আয় ক্রমাগত কমছে। স্ফীত হচ্ছে মধ্যবিত্ত, আরো স্ফীত হচ্ছে উচ্চবিত্ত। আয় বৈষম্য বাড়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছে না দরিদ্র মানুষ। বৈষম্য কমাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বাড়াতে হবে। এজন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষার পরিধি আরো বিস্তৃত করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে সুশাসন না থাকলে প্রবৃদ্ধির সুফল নিচে চুইয়ে পড়ে না, উপরেই উবে যায়। যেকোনো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা দারিদ্র্য বিমোচনে সুশাসনের ভূমিকা অপরিসীম।

একটি দেশের শক্তিশালী ও কার্যকর শাসন ব্যবস্থার উপর দেশের অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন নির্ভর করে। জনগণকে ক্ষমতার কাছাকাছি নিতে হলে শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক একটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজন। আর জনগণ যত বেশি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকবে ততই তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে।

দারিদ্র্য নির্মূলকরণ ও আয় বৈষম্য কমানোর জন্য ধনিক শ্রেণির ওপর প্রগতিমূলক করের চাপ বাড়াতে হবে। এতে করে সমাজে পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগণ অধিক সুবিধা পাবে। বাড়তি রাজস্ব দিয়ে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা যায়। বাংলাদেশে জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ালে তা বৈষম্য কমাতে সহায়ক হবে। এছাড়াও, দারিদ্র্য বিমোচনে ও আয়-ব্যয় বৈষম্য দূরীকরণে আরো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন— ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, বৈষম্য কমাতে সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়ানো, উপকারভোগীর অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের গুণগত মান বাড়ানো, শ্রমের উত্পাদনশীলতা ও মজুরি বৃদ্ধি, গরিবদের জন্য অধিকতর সুবিধাসহ মানব পুঁজির উন্নয়ন, সরকারি সেবা পেতে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ (সুশাসনের প্রধান চাহিদা),সর্বপর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগের মাধ্যমে সকলের সুযোগ প্রদান। বাজেটে যেসব অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার এখনো ৬০ শতাংশ কিংবা তদূর্ধ্বে বিশেষ উন্নয়ন তহবিল গঠনের মাধ্যমে সেসব অঞ্চলে প্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

লেখক: সামষ্টিক পরিকল্পনাবিদ

উৎস: ইত্তেফাক

শেয়ার করুন