৬ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় কুলাউড়া, বড়লেখা, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি :: আজ ৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে শত্রুমুক্ত হয় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, বড়লেখা, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল।

কুলাউড়া: ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ কুলাউড়া শত্রুমুক্ত দিবস। একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া এই দিনে সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হয়। এই সংবাদে ঐদিন শহর ও শহরতলিতে ছাত্র জনতার শ্লোগানে শ্নোগানে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো শহর। এরপর থেকে ঐদিনটিকে কুলাউড়াবাসী শত্রুমুক্ত দিবস হিসাবে পালন করে আসছে আজও।

একাত্তরের ৭ মে পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন দাউদ ও মেজর ওহাহিদ মোগলের নেতৃত্বে হানাদার বাহিনীর দুটি দল চুপিসারে কুলাউড়ায় প্রবেশ করে। এই সময় শহরের অদূরে কাপুয়া সেতুর কাছে তাদের হাতে প্রথম শহীদ হন উপজেলার জয়চন্ডি ইউনিয়নের মোজাহিদ কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আছকির আলী ও হাবিব উদ্দিন। ঐদিন সন্ধ্যায় হানাদার বাহিনীর দোসররা বিছরাকান্দি গ্র্রামের ছলিম উল্লাহ (৪০) এবং সোনাপুর গ্রামের আরশদ উল্লাহ (৪২) কে হত্যা করে। ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন বনাঞ্চল বেষ্টিত এই উপজেলার অবস্থা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগুপ্তা হামলার অনুকূলে। ৬ ডিসেম্বর ভোরে কুলাউড়ায় মিত্র বাহিনীর দুটি জঙ্গী বিমান আকাশ থেকে কয়েক দফা পাক সেনাদের ঘাঁটিতে গোলা বর্ষণ করে তাদের কে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এই সুযোগে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ধর্মনগর থেকে হরদয়াল সিংহের নেতৃত্বে ভারতীয় সেনা বাহিনীর ৬৭ রাজপুত রেজিমেন্টের একটি বিরাট দল সাগরনাল ও কাকঁড়া চাবাগানে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগে মিলিত হয়ে শুরু করে সম্মুখ যুদ্ধ। যুদ্ধে জীবন দিতে হয় ২৪ জন মুক্তিযোদ্ধা সহ প্রায় ৩শ’ সাধারণ মানুষকে। যুদ্ধ চলাকালে পাক সেনারা রাজাকার, আলবদর ও আল সামস এর সহযোগিতায় সাধারণ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

কুলাউড়া মুক্ত হবার মাস খানেক আগে পাক বাহিনীর দোসররা কুলাউড়া শহর সংলগ্ন সোনাপুর, বিছরাকান্দি ও দেখিয়ারপুর এলাকা থেকে সিকান্দর মিয়া, পনাউল্লাহ, আতাউল্লাহ ও দরছ মিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের পরিবার আজ পর্যন্ত এদের সন্ধান পায় নি। ৩ নভেম্বর ১৯৭১ হানাদার বাহিনী কুলাউড়া শহর সংলগ্ন পোসাইনগর গ্রাম থেকে এক রাতে উপেন্দ্র ঘোষ, নরেশ ঘোষ, হরেন্দ্র মালাকার, তমছির আলী, সুরেশ দেব, চিত্ত দাস, ধিরাই দাস, শনি ঘোষ, নিখিল ঘোষ, দীগেন্দ্র দাস, মহেন্দ্র শুক্লবৈদ্য, অনিল দাস, মহেন্দ্র দাস ও নিবারণ দেব কে ধরে এনে কুলাউড়ার রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশে তাদেরকে দিয়ে গর্ত করে ১৪ জনকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। সেই ঐতিহাসিক বধ্যভূমিটি আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়ে আছে। মৃত ও নিঁেখাজ ব্যক্তির স্বজনরা বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটে দিন যাপন করছেন। শহরের প্রবেশ মুখে একটি স্মরণস্তম্ভ ছাড়া স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও বধ্যভূমি গুলো সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

