কাঁদারও সুযোগ পায় না মাদক মামলার বিচার

আলম রায়হান

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’ কিন্তু মাদক মামলার বিচার সম্ভবত কাঁদারও সুযোগ পায় না। মাদকের আগ্রাসন দমনে বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েক বছর ধরে দৃশ্যত কঠোর অবস্থানে আছে। কিন্তু বাস্তবে মাদকের আগ্রাসন শুধু বেড়েই চলছে উজান থেকে নেমে আসা বানের পানির মতো। মাদকের আগ্রাসন প্রতিহত করতে না পারার ক্ষেত্রে প্রধান একটি কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় মাদকের কারবারে জড়িতদের শাস্তি না হওয়া। উল্লেখ্য, মাদকসংক্রান্ত মামলায় প্রায় ৮০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্রেপ্তারকৃত মাদক কারবারিরা খালাস পেয়ে আবার পুরনো পেশায় ফিরে যাচ্ছে; জামিন নিয়ে বেরিয়েও তারা পুরনো কারবার শুরু করে।

এদিকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই মাদক মামলার চাপ বাড়ছে। নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা এবং অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের চরম অসহযোগিতা মোকাবেলা করে মাদক মামলা দায়ের করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। কিন্তু এসব মামলার বিচারে সাজার হার খুবই হতাশাজনক। সাক্ষীর অভাব, আলামত নষ্ট, তদন্তে ধীরগতি ও আসামিদের ভুল তথ্য রেকর্ড করাসহ একাধিক জটিলতার কারণে এসব মামলায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে মামলার যথাযথ তদারকির অভাবকে বিশেষভাবে দায়ী বলে মনে করা হয়। আর মামলা তদারকির বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অবস্থা খুবই নাজুক। এ সংস্থার প্রসিকিউটর সংকটের কারণে অনেক মামলার খবর রাখা সম্ভব হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে সংস্থার অজান্তে অনেক মামলায় আসামি খালাস পেয়ে যায়। সিআরপিসি অনুযায়ী কোনো মামলার রায় হলে আদালত তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে জানাতে বাধ্য নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মামলার ফলাফল জানে না মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ ধারায় ২০০২ সালে দেশে প্রথম ইয়াবা আটকের চাঞ্চল্যকর দুটি মামলার একটি এরই মধ্যে খারিজ হয়ে গেছে অধিদপ্তরের অজান্তেই।

মাদক মামলায় আসামিকে মাদকদ্রব্যসহ গ্রেপ্তারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। খুনসহ ফৌজদারি অন্য মামলার মতো সন্দেহবশত গ্রেপ্তার বা আটক করার সুযোগ নেই মাদক মামলায়। আবার উদ্ধার করা মাদকের নমুনা অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই উদ্ধার করা দ্রব্য অবৈধ মাদক হিসেবে প্রমাণিত হয়। এর পরও মাদক মামলায় ৭০ শতাংশের বেশি আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আর খালাসপ্রাপ্তদের মধ্যে রাঘব বোয়ালের সংখ্যাই বেশি।

এদিকে সারা দেশে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে মাদকের আগ্রাসন, সঙ্গে বাড়ছে মাদক মামলাও। নেশায় চলমান ক্রেজ মরণ নেশা ইয়াবা ট্যাবলেটের ৭০ শতাংশ আসে সীমান্তের ওপার থেকে। আর এর বেশির ভাগই রুট বদল করে আসছে পটুয়াখালী হয়ে নৌপথে। বাকি ৩০ শতাংশ ইয়াবা স্থানীয়ভাবে পুনঃ তৈরি করা হয়। এদিকে অভিযোগ আছে, বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে উদ্ধার করা নানা ধরনের মাদকের অন্তত ৩০ শতাংশ আবার বিক্রেতাদের হাতে চলে যায়।

পরিসংখ্যান মতে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বছরে প্রায় ১০ হাজার মামলা দায়ের করেন। কিন্তু লোকবল সংকটের কারণে এসব মামলা পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এ অধিদপ্তরকে। সবচেয়ে লেজেগোবরে অবস্থা ঢাকায় বিচারাধীন মামলা নিয়ে; যার সংখ্যা সব সময়ই থাকে ১০ হাজারের কাছাকাছি। আর এ মামলাগুলো চলে ৭০টি আদালতে।

সারা দেশে সরকারের পক্ষে মামলায় আইনজীবীর দায়িত্ব পালন করেন পিপি-এপিপিরা। কিন্তু পিপি-এপিপিদের সহায়তা প্রদান ও মামলার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অবস্থা খুবই শোচনীয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, রাজধানীর ৭০টি আদালতে প্রায় ১০ হাজার মামলার বিষয়ে দেখভাল করার জন্য অধিদপ্তরের লোকবল রয়েছে মাত্র পাঁচজন; এ টিমের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন একজন ইন্সপেক্টর। একই আদালতে মাদকসহ অন্যান্য বিষয়ের মামলা তদারকির জন্য পুলিশের বিরাজমান জনবল হচ্ছে প্রায় সাড়ে চার শ, ডিসি প্রসিকিউশন হিসেবে পুলিশের এ টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন একজন এসপি। মামলা তদারকির জন্য আদালতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চরম জনবল সংকটের পাশাপাশি এ বিষয়ে মনিটরিং করার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

প্রথমেই দুরবস্থা শুরু হয় তদন্ত পর্ব দিয়ে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ অনুযায়ী, আসামিসহ মাদক ধরা পড়লে ১৫ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ সময়সীমা আরো সাত দিন বৃদ্ধির এখতিয়ার আছে অধিদপ্তরের। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্নমুখী বিষয়ে তদন্তের পাশাপাশি রাসায়নিক পরীক্ষাগার থেকে মাদকের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন নিতে হয়। তবে আদালতের অনুমতি গ্রহণ সাপেক্ষে তদন্তের সময় বৃদ্ধির অবকাশ আছে। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই যথেষ্ট সময় পাওয়া যায় না।

এদিকে মাদক মামলার বিচার হয় বিভিন্ন আদালতে। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানতেও পারেন না, কোন মামলা কোন আদালতে রয়েছে। এ ছাড়া মাদক মামলায় হেভিওয়েট আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করলে তাদের পক্ষে অভিজ্ঞ অনেক আইনজীবী দাঁড়িয়ে যান। আইনের দৃষ্টিতে এটা বেআইনি কিছু নয়। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে বাদীর পক্ষে আইনজীবী তেমন জোরালো হয় না। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করার জন্য নির্ধারিত আইনজীবীদের কেউ কেউ কৌশলে মাদক আসামির পক্ষে কাজ করেন বলেও শোনা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীদের দায়িত্ব পালনে পরিপূর্ণ আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। এর সঙ্গে রয়েছে সাক্ষী হাজির করতে না পারা এবং বাদীপক্ষের মামলা পরিচালনায় তদারকির অভাব।

আটক করা মাদক কারবারিকে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় রকমের বিপত্তি দেখা দেয় সাক্ষী নিয়ে। মাদক উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তার হলেও ঠিকমতো সাক্ষী পাওয়া যায় না। সাক্ষী পাওয়া গেলেও অনুপস্থিতি অন্যতম সংকট হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আবার নানা প্ররোচনায় অনেকে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়। ফলে বেশির ভাগ মামলা আদালতে প্রমাণ করা যায় না। তবে ঠিকমতো সাক্ষী হাজির করা গেলে মাদক মামলায় আরো বেশি আসামির সাজা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আসামিরা অনেক সময় ভুল তথ্য দিয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে তারা জামিন নিয়ে আর হাজির হয় না; পলাতক থাকে। তাদের আর হাজির করা যায় না। আবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা অবসরে যান, প্রায় ক্ষেত্রেই তাঁরা একেকজন অন্তত ৫০০ মামলা নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় রেখে যান। পরে ওই সব মামলার সাক্ষী দিতে তাঁদের আদালতে হাজির হতে বললে তাঁরা আসেন না। আবার মামলার সময় যেসব সাধারণ মানুষকে সাক্ষী করা হয়, তারাও নিজ এলাকা ও আদালত চত্বরে চরম নিরাপত্তাহীনতার কথা ভেবে সাক্ষী দিতে আসে না। এর ওপর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আদালতে আইনিপ্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যক্তিদের কেনাবেচার ওপেন সিক্রেট অভিযোগ তো আছেই। সব মিলিয়ে মাদক মামলায় আসামি খালাসের হার উদ্বেগজনক অবস্থানে পৌঁছেছে।

অন্যান্য রাষ্ট্রে মাদকদ্রব্য বাহককে আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। যদি তাকে সেবনকারী বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা না দিয়ে তাকে পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু আমাদের দেশে এ রকম কোনো ব্যবস্থা নেই। বিরাজমান আইন অনুসারে এক পুরিয়া গাঁজা পেলেও আমাদের দেশে মামলা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতে মামলার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।

সামগ্রিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ মাদকের আগ্রাসন প্রশ্নে নতুন করে ভাবা খুবই জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। সবার আগে প্রয়োজন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় শক্তিশালী করা। এ ক্ষেত্রে লোকবল, যানবাহন বৃদ্ধিসহ অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আর এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব নিতে হবে দেশের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখক

উৎস : কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন