বেঁচে থাকবেন জর্জ হ্যারিসন

 

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে যেসব অবাঙালি মহৎ মানুষের অবদান রয়েছে, জর্জ হ্যারিসন ছিলেন তাদের অন্যতম। একাত্তরে নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের ওপর পাকহানাদার বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব আর হত্যাযজ্ঞ দেখে কেঁদে উঠেছিল বিশ্ববিবেক। নানা দেশে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। মানবতাবিরোধী এই গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করতে পৃথিবীর অনেক ব্যক্তি ও সংস্থা নেয় নানা উদ্যোগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী জর্জ হ্যারিসন বাংলাদেশের এ দুঃসময়ে অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করেন। ১৯৪৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের লিভারপুলে জন্মগ্রহণকারী মাত্র ২৮ বছরের দীর্ঘকেশী ছিপছিপে গড়নের এই যুবক একাত্তরের ১ আগস্ট বাংলাদেশের গণহত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার হন। বাঙালিদের ওপর মির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে হাজার হাজার জনতার সামনে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নামে এক কনসার্টের আয়োজন করেন তিনি, যা বিশ্ব মিডিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার সঙ্গে ছিলেন বব ডিলান, ভারতের বিখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশংকরসহ আরও অনেকে। বাঙালির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় উজ্জীবিত হয়ে হ্যারিসন কনসার্ট থেকে ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য পাঠান। ইউনিসেফের মাধ্যমে তা ভারতের বন্দিশিবিরে অপুষ্টির শিকার শিশুদের খাবার ও চিকিৎসার জন্য ব্যয় করা হয়।

ব্যান্ড মিউজিকের পাশাপাশি জর্জ হ্যারিসন চিরকালই পীড়িত-নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের কল্যাণে এগিয়ে এসেছেন। গানের ভাষায় আর্তমানবতার সেবায় বাড়িয়েছেন সাহায্যের হাত। অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম নেয়া হ্যারিসন তখন লিভারপুল ও জার্মানির হামবুর্গের স্কুল সহপাঠীদের নিয়ে গঠিত ‘বিটল’ নামে একটি ব্যান্ড চালাতেন। প্রথম জীবনে তিনি একজন গিটারিস্ট হিসেবে পরিচিতি পেলেও পরে একজন সফল গায়ক ও গীতিকার হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেন। একসময় তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও হাত দেন। শেষ জীবনে তিনি বাগান করা ও জনহিতকর কাজে মনোনিবেশ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে যারা সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার সুযোগ পাননি তারা লেখালেখি করে, গান গেয়ে বা নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফান্ড সংগ্রহ করে যুদ্ধে অর্থের জোগান দিয়েছেন। বন্দিশিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন দেশের বহু চিকিৎসক, নার্স। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় অনেক বিদেশিও এগিয়ে আসেন নানাভাবে। জর্জ হ্যারিসন ছিলেন তাদেরই একজন।

শোকের মাস আগস্ট। আর একাত্তরের আগস্টের ১ তারিখে অমর সঙ্গীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসন গেয়েছিলেন সেই কালজয়ী গান- ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’। ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ দিবসে শোক পালনের সময় আমাদের বিদেশি বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের কথাও মনে পড়ে যায়। একজন আমেরিকান হয়েও তিনি দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। পরোপকারী, আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল জীবনের অধিকারী জর্জ হ্যারিসন ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর লসএঞ্জেলেসে এক বন্ধুর বাড়িতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আসলে হ্যারিসনের মতো মানুষের মৃত্যু নেই। চিরঞ্জীব হ্যারিসনরা তো চিরকাল বেঁচে থাকেন পৃথিবীর প্রত্যেক শান্তিকামী মানুষের মাঝে। বিশ্ববিবেকের কাছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত করে বিশ্ববাসীর সমর্থন আদায়ে যে অতুলনীয় ভূমিকা রেখেছেন হ্যারিসন, এ দেশের মানুষ তা কৃতজ্ঞতাভরে মনে রাখবে চিরকাল।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গল্পকার

উৎস: যুগান্তর

শেয়ার করুন