মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সমাপনী পরীক্ষার তাৎপর্য কী?

শাওয়াল খান

আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ প্রদানের দুর্বলতার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে, স্বীকৃত শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ গ্রহণ করেও কাক্সিক্ষত মান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ বেশি বেশি নম্বর পেয়ে মনজুড়ানো আনন্দদায়ক শিক্ষাসনদ লাভ করছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায়। এতে কি প্রাথমিক শিক্ষার কাক্সিক্ষত মান, শ্রেণিভিত্তিক প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জিত হচ্ছে?

শিক্ষার তাৎপর্য অর্জনে। সে অর্জনও হতে হয় পদ্ধতিগতভাবে। অন্যথায় সে অর্জন সুফল বয়ে আনে না। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পরিচালিত হয় নির্দিষ্ট কিছু মানদ-ের আলোকে পদ্ধতিগতভাবে। এসব মানদ- নির্ধারণ করা হয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে।

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য শিক্ষা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের নিমিত্তে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাসকৃত এক আইনের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। অর্থাৎ ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী প্রতিটি শিশু যেন প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রচলিত অর্থে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী বাংলাদেশের সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নির্ধারিত সিলেবাস অনুসারে পাঠদানে যুক্ত করাই হলো বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা। আমাদের প্রত্যাশা, শিক্ষা মানেই মানসম্মত শিক্ষা। তবে প্রাথমিক শিক্ষা হলো শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। শিশুর মনে শিক্ষার ভিত্তিমূল মজবুতভাবে স্থাপন করাই প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার অন্যতম দায়িত্ব।
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত একটা শিক্ষা ব্যবস্থা। দীর্ঘ প্রচেষ্টা এবং প্রণীত আইনের মাধ্যমেই প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জন করে। বাংলা প্রদেশে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রাথমিক শিক্ষা আইন পাস হয়। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতবর্ষের প্রায় প্রত্যেক প্রদেশেই প্রাথমিক শিক্ষা আইন পাস হয়। এসব আইন সব প্রদেশের জন্য প্রায় একই রকম ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ৬ থেকে ১০ বছরের ছেলেমেয়েদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থা হয়। যে কোনো দেশের যে কোনো শিশু প্রথম যে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাস্তরে প্রবেশ করে, তা প্রাথমিক শিক্ষা স্তর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের প্রস্তুতির জন্যও একটি শিক্ষা প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেয়া হয়। সেটা প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নামে পরিচিত। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য শিশুদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করার আগে মানবিক বৃত্তির সুষ্ঠু বিকাশ এবং প্রয়োজনীয় মানসিক ও দৈহিক প্রস্তুতি গ্রহণের পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করা। ধারণা করা হয়, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শিশুর মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। বাংলাদেশেও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন আছে। ৫+ শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বিবেচনা করা হলেও পরবর্তী সময়ে তা ৪+ বছরের শিশু পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে-এমনটাই শিক্ষানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, শিক্ষা ও বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং সুকুমারবৃত্তির অনুশীলন। এছাড়াও অন্যদের প্রতি সহনশীলতা এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য শৃঙ্খলাবোধ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা।

প্রাথমিক শিক্ষাস্তর একেক দেশে একেক রকম। প্রাথমিক শিক্ষাস্তর প্রাথমিক শিক্ষাচক্র নামে পরিচিত। কোনো কোনো দেশে এ চক্রটি ৬, ৭ বা ৮ বছরব্যাপী হয়ে থাকে। সব দেশেই এটি শিক্ষার মৌলিক সাক্ষরতা দক্ষতা প্রদান করে, যা শিশুদের মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা করার ভিত্তি গড়ে দিতে সহায়তা করে।

কর্মমুখী, জীবনকেন্দ্রিক এবং সমাজসম্পৃক্ত শিক্ষানীতির প্রবক্তা জন ডিউইর মতে, শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতি নয়, বরং জীবনের অঙ্গ। কার্যকরী শিক্ষা চলমান এবং জীবনের মতো পরিবর্তনশীল। শিক্ষা হচ্ছে অভিজ্ঞতার নিয়ত পুনর্গঠন পুনর্নির্মাণ এবং রূপান্তর। শিক্ষা অভিজ্ঞতা, শিক্ষা অভিজ্ঞতার জন্য এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ হয়। সমাজের জন্য বিদ্যালয় এবং বিদ্যালয়েই ঘটে থাকে সমাজের উৎকর্ষ সাধনের কার্যকলাপ। প্রতিনিয়ত উদ্ভূত সামাজিক সমস্যা উত্তম শিক্ষা অর্জনের সহায়ক। শিশু সবসময় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখে। দৈনন্দিন জীবনে যেসব সমস্যা আসে, সেগুলো সমাধানের জন্য শিশুরা তাদের বিচার, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। শিশুর শিশুসুলভ মনে জ্ঞান বৃদ্ধির বিকাশ এবং অভিজ্ঞতা লাভে প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক শিক্ষা প্রভাব বিস্তার করে, কৌতূহল জাগায়- যা তাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, ভাবনাকে প্রসারিত করে।

প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান ধারার প্রচলন হয় ১৯৫২ সাল থেকে। এ সময় থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে ৫ বছর মেয়াদি করা হয়। এর আগ পর্যন্ত

প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ৪ বছর মেয়াদি। বাংলাদেশের সাধারণ আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম ধাপ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার বয়স ৬+ বছর। প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৩০।

এ অনুপাত শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসারে ২০১৮ সালের মধ্যেই অর্জন করার কথা; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০১৮ সালের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সে কথাই বলতে হচ্ছে। সম্প্রতি ‘সবার জন্য শিক্ষা’-এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শীর্ষক কালের কণ্ঠের (৮/১১/১৭) বিশেষ আয়োজনে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার দৈন্য ফুটে উঠেছে। দেশের ৬৪ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ শিশু। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকের ঘাটতি দেড় লাখ। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার ৫৮ শতাংশ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত শিক্ষকরা কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু করেন। অথচ শিক্ষার মানের উন্নতির প্রথম শর্ত ভালো শিক্ষক। যে কোনো পর্যায়ের শিক্ষকতার চেয়ে প্রাথমিকে শিক্ষকতা কঠিন। স্পর্শকাতর ও কোমলমতি শিশুদের বুঝে শিক্ষা দিতে হয়। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যায়, চাকরি পেলেই শিক্ষক হয়ে যাচ্ছেন। অনেক পরে তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। আবার এ-ও সত্য, সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারীরাই আসছেন প্রাথমিকের শিক্ষকতায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেকেই কোনো চাকরি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতায় এসেছেন। মেধাবীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিতে নারাজ। দক্ষ শিক্ষকের অভাবে অনেক শিক্ষার্থীই দুর্বলতা নিয়ে শিক্ষা জীবনের প্রথম ধাপটি পার করছে। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান সেভাবে বাড়ছে না বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। মানতে হবে, মানসম্পন্ন শিক্ষক না পেলে শিক্ষার মান বাড়বে না। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না পেলে শিক্ষকরা দক্ষ হয়ে উঠতে পারবেন না। আবার পেশাজীবনের শুরুতেই শিক্ষকরা নিজেদের মতো করে পাঠদান শুরু করে দিলে প্রশিক্ষণও তাদের সেভাবে মানোন্নয়ন করতে পারে না। ফলে শিক্ষকরা একটি সুনির্দিষ্ট গ-ি পেরিয়ে আসতে পারেন না। একটি জরিপেও এ চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে দেখা গেছে, প্রাথমিকে ১৩ শতাংশ শিক্ষক পুরোপুরি সৃজনশীল বা যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্ন বোঝেন না। সীমিত পরিসরে বুঝতে পারা ৪২ শতাংশ ক্লাসে বোঝাতে পারেন না। কালের কণ্ঠের বিশেষ আয়োজন সে কথাই বলছে। আমাদের জানা মতে, প্রাথমিকের অনেক শিক্ষকই গাইড বইনির্ভর। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেও গাইড বই থেকে সরাসরি প্রশ্ন তুলে দেয়া হয়।

আমাদের শঙ্কা, শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে আমরা কি আমাদের শিশু শিক্ষার্থীদের অমিল শিক্ষার কবলে ঠেলে দিচ্ছি? শিক্ষার্থীর আগ্রহ, রুচি ও দক্ষতা এবং সর্বোপরি নিজের শিক্ষা পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে সহায়ক নয় বা বাজার চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কহীন শিক্ষাকে অমিল শিক্ষা বলে আখ্যায়িত করা যায়। অমিল শিক্ষা শিক্ষার্থীর মনে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে, যা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাকে ব্যাহত করে। আমাদের সমাপনী পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের অবস্থা অমিল শিক্ষার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। সমাপনী পরীক্ষার মতো একটি স্কুলপর্যায়ের পরীক্ষায় কেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটবে, নকলের প্রবণতা দেখা দেবে, নকল পরীক্ষার্থী পরীক্ষার হলে আসবে, উত্তরপত্র জালিয়াতির ঘটনা ঘটবে, উত্তরপত্রে টেম্পারিং করে নম্বর বৃদ্ধির অভিযোগ প্রমাণিত হবে, শিক্ষক-অভিভাবক নকলের জোগান দাতা হবে? এভাবে বড় আসরের পরীক্ষার আয়োজন করে বেশি নম্বরে পাস দেখিয়ে আমরা শিশুদের বা শিশু শিক্ষার কী উপকার করছি?

শিক্ষা মানুষকে কী রকমের মানুষ হতে সহায়তা করবে তার চিত্রায়ণই শিক্ষার উদ্দেশ্য। যেসব শিশু এসব আবহের মধ্য দিয়ে সমাপনীর বৈতরণী অতিক্রম করছে, তারা কি এসব আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে না; এ অমিল শিক্ষার সামগ্রিক দায় বহন করবে কে? প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাবর্ষ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ধরা হয়। প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি, পাটিগণিত, সাধারণ বিজ্ঞান ও সমাজবিদ্যা শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, সংগীত ইত্যাদি শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। প্রতি বছর বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শ্রেণী পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করেন। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোনো পাবলিক পরীক্ষা দিতে হতো না। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এ অস্টম শ্রেণী সমাপনের পর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) নামের পাবলিক পরীক্ষা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া আছে। বাস্তবে কাগজ-কলমের এ নির্দেশনা উপেক্ষিত হয়ে আসছে বছরের পর বছর। তার প্রমাণ পঞ্চম শ্রেণী সমাপনের পর সারা দেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী বা পিইসি নামের একটি পাবলিক পরীক্ষা (সর্ববৃহৎ) অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। দিন দিন সেই পাবলিক পরীক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া, পাসের হার বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত কোচিংয়ের বিস্তার ঘটানোসহ শিক্ষা বাণিজ্য বিস্তার এবং শিক্ষার মান অবনমনের চিত্রকে সামনে আনছে। শুধু তা-ই নয়, প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্পন্ন শিক্ষা দক্ষতা অর্জন ও প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের চেয়ে স্বর্ণখচিত চকচকে সার্টিফিকেট হস্তাগত করার প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিচ্ছে জোরেশোরে। এমন ক্ষিপ্র গতি, সজোরে ধাক্কা প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিকে, মূল কাঠামোকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার খরচের পাল্লা দিন দিন ভারি হয়ে আসছে। খরচের জোগান দিতে গিয়ে সীমিত আয়ের অভিভাবকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

গত বছরের (২০১৬) শেষ দিকে প্রাথমিক ‘জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন’ (এনএসএ) শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার মাত্র ৪০ শতাংশ পূরণ করা হয়। বাকি ৬০ শতাংশ নির্ভর করে শিক্ষার্থীর ওপর। অথচ উন্নত বিশ্বে শিক্ষার্থীর শিখন অর্জনে স্কুলের ভূমিকাই ৭০ শতাংশ-শিক্ষার্থীর কার্যক্রম বা উপাদানের ভূমিকা যেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ। খোদ সরকারি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রশ্ন হলো-শিক্ষার্থীরা শ্রেণী অনুযায়ী বিনামূল্যের বই পাচ্ছে, শিক্ষকরা চাকরির শর্ত অনুসারে বেতন পাচ্ছেন, অথচ শিক্ষার্থীরা শ্রেণী অনুযায়ী উপযুক্ত শিক্ষা পাচ্ছে না কেন?

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে ৪ ডিসেম্বর ১০১৭ যুগান্তর পরিবেশিত সংবাদ ভাষ্য মতে, গত বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত এনএসএ প্রতিবেদনে তৃতীয় এবং পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গণিতে অর্জিত মান দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তৃতীয় শ্রেণীতে বাংলা বিষয়ে ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিখন মানই নিম্ন। অর্থাৎ তৃতীয় শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীর যতটুকু শিখন মান অর্জনের কথা, তা হয়নি। বাকি ৬৫ শতাংশের মান সন্তোষজনক। তবে একই শ্রেণীতে গণিতে ৫৭ শতাংশের মানই নিম্ন। অন্যদিকে পঞ্চম শ্রেণীতে বাংলা ৭৭ এবং গণিতে ৯০ শতাংশের মান নিম্নপর্যায়ে আছে।

এর আগে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের শিশুদের শিখন মানের ওপর একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী পঞ্চম শ্রেণীর মাত্র ২৫ শতাংশ শিশু বাংলায় এবং ৩৩ শতাংশ গণিতে প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে। অর্থাৎ এ দুই বিষয়ে যথাক্রমে ৭৫ ও ৬৭ শতাংশ শিশু ভালোভাবে শিখছে না। ওই বছরই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি) অধীনে গাজীপুরে ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি বেজলাইন সার্ভে পরিচালনা করা হয়। সার্ভেতে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণীর মাত্র ২৫ শতাংশের কম শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে পারে। গণিতের অবস্থাও একই রকম।

২০১৫ সালে গণসাক্ষরতা অভিযান পরিচালিত গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা কোচিংনির্ভর হয়ে পড়েছে। অবৈতনিক হলেও তাতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এখন প্রশ্ন- শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারছে না কেন? সারা বছর নির্ধারিত ছক অনুসারে শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিয়ে শিক্ষার্থীরা যদি ৪০ শতাংশ পূরণ করে, বাকি ৬০ শতাংশের জন্য কি আরও এক বছরের বেশি সময় একই শ্রেণীতে পড়বে; নাকি নির্ধারিত মান অর্জন না করেই পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হবে? কোনো শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে কাক্সিক্ষত মান অর্জনে ব্যর্থ হলে তার পক্ষে পরবর্তী স্তরে সে মান অর্জন বেশ কঠিন। এজন্যই শিক্ষানুরাগীরা শিক্ষার্থীর ভিত্তিমূল মজবুত এবং টেকসই করার ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকেন। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ প্রদানের দুর্বলতার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে, স্বীকৃত শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে, প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ গ্রহণ করেও কাক্সিক্ষত মান অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। অথচ বেশি বেশি নম্বর পেয়ে মনজুড়ানো আনন্দদায়ক শিক্ষাসনদ লাভ করছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায়। এতে কি প্রাথমিক শিক্ষার কাক্সিক্ষত মান, শ্রেণিভিত্তিক প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জিত হচ্ছে?

বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীদের যোগ্যতাভিত্তিক কারিকুলামে পাঠদান করা হয়; কিন্তু মূল্যায়ন করা হয় সৃজনশীল পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে পাঠযোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনে শিক্ষার্থী মূল্যায়নে তিনটি দিক বিবেচনা করা হচ্ছে। যথা- জ্ঞানমূলক, অনুধাবন ও প্রয়োগমূলক দিক। সর্বশেষ পিইসি পরীক্ষার সর্বসাকুল্য ৮০ শতাংশ সৃজনশীল পদ্ধতিতে করা হয়। শিক্ষার্থী মূল্যায়নে এত বড় পরিবর্তন আনা হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রস্তুত হননি। এতে যথাযথ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন হচ্ছে-  এ কথা বলা যাবে না। এমনকি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে কার্যকর প্রভাব ফেলছে-  কথাও কি বলা যাবে? হ

শাওয়াল খান : লেখক ও শিক্ষাকর্মী

শেয়ার করুন