বড়লেখা: আজ ৬ ডিসেম্বর বুধবার  হানাদারমুক্ত হয় বড়লেখা। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে নাকাল পাকহানাদার বড়লেখা ছাড়তে বাধ্য হয়। ৬ ডিসেম্বর ভোরে বড়লেখা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হলে বর্তমান উপজেলা পরিষদের সামনে এক বিজয় সমাবেশ করা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হলেও ওইদিন বড়লেখায় উদিত হয় লাল সবুজের পতাকা।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বড়লেখাবাসী জেগে উঠেছিল রণহুঙ্কারে। ৩২৫টি গ্রাম যেন প্রতিরোধের এক একটি দূর্গে পরিণত হয়। বড়লেখা থানাটি ৪নং সেক্টরের আওতাভুক্ত ছিল। মেজর সি.আর দত্ত সেক্টর কামান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। এ সেক্টরের সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের করিমগঞ্জে প্রয়াত এমপি দেওয়ান ফরিদ গাজীর নেতৃত্বে। বড়লেখা থানার পার্শ্ববর্তী বার পুঞ্জি ও কুকিরতলে সাব সেক্টর স্থাপন করা হয়। হানাদারদের বিরুদ্ধে অসংখ্য ছোট বড় আক্রমণ চালিয়েছে এ সাব সেক্টরের মুক্তি সেনারা। যুদ্ধের শুরুতেই বড়লেখার স্থানে স্থানে প্রতিরোধ গড়ে তোলে সংগ্রামী বড়লেখার মানুষ। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তাঁরা নেমে পড়েন শত্রু মোকাবেলায়।

বড়লেখায় মুক্তিযোদ্ধারা যেসব স্থানে অপারেশন চালিয়েছেন, এ গ্রামগুলো হলো-লাতু, সারোপার, শাহবাজপুর, ধামাই চা বাগান, হাকালুকি পারের কয়েকটি গ্রাম, বোরাথল, মাইজগ্রাম, ডিমাই, কেছরিগুল, কাঁঠালতলী, মাধবকু-, দশঘরি। এগুলো মুক্তিযোদ্ধারা ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করতেন।

বড়লেখা থানায় পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের রয়েছে রকমফের। এর কারণ এ উপজেলার বৈচিত্রময় প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাহাড়, হাওর, খাল-বিল, টিলা, নদী এক অবিশ্বাস্য সমন্বয় হচ্ছে বড়লেখা থানা। তৎকালিন সময়ে ভৌগোলিক বৈচিত্রের প্রভাবে প্রতিবিম্বিত হয় যুদ্ধ কৌশল। পাহাড়, টিলা, উঁচুভূমি আর সমতল কিংবা নি¤œাঞ্চলের যুদ্ধের কৌশল সঙ্গত কারণেই ছিল পৃথক। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে নাকাল হানাদার বড়লেখা ছাড়তে বাধ্য হয়। ৬ ডিসেম্বর ভোরে বড়লেখা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হলে বর্তমান উপজেলা পরিষদের সামনে এক বিজয় সমাবেশ করা হয়।

বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বড়লেখা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব রাজাকার, আলবদর অনেক বাড়ি-ঘর জ্বালিয়েছে, অনেক মা-বোনের সম্ভ্রমহানী ও নর-নারীকে হত্যা করেছে তাদের অনেকের বিচার ইতিমধ্যে হয়েছে। অন্যদেরও বিচার এ বাংলার মাটিতেই হবে।’ তিনি জানান, কুলাউড়া, বিয়ানীবাজারের চেয়েও বড়লেখায় বেশি নারী নির্যাতন ও হত্যাকা- হয়েছে।

এদিকে, বড়লেখা হানাদারমুক্ত দিবস উপলক্ষে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড, বড়লেখা প্রেসক্লাব, নজরুল একাডেমি ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কামান্ড যৌথভাবে বিজয় র‌্যালী ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

রাজনগর: ৬ ডিসেম্বর রাজনগর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে রাজনগর উপজেলা পাকহানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়। যৌথবাহিনীর কামান্ডার কর্ণেল এম এ হামিদ প্রথম লাল সবুজের বিজয় পতাকা উড়ান রাজনগর ক্লাব প্রাঙ্গনে। এর আগে উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নে রাজনগর বিজয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সম্প্রতি সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে ‘শহীদ মিনার’।

এদিকে স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এবারই প্রথম রাজনগর মুক্ত দিবস পালনের উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। রাজনগর মুক্ত দিবস উপলক্ষে আজ বুধবার বেলা ১১ টায় পতাকা উত্তোলন, সোয়া ১১টায় মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সাড়ে ১১টায় র‌্যালী ও দুপুর ১২টা থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে মূখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাজনগর মুক্ত দিবসের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান। এব্যাপারে রাজনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডার সজল চক্রবর্তী বলেন, এবারই প্রথম রাজনগর মুক্ত দিবস পালন করা হচ্ছে। দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল: আজ ৬ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল মুক্ত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের এই দিনে লড়াকু মুক্তিযোদ্ধারা মরণপণ লড়াই করে হানাদার বাহিনীকে শ্রীমঙ্গল থেকে হটিয়ে শত্রুমুক্ত করেছিল। তবে এর আগে হানাদার বাহিনীর সাথে লড়াই করে নিহত হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। এদিকে, স্বাধীনতার যুদ্ধে নিরীহ নিরস্ত্র শ্রীমঙ্গলের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শত শত চা শ্রমিককেও হত্যা করে পাক বাহিনী। এসব হত্যা কান্ডের নীরব সাক্ষী শ্রীমঙ্গলের ৫ টি বধ্যভূমি পড়ে আছে অযতœ আর অবহেলায়। ফলে এ প্রজন্মের অনেকেই জানেনা এসব বধ্যভূমির সম্পর্কে।

১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণের মুখে শ্রীমঙ্গল শহর ছেড়ে পালিয়েছিল পাক হানাদার বাহিনী। তবে এই মুক্তির স্বাদ নিতে গিয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে চা বাগান ঘেরা এই জনপদের মানুষকে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর তৎকালীন সংসদ সদস্য আলতাফুর রহমান, কমান্ডার মানিক চৌধুরী ও ফরিদ আহম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বে শ্রীমঙ্গলে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। ২৩ মার্চ শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সামনে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার রক্তস্নাত পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ৬ ডিসেম্বর শহরের ভানুগাছ সড়ক দিয়ে আবারও পৌরসভা চত্বরে প্রবেশ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। সেখানে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে বিজয়ের উল্লাসে মেতে উঠেন তারা।

এদিকে, স্বাধীনতা যুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে সেদিন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল এ অঞ্চলের নিরীহ চা শ্রমিকরা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এক পর্যায়ে ৩০ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে গণহত্যা চালায় তাদের উপর। যুদ্ধের ব্যাংকার বানানোর কথা বলে শহর সংলগ্ন ভাড়াউড়া চা বাগানে প্রবেশ করে সেখানে এক সঙ্গে ৫৫ জন চা শ্রমিককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের উপর গুলি চালায় পাক বাহিনী। সেদিন সম্মুখ যুদ্ধ করে মুক্তির স্বাদ নিয়ে আজও বেঁচে আছেন চা শ্রমিক মুক্তিযোদ্ধা পরাগ বাড়ই।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৫টি বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম এই ভাড়াউড়া বধ্যভূমিতে ১৯৯৭ সালে একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হলেও আজও পূর্ণতা পায়নি। কোন সীমানা প্রাচীর না থাকায় বধ্যভূমির জায়গা বেদখল হতে চলেছে। অপরদিকে, সাধু বাবার বটতলী হিসাবে পরিচিত বধ্যভূমিটি সম্প্রতি সংস্কার করে ‘বধ্যভূমি ৭১’ নামে গড়ে তোলা হলেও বধ্যভূমির কেন্দ্রবিন্দু সাধুবাবার বটতলী বিজিবি ক্যাম্পের ভেতরে থাকায় সেখানে বিশেষ দিবস গুলোতে সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতে পারেনা। অপরদিকে, এর পাশে চা বাগানের ছড়ার উপর একটি দৃষ্টি নন্দন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। মূলত এটি বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। শহরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকার বধ্যভূমিটির জায়গা বেদখল হয়ে গেছে আরো আগেই। সেখানে নাম মাত্র একটি স্মৃতিস্তম্ভ থাকলেও সেটি এখন বাসা বাড়ীর দেয়ালের মাঝখানে। এলাকার অনেকেই জানেন না এটি মুত্তিযুদ্ধকালীন একটি গণকবর। একই দশা শহরের ওয়াপদা রেষ্ট হাউজ সংলগ্ন বধ্যভূমির। এদিকে উপজেলার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিটি রয়েছে সিন্ধুরখান ইউনিয়নে। এলাকাবাসী জানান, যুদ্ধের সময়ে সেখানে শত শত নিরীহ মানুষদের হত্যা করে ফেলে রাখা হতো এই বধ্যভূমিতে। সেখানে আজও গড়ে উঠেনি কোন স্মৃতিস্তম্ভ।

শেয়ার করুন