মানবিক পৃথিবীর স্বপ্নদ্রষ্টার আগমন

মুফতি শাহেদ রহমানি

আজ পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল। হিজরি সনের তৃতীয় মাসের নাম রবিউল আউয়াল।

এর অর্থ বসন্তের শুরু। এই নামে এ মাসের নামকরণ হয়েছে বসন্তকালের শুরু লগ্ন হওয়ার কারণে। (রেসালায়ে নুজুম, পৃষ্ঠা : ২২৯) অর্থাৎ যখন আরবি মাসের নাম রাখা হয় তখনকার দিনে এ সময়ে ঋতুরাজ বসন্ত বিরাজ করছিল। সে হিসাবে এ মাসকে রবিউল আউয়াল বা বসন্তের সূচনাপর্ব হিসেবে নাম দেওয়া হয়। কিন্তু কালক্রমে এই মাস ও বসন্ত ঋতুর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এটা হয়েছে চান্দ্রমাস ঘূর্ণায়মান হওয়ার কারণে। কিন্তু ঈমানদার নবীপ্রেমিকদের কাছে রবিউল আউয়াল অন্য আরেকটি বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। কেননা এ মাসেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে তাশরিফ এনেছেন, আর এ মাসেই তিনি ওফাত লাভ করেছেন। তাই রবিউল আউয়াল এলে বারবার মনে পড়ে প্রিয় নবীর কথা। তাইতো অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে একটু বেশিই মহানবী (সা.)-এর কথা স্মরণ করা হয়। তাঁকে নিয়ে কবিতা রচনা করা হয়। প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও বই লেখা হয়। বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। নগরে, বন্দরে, শহরে ও গ্রামে ঈদে মিলাদুন্নবী ও সিরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে ১২ রবিউল আউয়াল সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়।

খ্রিস্টীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) ভূমিষ্ঠ হন। তাঁর জন্ম তারিখ ২০ এপ্রিল। আরবি হিজরি সন অনুযায়ী তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেন, রবিউল আউয়ালের ৮ তারিখ মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন। বেশির ভাগ হাদিসবিশারদ একে বিশুদ্ধ বলেছেন। মহানবী (সা.)-এর জীবনীকারদের মধ্যে ইবনে ইসহাক প্রথম সারির জীবনীকার। তিনি বলেন, মহানবী (সা.) হাতিবাহিনীর ঘটনার বছর ১২ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেছেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম, খণ্ড-১, পৃ. ১৫৮)

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব, তাঁর চিরন্তন দাওয়াত ও ত্যাগ-তিতিক্ষার কাছে পৃথিবী ভীষণভাবে ঋণী। তিনি তলোয়ারের নিচ থেকে মানবতাকে উদ্ধার করেছেন। নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা ও পৈশাচিকতার ওপর তিনি ন্যায়নিষ্ঠ, সাম্য, সম্প্রীতি, মমতা ও সৌহার্দ্যের জয়গান গেয়েছেন। তিনি এসেই বদলে দিয়েছেন পৃথিবীর রং ও নিয়ম-কানুন। নিস্তেজ ঘুমন্ত হৃদয়গুলোকে জাগিয়ে তুলেছেন ঈমানের উষ্ণতায়। সেদিন চমকে উঠেছিল পুরনো পৃথিবী। সভ্যতা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ন্যায়নীতি, আধ্যাত্মিকতা, চরিত্র ও সমাজ—সব কিছুতেই এসেছিল আমূল পরিবর্তন। তাঁর আগমনে ভালোবাসা ও উদারতার এক আলোকিত জোয়ারে ভেসে গেছে প্রতিশোধ ও রক্তমূল্যের অন্ধকার হিসাব-নিকাশ। তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এক শান্তিময় ধরা।

মহানবী (সা.)-এর জন্মের দিনে আমাদের করণীয়

মহানবী (সা.)-এর চিরাচরিত অভ্যাস ছিল, তিনি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন। তাঁকে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনে আমাকে নবুয়ত দান করা হয়েছে। ’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ১১৬২)

এই হাদিসের আলোকে জানা যায়, মহানবী (সা.) তারিখ হিসাব করে জন্মদিন পালন করতেন না। তিনি জন্মবার পালন করতেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর জন্মবার হিসেবে প্রতি সপ্তাহে সোমবার রোজা রাখতেন।

তাই এই দিনে উম্মতের করণীয় হলো রোজা রাখা। শুধু ১২ রবিউল আউয়ালই নয়, প্রিয় নবীর জন্ম যেহেতু সোমবার হয়েছে, তাই সপ্তাহের ওই দিনটিতে রোজা রাখা মুস্তাহাব।

একজন মুসলমান পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার জন্য রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা তার অন্তরে থাকা অপরিহার্য। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘তোমাদের মধ্য থেকে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার মাতা-পিতা, সন্তান ও দুনিয়ার সব মানুষ থেকে প্রিয় হব। ’ (বুখারি, হাদিস : ১২)

আর এ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বেশি বেশি তাঁকে স্মরণ করার মাধ্যমে। তাঁর প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠ করার মাধ্যমে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, মহান আল্লাহ তার ওপর ১০টি রহমত বর্ষণ করেন। ’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৩০০৯)

স্মরণ রাখতে হবে, মহানবী (সা.)-এর জন্মের ঘটনার চেয়েও তাঁর সর্বব্যাপ্ত জীবনাদর্শ আমাদের জন্য অধিক প্রয়োজনীয়। মহানবী (সা.)-এর জন্মের বিষয়টি একান্ত তাঁর ব্যক্তিগত। কিন্তু তাঁর সিরাত বা জীবনাদর্শ সব যুগের, সব মানুষের জন্য। বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য। মহানবী (সা.)-এর আদর্শ কোনো বিশেষ দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তাঁর আদর্শ নিত্যদিনের জন্য। অন্য যেকোনো আদর্শ তাঁর আদর্শের সামনে গৌণ। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যারা আল্লাহ ও শেষ বিচার দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। ’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ২১)

প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি কাজে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ বা আদর্শ রয়েছে। রয়েছে তাঁর সুমহান আদর্শ। তাই সে মোতাবেক জীবন পরিচালনা করার মধ্যেই নবীপ্রেমের সার্থকতা লুকায়িত।

লেখক : সিইও, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিকস সেন্টার

সূত্র: কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন