ছাত্রলীগের আধিপত্যের লড়াইয়ে টিলাগড়ে বাড়ছে লাশের মিছিল

বিশেষ রিপোর্ট :: সিলেট নগরীর টিলাগড়ে ঐতিহ্যবাহী মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজের অবস্থান। এর পাশেই আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিলেট সরকারি কলেজ। এছাড়া অদূরে রয়েছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজও। এ কারণে ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা একটি এলাকা হচ্ছেন টিলাগড়। আর এই টিলাগড়কে সিলেটের ছাত্র রাজনীতির আতুঁড় ঘরও বলা হয়। ক্ষমতার পালাবদলে এই এলাকার রাজনীতিতেও ঘটে পালাবদল।

ঠিক তেমনি ভাবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরই তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ টিলাগড়সহ আশপাশের সবকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এক্ষেত্রে বেশ কিছু বিতর্কিত কর্মকা-েও জড়িত হয় ছাত্রলীগ। বিশেষ করে, শিবির তাড়াতে সরকারি কলেজ এবং এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে অগ্নিসংযোগ করে তারা। একই ভাবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছাত্রাবাসেও একাধিকবার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়।

এরপর থেকে ওই এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে নিজেদের দাঁড় করায় ছাত্রলীগ। কিন্তু আধিপত্য আর নেতৃত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি হয় গ্রুপ-উপগ্রুপের। ফলে নিজেরা জড়িয়ে পড়ে অন্ত:দ্বন্দ্বে। এ পর্যন্ত তাদের অন্ত:দ্বন্দ্বের বলি হয়েছেন চার মেধাবি ছাত্র। এছাড়া একাধিক বার সংঘর্ষেও জড়িয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। দিয়েছেন প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া, করেছেন ভাঙচুরও। সর্বশেষ নিজেদের অন্ত:দ্বন্দ্বের বলি হলেন ছাত্রলীগ কর্মী তানিম খান। তবে, ২০১০ সালে ছাত্রলীগ কর্মী উদয় সিংহ পলাশ হত্যার মধ্য দিয়ে টিলাগড়ে খুনের রাজনীতি শুরু করেছিল ছাত্রলীগ। যদিও এর আগে ২০০৩ সালে ছাত্রদল ক্যাডাররা এই টিলাগড়েই হত্যা করেছিল দুই ছাত্রলীগ নেতাকে। এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া খুনের ঘটনার কোনটিরই বিচার হয়নি। ফলে বাড়ছেই মৃত্যুর মিছিল।

টিলাগড়ে বর্তমানে দুই বলয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ছাত্রলীগ। এর একটির শেল্টার দাতা হচ্ছেন মহানগর আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ও সিটি কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ এবং অন্যটির শেল্টারে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এডভোকেট রণজিত। যদিও শুরুর দিকে এই দুই বলয় একত্রিত ছিল। এর আগে সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমানের অনুসারীদেরও একটি গ্রুপ টিলাগড়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি সক্রিয় ছিল।

এই দুই বলয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব মূলত এমসি কলেজ এবং সরকারি কলেজের আধিপত্য এবং দখল নিয়ে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান দখলে রেখেছে রণজিত অনুসারীরা। এ নিয়ে আজাদ ও রণজিত অনুসারিদের মধ্যে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষেরও ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে আনন্দ র‌্যালী করা নিয়ে তাদের সংঘর্ষে টিলাগড় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। এদিন অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্য মহড়াও দেয় উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা। এর জের ধরে রোববার রাতে টিলাগড় পয়েন্টে রণজিত অনুসারী সরকারি কলেজের বিএ পাস কোর্সের শিক্ষার্থী তানিম খানকে হত্যা করে আজাদ অনুসারীরা। নিহত তানিম খানের গ্রামের বাড়ি ওসমানীনগর উপজেলার বরুঙ্গা ইউনিয়নের নিজ বরুঙ্গা গ্রামে। তার বাবার নাম ইসরাইল খান। সে টিলাগড়ে একটি মেসে থাকত।

এর প্রতিবাদে সোমবার থেকে এমসি কলেজ ও সরকারি কলেজে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছে রণজিত অনুসারীরা। এছাড়া তারা সড়কও অবরোধ করে রাখে। পুলিশ ইতিমধ্যে আজাদ গ্রুপের চার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। তাছাড়া অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে টিলাগড় ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

একই ভাবে গত বছরের ১৬ অক্টোবর প্রকাশ্য দিবালোকে টিলাগড় মসজিদ সংলগ্ন কাউন্সিলর আজাদের কার্যালয়ের সামনে রণজিত অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদকে কুপিয়ে হত্যা করে আজাদ অনুসারীরা। নিহত মিয়াদ সিলেট এমসি কলেজে বিএসএস এবং লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ের ছাত্র ছিলেন। এ ঘটনায় জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরীকে প্রধান আসামী করে মামলা দায়ের করেন মিয়াদের বাবা। পরে কেন্দ্র থেকে কমিটি বাতিল করা হয়। তবে, এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে রায়হানসহ অধিকাংশ আসামী।

এর এক মাস আগে ১৪ সেপ্টেম্বর আধিপত্যের বলি হন আরেক ছাত্রলীগ কর্মী জাকারিয়া আহমাদ মাসুম। তাকে হামলাকারী মাহিন ও তার সঙ্গীরা টিলাগড়কেন্দ্রীক ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত। মাহিন ও তার সঙ্গীরা মাসুমকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে ফেলে গিয়েছিল। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে তার মৃত্যু হয়। নিহত মাসুম সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শান্তিগঞ্জের মাসুক মিয়ার ছেলে। নিহত যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সমর্থিত সুরমা গ্রুপের কর্মী। হামলাকারী মাহিন ছাত্রলীগের টিটু-ডায়মন্ড গ্রুপের কর্মী । যারা আজাদ অনুসারী বলে পরিচিত। এ ঘটনার মামলা দায়ের হলেও আসামীরা বেশিরভাগই জামিন নিয়ে বাইরে রয়েছেন।

এছাড়া ২০১০ সালে পলাশ হত্যার ছাত্রলীগের ৮ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে ১০ থেকে১৫ জনকে অজ্ঞাত করে মামলাও দায়ের করেন উদয়েন্দু সিংহের পিতা বীরেশ্বর সিংহ। মামলার অনেক অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। তার বিচারের কোন অগ্রগতি নেই।

শুধু ছাত্রলীগই নয়; বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এই টিলাগড়েই ছাত্রদলের ক্যাডারদের হাতে খুন হয়েছিলেন দুই ছাত্রলীগ নেতা। ২০০৩ সালের ৭ জানুয়ারি টিলাগড়ে অতর্কিত হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মারা যান ছাত্রলীগ নেতা আকবর সুলতান। একই বছরের ৯ অক্টোবর একই ভাবে ছাত্রলীগ নেতা মিজান কামালীর প্রাণও কেড়ে নেয় তৎকালিন সরকারি দল ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিচারহীনতার কারণে বারবার এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে, রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় আসামীরা পার পেয়ে যায় সবসময়। এ কারণে ফের সংঘাতে জড়ায় তারা।

সাংবাদিক মুক্তাদির আহমদ প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘মাসুম হত্যার পর যদি টিলাগড় কেন্দ্রিক আসামিদের ধরা হতো, তাহলে কি ওমর মিয়াদ হত্যাকাণ্ড ঘটত? ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের দুই পক্ষে অস্ত্রের মহড়ার পর একটি সাঁড়াশি অভিযান যদি হতো, তাহলে কি সর্বশেষ তানিম খান হত্যার ঘটনা ঘটতো?

শেয়ার করুন