প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও উন্নয়ন

মাহবুবা আহসান:: দৈহিক বা মানসিক দিক দিয়ে যারা জীবনে স্বাভাবিক বিকাশের অপূর্ণতা, প্রতিবন্ধকতা বা বাধার শিকার- তারাই প্রতিবন্ধী। মানুষের জন্ম দৈবের অধীন। কেউ জন্মগতভাবেই প্রতিবন্ধী। আবার কেউ কেউ দুরারোগ্য ব্যাধি, দুর্ঘটনা বা যুদ্ধ কবলিত হয়ে প্রতিবন্ধী। সমাজে  মূক, বধির, বিকলাঙ্গ বা জড়বুদ্ধির অধিকারী যারা, তাদের সবাই প্রতিবন্ধী।

প্রতিবন্ধীদের জীবনে পদে পদে বাঁধা। তারা পৃথিবীর রঙ, রূপ ও রসের বিলাস-বৈচিত্র্য অনেক কিছুই উপভোগে অক্ষম। তারা সুস্থ মানুষের মত হেঁটে চলে বেড়াতে অপটু। দিকে দিকে যে বিচিত্র কর্মধারা নিত্য প্রবাহিত, সেখানে যোগ দিতে তারা অক্ষম। ফলে ধীরে ধীরে তাদের জীবনে নেমে আসে হতাশা। অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তাদের জীবন নিমজ্জিত হয়। কর্মের জগতেও তাদের ভাগ্যে জোটে অনাদর, উপেক্ষা। শুধু দেহ-মনেই যে তারা পঙ্গু তা নয় অর্থনৈতিক দিক থেকেও নানাভাবে তাদের জীবন বিপর্যস্ত। ভালোবাসার মানবিক উষ্ণ স্পর্শ থেকে তারা বঞ্চিত। সামাজিক আনন্দ-অনুষ্ঠানে, মানুষের বিচিত্র কর্মযজ্ঞে তাদের কুণ্ঠিত প্রবেশ। যে জন্ম দৈবের অধীন, যে পঙ্গুতা নিয়তির বিধান তাকে বরণ করে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। আবার অতি দরদও তাদের জীবনের সহজ বিকাশকে করে তুলেছে আরো অসহায়। ফলে তারা আত্মনির্ভর হতে শেখে না, এমনকি আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলে।

মনে রাখতে হবে প্রতিবন্ধীরা দেশ, জাতি বা পরিবারের বোঝা নয়, নয় সমাজের অগ্রগতির বিচিত্র ধারাপথের অন্তরায়। বরং তাদের অংশগ্রহণে সেই সমাজ প্রবাহ হবে আরো প্রাণময় ও গতিশীল। যখন সমাজ ও সরকার এই অবহেলিত উপেক্ষিত মানুষের জন্য ন্যায্য বা পূর্ণ অধিকার লাভের সুযোগ করে দেবে, সমতার ভিত্তিতে প্রতিবন্ধীদের সমস্যা সমাধানের উপায় উদ্ভাবন করবে, প্রতিবন্ধী-বর্ষ পালনের ব্রত তখনই হবে সার্থক।

ইতোমধ্যে প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করেছে। গত কয়েক বছরে ৭ হাজারেরও বেশি প্রতিবন্ধীর কর্মসংস্থান সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছে। এসব কেন্দ্রে সেলাই, কাটিং, ছাপাখানা ও বই বাঁধানোর কাজ শেখানো হবে। এছাড়া শেখানো হবে হালকা ধরনের যন্ত্রপাতি চালানোর কাজ ইত্যাদি। ১৫ লক্ষ ৭০ হাজার ৭৭৭ জন প্রতিবন্ধীর তথ্য সম্বলিত বিশাল ডাটাবেইজ তৈরি করেছে সরকার। এই ডিজিটাল ডাটাবেইজ থেকে যে কোনো প্রতিবন্ধীর বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীবান্ধব সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিকভাবে সম্মাননা পেয়েছেন, যা দেশের প্রতিবন্ধীদের সম্মান বৃদ্ধি করেছে। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এই ব্রত উদযাপনে নিয়েছে সক্রিয় অংশগ্রহণ। এগিয়ে এসেছে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত বেশ কিছু সংস্থা। প্রতিবন্ধীদের সাহায্যের জন্য ইউএনও, আইএলও এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রও আজ সচেষ্ট। তবে প্রয়োজনের তুলনায় আয়োজন এখনও সামান্য। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের দিকটিতে দিতে হবে বিশেষ ও সমবেদনাপূর্ণ গুরুত্ব। দিতে হবে তাদের শিক্ষা ও কাজের সহায়ক উপকরণ। এ লক্ষ্যে তাদের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিবন্ধীরা যাতে কোনোভাবেই বিরূপ পরিবেশের শিকার না হয় তার দিকে লক্ষ রাখতে হবে ইত্যাদি।

সবশেষে বলতে চাই – প্রতিবন্ধীরা পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের গলগ্রহ নয়, নয় করুণার পাত্র। তাদেরও অধিকার আছে। এই পৃথিবীতে তাদেরও দেওয়ার আছে অনেক কিছু। যদি আমরা তাদের প্রতি সদয় হই এবং তাদেরকে যদি আমরা একটু আদর দিয়ে, স্নেহ দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলি, তাহলেই চির অবহেলিত প্রতিবন্ধীরা খুঁজে পাবে তাদের দুর্লভ মানবজন্মের একটি গৌরবময় অধ্যায়। এ কামনাই রইল আমাদের।

লেখক : ব্যাংকার, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড

শেয়ার করুন