হবিগঞ্জ মুক্ত দিবস আজ

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি :: ৬ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকবাহিনীর কবল থেকে হবিগঞ্জ মুক্ত হয়।

সুবেদার (অবঃ) আব্দুস শহীদের নেতৃত্বে ৩৩ সদস্যের মুক্তিযোদ্ধা দল বিজয়ীর বেশে হবিগঞ্জ শহরে প্রবেশ করেন। এই দলে ছিলেন সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান বাচ্চু, শুকুর মিয়া, সিরাজুল ইসলাম, রইছ আলী, সিরাজ মিয়া, আব্দুল কুদ্দুস, আবু মিয়া, আব্দুল লতিফ, গিয়াস উদ্দিন, কালা মিয়া, ছাবু মিয়া প্রমুখ। মুক্তিযোদ্ধা দলটি সারা শহর প্রদক্ষিণ করে হবিগঞ্জ সদর থানা প্রাঙ্গণে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। একই দিন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও নবীগঞ্জ থানা মুক্ত হয়। চুনারুঘাট থানা সদরে সি.ও অফিসের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন মুক্তিযোদ্ধা সানু মিয়া চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মন্নান সরকার প্রমুখ। যাদের অনেকেই এখন বেঁচে নেই। একই দিন নবীগঞ্জ থানাও মুক্ত হয়। এই থানা মুক্ত করার যুদ্ধে ধ্রুব নামে এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং কয়েকজন আহত হয়। ঐ দিন দুপুরে মুক্তিযুদ্ধের সাব-সেক্টর কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদী নবীগঞ্জ থানা প্রাঙ্গনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে নবীগঞ্জকে শক্রমুক্ত ঘোষণা করেন।

বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে হবিগঞ্জের নেতৃবৃন্দ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রেরিত অস্ত্র-শস্ত্র ও রসদপত্র দিয়ে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে এডভোকেট মোস্তফা আলী এমএনএ, কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী এমএনএ, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) এম.এ. রব এমএনএ, এনামুল হক মোস্তফা শহীদ এমপিএ, মৌলানা আসাদ আলী এমপিএ, ডাঃ আবুল হাসিম এমপিএ, শ্রী গোপাল কৃষ্ণ মহারতœ এমপিএ, আব্দুল আজিজ চৌধুরী এমপিএ, এডভোকেট আফছর আহমদ, এডভোকেট চৌধুরী আব্দুল হাই, এডভোকেট সৈয়দ আফরোজ বখত, এডভোকেট মোঃ জনাব আলী, শ্রী কৃপেন্দ্র বর্মন, মোঃ ইয়াকুত চৌধুরী প্রমুখদের সমন্বয়ে গঠিত হয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। এই পরিষদের সমন্বয়ক হিসাবে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী এমএনএ, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) এম এ রব ও মেজর সি.আর দত্তের নেতৃত্বে শেরপুরে সংগঠিত সম্মুখ সমরে হবিগঞ্জের দুই মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। শহীদ মহফিল হোসেন ও শহীদ হাফিজ উদ্দিন’কে শায়েস্তাগঞ্জ থানার পূর্ব বড়চর গ্রামে সমাহিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সিলেট অঞ্চল পরিণত হয় রণাঙ্গনে।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে হবিগঞ্জের মাধবপুর থানার তেলিয়াপাড়া চা বাগানে স্থাপিত হয় মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তর। সড়ক ও রেলপথে বৃহত্তর সিলেটে প্রবেশের ক্ষেত্রে মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়ার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ৪ এপ্রিল ২য় ও ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসারদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোতে এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় মিলিত হন। সভায় প্রাথমিক ভাবে সারা দেশকে ৪টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। যা পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত পরিচালনায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে উপস্থিত ছিলেন লেঃ কর্ণেল এম.এ.রব, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, লেঃ কর্ণেল সালাউদ্দিন রেজা, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী, মেজর নুরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন নাসিম, ক্যাপ্টেন মতিন প্রমুখ সহ জনপ্রতিনিধিবৃন্দ। ৪ এপ্রিলের সভায় কর্ণেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও লেঃ কর্ণেল এম.এ.রব’কে উপ-সর্বাধিনায়ক নিয়োগ করা হয়। ৩নং সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মেজর শফিউল্লাহ। হবিগঞ্জ ৩নং সেক্টরের অর্ন্তভুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তেলিয়াপাড়া ম্যানেজার বাঙলো সহ পার্শ্ববর্তী এলাকা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সেনানায়কদের পদচারণায় মুখরিত। ১৯৭১ সালের ২১ জুনের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণের কারণে তেলিয়াপাড়া চা বাগানে স্থাপিত মুক্তিবাহিনীর সেক্টর হেড কোয়ার্টার প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধারণ করে তেলিয়াপাড়ায় নির্মিত হয়েছে বুলেট আকৃতির স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভের ফলকে ৩৩ জনের নামের তালিকায় রয়েছে রাজনৈতিক নেতা, সাবেক সেনা ও সরকারী কর্মকর্তা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নাম। এর মধ্যে রয়েছে প্রথম সেনাপ্রধান কর্ণেল আতাউল গণি ওসমানী, সহ-সেনাপ্রধান লেঃ কর্ণেল আব্দুর রব এমএনএ, মেজর কে.এম সফিউল্লাহ (সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মেজর খালেদ মোশাররফ (কুমিল্লা-নোয়াখালি), মেজর জিয়াউর রহমান (চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রাম) ও মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (কুষ্টিয়া-যশোহর পশ্চিম রনাঙ্গন)।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা তেলিয়াপাড়া চা বাগান এলাকায় অবস্থিত এই ব্যতিক্রমধর্মী স্মৃতিসৌধ দেখার জন্য প্রতিদিনই ভিড় জমান। মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ জেলার অসংখ্য মানুষ পাক বাহিনীর নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার হন। বাহুবলের ফয়েজাবাদ, লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর, চুনারুঘাট উপজেলার লালচান, নলুয়া চা বাগান, বানিয়াচং উপজেলার মাকালকান্দি সহ বিভিন্ন স্থানে নিহত নিরস্ত্র নারী পুরুষের স্মৃতিরক্ষার্থে তৈরী করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ। মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে হবিগঞ্জের পুরাতন খোয়াই নদীর পাশে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ “দুর্জয়” হবিগঞ্জ।

শেয়ার করুন