সবুজ সোনার বাংলা গড়তে চাই টেকসই অর্থায়ন

ড. আতিউর রহমান

মূলত জাতিসংঘের উদ্যোগে ও বিরাটসংখ্যক সমাজ ও পরিবেশ সচেতন সক্রিয় মানুষ ও নীতিনির্ধারকদের কল্যাণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার বিষয়ে সারা বিশ্ব এখন ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তাই সবাই মনোযোগ দিচ্ছেন এসব লক্ষ্য অর্জনের কর্মসূচিগুলোর অর্থায়নের দিকে।

বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনগুলো এ দিকটায় তীক্ষ নজর দিচ্ছে। স্বীকার করতেই হবে যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শুরুর দিকে। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও দেশের জাতীয় বাজেট থেকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ দেওয়া ও উন্নয়নমুখী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া সবুজ বা পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের উদ্যোগগুলোর কারণে বাংলাদেশ নৈতিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে আছে।

অন্য অনেক দেশের তুলনায় পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আসলেই অগ্রগামী। আর কোনো দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে, রাষ্ট্রের সংবিধানে পরিবেশগত ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে এই পরিমাণ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কি না এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে এই অঙ্গীকার করা আছে যে ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন। ’ এ থেকে বোঝা যায়, হাল আমলে পরিবেশ রক্ষায় যে বৈশ্বিক ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে তার অনেক বছর আগেই বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। আর এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকও পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও অর্থনীতির উৎপাদনমুখী খাতগুলোর সবুজায়নের জন্য কম খরচে অর্থায়নের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি ‘রয়টার্স সাসটেইনেবিলিটি’ নামক এক অনলাইন ব্লগে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও জাতিসংঘের উপমহাসচিবের উপদেষ্টা সাইমন জাদেক সবুজ অর্থায়নের দিকে নজর দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

আর এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারাটা আমার জন্য ছিল বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয়। এ ছাড়া আমি ইউএনইপি ইনকোয়ারি ফর ডিজাইনিং সাসটেইনেবল গ্লোবাল ফিন্যান্সের ১২ জন সদস্যের একজন হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের সংবিধানে বাংলাদেশকে সবুজ সোনার বাংলা করার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে তার প্রতিফলন আমরা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ও কাজেও দেখেছি এবং দেখছি। এ কারণেই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে তাঁকে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ উপাধি দেওয়া হয়েছে। আমরা যারা আর্থিক খাতের সবুজায়নের জন্য কাজ করেছি, তারা তাঁর সবুজ সোনার বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি থেকেই ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।

আরো বিস্তারিত আলোচনায় ঢোকার আগে ‘ইউএনইপি ইনকোয়ারি অন সাসটেইনেবল ফিন্যান্স’ প্রতিবেদনে আমরা যেসব সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা উপস্থাপন করেছি, সেগুলোর দিকে আলোকপাত করতে চাই। ওই প্রতিবেদনে অর্থনীতির উৎপাদনমুখী খাতের পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের জন্য আর্থিক খাতের সম্পদ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর কারণে আর্থিক খাতের কাছ থেকে আমাদের নতুন প্রত্যাশা যুক্ত হয়েছে। এ প্রত্যাশাগুলোর মূল জায়গায় রয়েছে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের জন্য অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মূলধারার অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ও সামাজিক দিকগুলো যথাযথ বিবেচনায় রাখা। আর্থিক খাতে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপও এখন উৎপাদনমুখী খাতের পরিবেশগত ও সামাজিক ফলাফলের নির্ণায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখছে। যেমন—আর্থিক সেবা খাতের ভূমিকার ফলে বাজারে নেতৃত্ব পরিবর্তিত হচ্ছে, পাশাপাশি নীতি ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ছে।

যে প্রশ্নটি স্বভাবতই প্রথমে আসে তা হলো, ‘অর্থনীতির সবুজায়নের জন্য আর্থিক খাতে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে?’ এ ক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, পুঁজির যথাযথ স্থানান্তর নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক খাতের (অর্থাৎ এ খাতের নিয়ন্ত্রণকারীসহ অন্য অংশীদারদের) নিশ্চিত করতে হবে যেন পুঁজি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলোতে যায়। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন উদ্যোগের পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকিগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা করতে হবে। পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতির ফলে আর্থিক খাতের সম্পদ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কাজেই আর্থিক খাতসংক্রান্ত নীতিতে এসব ঝুঁকির মাত্রা নিরূপণ করতে হবে এবং ঝুঁকি মোকাবেলার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত আসে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব দায়দায়িত্বের প্রশ্ন। পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে বিনিয়োগের যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে সেটি তাদের অনুধাবন করতে হবে। কাজেই বিনিয়োগের যথাযথতা বিবেচনা করার সময় অবশ্যই আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে এসব বিষয় মাথায় রেখে বিচার-বিবেচনা করতে হবে। চতুর্থত যে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে তা হলো, তাদের আর্থিক পরিস্থিতির প্রতিবেদন দাখিল এবং যথাযথ তথ্য প্রকাশ। যদি আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এ খাতের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তাদের সামনে যথাযথ প্রতিবেদন ও তথ্য প্রকাশ করে, তখন ভোক্তার পক্ষে সব জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। পঞ্চমত আসছে পুরো আর্থিক খাতের সবুজায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগুলোর সম্মিলনে একটি রোডম্যাপ প্রস্তুত করার কথা। এই রোড ম্যাপে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও মাইলফলক চিহ্নিত করা থাকতে হবে, যাতে করে লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে পরিবীক্ষণ করা সম্ভব হয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ডিএফআইডির অর্থায়নে অ্যাডাম স্মিথ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাংলাদেশের জন্য ‘ফিন্যান্সিং গ্রিন গ্রোথ : চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ’ শিরোনামে গবেষণা পরিচালিত হয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক। এই গবেষণার প্রতিবেদনে বাংলাদেশে সবুজ অর্থায়নের ক্ষেত্রে গৃহীত উদ্যোগগুলো লিপিবদ্ধ করার পাশাপাশি পুরো পরিস্থিতির একটি সার্বিক বিররণী তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে সেগুলোও তুলে ধরা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ ও বাইরের উৎস থেকে এ জন্য অর্থায়নের সুযোগগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত খুব কম অর্থায়ন পেয়েছে, যা খুবই সত্য। পাশাপাশি এটাও সত্য যে বাংলাদেশ নিজের জাতীয় বাজেট থেকেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য বিপুল পরিমাণ সম্পদ বরাদ্দ করেছে (আগেই আলোচনা করেছি)। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ওপরের দিকে থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক তহবিলের বরাদ্দের চেয়ে নিজস্ব বাজেটের ওপর নির্ভর করার ফলে বাংলাদেশ নৈতিকভাবে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেদনে আর্থিক খাত বিশেষত ব্যাংকিং খাত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা এসেছে। পাশাপাশি এটাও বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ভূমিকা, যেমন গ্রিন বন্ড ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।

সবুজ অর্থায়নে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলোর ব্যাপক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংক ব্যবসার জন্য পুঁজি সরবরাহ করে, এই পুঁজি ব্যবসার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদানের একটি। কাজেই ব্যাংক থেকে যাঁরা ঋণ নিচ্ছেন তাঁদের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলো এ জন্য প্রয়োজনীয় ঋণও সরবরাহ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, যেহেতু ব্যাংককে নিয়মিত তার গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যে থাকতে হয়, তাই তারা তথ্যের উৎস হিসেবেও খুবই নির্ভরযোগ্য। মাঠপর্যায়ে কী ঘটছে সে বিষয়ে ব্যাংকগুলো খুবই ভালো ধারণা রাখে। ফলে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের উপদেষ্টা হিসেবেও ব্যাংকগুলো কাজে লাগতে পারে। পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিয়ে যেসব গ্রাহক সফল হয়েছেন তাঁদের কৌশল ও অভিজ্ঞতা ব্যাংকের মাধ্যমে অন্য নতুন গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যাতে পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উন্নয়নমুখী ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যিক ব্যংকগুলোর সবুজ অর্থায়নের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে রি-ফিন্যান্সিং স্কিম চালু করা হয়েছে। এর পরিমাণ ও ক্ষেত্র আরো বাড়ানো যেতে পারে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক নৈতিক জায়গা থেকেও সবুজ অর্থায়ন উৎসাহিত করতে পারে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সবুজ অর্থায়নে কী ধরনের ভূমিকা রাখছে এবং তা যথেষ্ট কি না এসব বিষয়ে তথ্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংগ্রহ করে থাকে। এসব তথ্য বহুল প্রচার পেলে উদ্যোক্তাদের মনের পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করা যায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে নীতিনির্ধারকরা সবুজ অর্থায়ন উৎসাহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রস্তুত করতে পারেন।

সরকারের যথাযথ সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সবুজ অর্থায়নের যেসব উদ্যোগ নিয়েছে তার ফলে সারা বিশ্বে উন্নয়নমুখী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রোল মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সবুজ অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক রি-ফিন্যান্সিং স্কিম চালু করেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে ছাড়কৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে (২০১২ সালে ৪৭৮ মিলিয়ন টাকা থেকে ২০১৬ সালে ৯২০ মিলিয়ন টাকা)। যেসব খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ সরবরাহ করা হয়েছে সেগুলো হলো, পরিবেশবান্ধব ইটভাটা, নবায়নযোগ্য শক্তি, সবুজ জ্বালানি ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নির্দেশমালার ফলে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণকারী উদ্যোগে অর্থায়ন প্রতিহত হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ প্রস্তাব বিবেচনার ক্ষেত্রে পরিবেশগত দিক বিবেচনার (এনভায়রনমেন্টাল স্ক্রিনিং) বিধান রেখেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন, বর্জ্য পরিশোধন, অধিকতর জ্বালানি দক্ষতাসম্পন্ন প্রযুক্তি, কম কার্বন নিঃসরণকারী উৎপাদন প্রক্রিয়া ইত্যাদি উদ্যোগের জন্য সস্তায় ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে। রি-ফিন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সহায়তা পাচ্ছে এমন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে সোলার হোম সিস্টেম, সোলার মিনি গ্রিড, সোলার পাওয়ার্ড ইরিগেশন, সোলার পিভি প্যানেল অ্যাসেম্বলি, বায়ো-ফুয়েল, এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট, ব্যাপক দূষণকারী ইটভাটা সরিয়ে পরিবেশবান্ধব ইটভাটা স্থাপন, অর্গানিক কমপোস্ট, পিকো, মাইক্রো অ্যান্ড মিনি স্কেল হাইড্রোপাওয়ার, পিইটি বটল রিসাইক্লিং, সোলার ব্যাটারি রিসাইক্লিং, এলইডি বাল্ব ম্যানুফাকচারিং এবং আরো অনেক। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর (গার্মেন্ট ও চামড়াশিল্প) পরিবেশবান্ধব রূপান্তর করার লক্ষ্যে গঠিত ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড সবুজ অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত আরেকটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এটি যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত উদ্যোগগুলো দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপক প্রশংসিত হলেও মনে রাখতে হবে এখনো সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যেমন—সবুজ অর্থায়নের যথেষ্ট চাহিদা না থাকা, সবুজ অর্থায়নের উচ্চ ঝুঁকি ও উচ্চ মূল্য ইত্যাদি। আমাদের পুঁজিবাজারের অবস্থাও এমন নয় যে এটিকে সবুজ অর্থায়নের নতুন উৎস হিসেবে ভাবা যায়।

এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আর্থিক খাতের ভূমিকা সারা বিশ্বেই অভূতপূর্ব গুরুত্ব পাচ্ছে। সবুজ অর্থায়ন বাড়ানোর জন্য সারা বিশ্বেই নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে মিলে কাজ করছে। চীনে সবুজ অর্থায়নের যে উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের জন্য সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সব শক্তি বিনিয়োগ করেছে। নেদারল্যান্ডসে সে দেশের পেনশন খাত, ব্যাংক ও বীমা খাতের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় টেকসই অর্থায়নবিষয়ক সংলাপ ও কৌশল প্রণয়ন চলছে। ফিন্যানশিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ড, যার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর, এর মধ্যেই টাস্কফোর্স অন ক্লাইমেট-রিলেটেড রিস্ক ডিসক্লোজার গঠন করেছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সে দেশের বীমা খাতেও জলবায়ুসংক্রান্ত ঝুঁকি বিবেচনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে।

সবুজ অর্থায়নে আমাদের এযাবৎ অর্জনগুলো প্রশংসনীয় এটা যেমন ঠিক, পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে আমাদের এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আর্থিক খাতের সবুজায়নের প্রক্রিয়ায় দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অংশগ্রহণ আরো বাড়ানোর লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক উইং গঠনের প্রস্তাবনা করেছেন অ্যাডাম স্মিথ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা। আমি এ প্রস্তাবনার সঙ্গে পুরোপুরি ঐকমত্য পোষণ করছি। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আর্থিক খাতের সবুজায়নের জন্য নীতি-কাঠামো প্রণয়নের দায়ভার ন্যস্ত হতে পারে এই উইংয়ের ওপর। তবে এ রকম উদ্যোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ রাখতে হবে। এতে প্রকৃত চাহিদা অনুসারে সমাধানের কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সহজ হবে। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিজ্ঞতা ও নেতৃস্থানীয় ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে খুবই কাম্য।

ব্যক্তি খাত থেকে পর্যাপ্ত সম্পদ যেন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংক উভয়কেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণকারীরা যেন সবুজায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে সে জন্য বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিশেষ নীতিবিষয়ক সুযোগ-সুবিধা দিতে পারে। যেমন—যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সবুজ অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে তাদের একটি তালিকা প্রকাশ করা যেতে পারে এবং তাদের ভালো ক্যামেলস রেটিং দেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করার সময় আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি কিভাবে মসলাচাষি ও গবাদি পশু পালনকারীদের জন্য সুদে বিশেষ ভর্তুকিসহ ঋণ সরবরাহ করে পুরো কৃষি খাতকে সহায়তা করা যায়। তবে কেন একই পথ অনুসরণ করে সুবজ বা পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ দেওয়া যাবে না? বর্তমানে সিএসআরের মাধ্যমে ব্যয়িত অর্থের ১০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের জন্য দেওয়া হচ্ছে। আমার মতে, এই অনুপাতটি বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা উচিত। সরকার ও বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষগুলো নেটমিটারিং পদ্ধতি চালু করার মাধ্যমে পুরো নগরাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ব্যাপক মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব। এ পদ্ধতিতে একজন বিদ্যুৎ গ্রাহক তাঁর বাসার ছাদে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যদি জাতীয় গ্রিডে সেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করেন, তবে তিনি নিজে যে দামে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কিনে থাকেন তার চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি দাম পাবেন। সম্প্রতি জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে একটি বড় সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প পিপিপির মাধ্যমে চালু হয়েছে এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এ রকম আরো বেশি বেশি সবুজ উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও আর্থিক খাতের সবুজায়নের জন্য যে আন্তর্জাতিক তহবিল রয়েছে সেখান থেকে আমরা এখনো পর্যন্ত খুব বেশি পরিমাণ সহায়তা নিতে পারিনি। এ জন্য শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংসদীয় পরিবীক্ষণ বাড়াতে হবে। তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড বাংলাদেশের ইডকলকে জাতীয় পর্যায়ের বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে ইডকল এই তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা পাবে।

প্রচলিত অর্থায়নের মতো সবুজ অর্থায়নের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় (যেমন—জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা, অফ-গ্রিড সৌরশক্তি প্রকল্পে ব্যবহৃত ব্যাটারি থেকে দূষণের আশঙ্কা ইত্যাদি)। আমাদের বর্তমান চাহিদা ও ভবিষ্যতের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রথাগত আর সবুজ অর্থায়নের একটি সুচিন্তিত মিশ্রণ দরকার। আর এ ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হতে হবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি।

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প শেষ হলে এখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সবুজ জ্বালানি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তবে এ প্রকল্পে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমি যত দূর জানি, প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরাও নিরাপত্তার দিকটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

এসবের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব সেবা ও পণ্য উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করতে হবে, যাতে তাঁরা মূলধারার আর্থিক সেবা পেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগ করে দ্রুত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব (যেমন—একটি অ্যাপের মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও আর্থিক সেবাদাতাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা যেতে পারে)। এটা করা গেলে এমডিজি অর্জনে আমরা যে সাফল্য দেখিয়েছি তার মতো এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রেও আশানরূপ অগ্রগতি হবে।

তবে মনে রাখতে হবে, আর্থিক খাতের সবুজায়নে তাড়াহুড়ার কোনো সুযোগ নেই। একা একা এই যাত্রায় বেশি দূর এগোনো যাবে না। বরং এখানে এগিয়ে যেতে হবে সরকার ও ব্যক্তি খাতের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি কাফেলার মতো। আমি বিশ্বাস করি, যদি দেশের আর্থিক খাতের রেগুলেটরকে যথাযথ স্বাধীনতা ও সহযোগিতা দেওয়া যায়, তবে এই খাত একটি সবুজ ‘সোনার বাংলা’ গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

dratiur@gmail.com

উৎস: কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন