পরিবেশদূষণের ক্ষতি ও উত্তরণের উপায়

ধরিত্রী সরকার সবুজ

গত ১০ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাংক ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা-২০১৭’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর আগে ২০০৬ সালে বিশ্বব্যাংক এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

এবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বায়ু, পানি ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশদূষণ এবং শিশুদের ওপর ভারী ধাতু সিসার প্রভাবে বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২.৭ শতাংশ। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের বায়ু, পানি ও মাটিদূষণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, ঢাকার খালগুলো হারিয়ে যাওয়াসহ দেশের জেলা শহরের পরিবেশদূষণের প্রতিও আলোকপাত করা হয়েছে।

রাজধানীতে মানুষ বাড়ছে। বাড়তি মানুষের জন্য বাড়ছে পানির চাহিদা। সে চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে ওয়াসা হিমশিম খাচ্ছে। ত্বরিত সমাধানের পথ হিসেবে পাম্প বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পথই বেছে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের পক্ষে এ চাপ বেশিদিন সহ্য করতে পারার কথা নয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বেশি নিচে নেমে গেলে একসময় রাজধানীর বেশির ভাগ পাম্পই পানি উঠাতে সক্ষম থাকবে না।

তখন রাজধানীর পানি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে।

দখল আর দূষণে রাজধানীর খালগুলো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রবাহ রুদ্ধ করে দখলদাররা গড়ে তুলেছে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। খালের ওপরে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী টংঘর থেকে শুরু করে চার-পাঁচতলার অট্টালিকা। অনেক জায়গায় খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। একসময় রাজধানীতে ৪৩টি ছিল। এর মধ্যে ১৭টি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। অবশিষ্ট ২৬টিকে এখনো চেনা যায়, তবে কোনো অংশে খাল হিসেবে, কোনো অংশে নর্দমা হিসেবে, আবার কোনো অংশে একেবারে সরু একটি পানি প্রবাহের নালা হিসেবে। রাজধানীর খালগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো মাঝেমধ্যেই খালগুলো পরিদর্শনে যায়, খাল থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও খাল সংস্কারের নির্দেশ দেয়, মাঝেমধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। অভিযান শেষেই দখলদাররা আবার অবকাঠামো গড়ে তোলে। বিভিন্ন সময়ে ঢাকার কয়েকটি খালকে বক্স কালভার্টে রূপান্তরের মতো আত্মঘাতী কাজ করা হয়েছে। এখনো যে খালগুলো মৃতপ্রায় হিসেবে বেঁচে আছে সেগুলোকে সঠিক চেহারায় ফিরিয়ে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র আরো ভয়াবহ হতে বাধ্য।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে পানিদূষণের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়েছে, ৭১৯টি তৈরি পোশাকশিল্পের ওয়াশিং ও ডাইং কারখানা থেকে প্রতিদিন রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে বর্জ্য এসে পড়ছে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বুড়িগঙ্গা নদীর অনেক স্থানের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ফলে সে পানিতে কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা বা তুরাগ—এগুলোর দূষণের প্রকৃতি অনেকটা এক। প্রথমত, মানবসৃষ্ট পয়োবর্জ্য ও অন্যান্য আবর্জনা সরাসরি মিশছে এসব নদীতে। দ্বিতীয়ত, কল-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে সরাসরি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। পয়োবর্জ্য ও আবর্জনা একধরনের জীবাণুর সাহায্যে সৃষ্টি করছে দুর্গন্ধযুক্ত পাঁকসদৃশ বস্তু। জন্ম হচ্ছে প্রচুর ব্যাকটেরিয়ার, যা নদীর পানির অক্সিজেন গ্রহণ করে কমিয়ে দিচ্ছে পানির অক্সিজেনের পরিমাণ।

পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় শিল্প-কারখানা পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখেছে অনেক শিল্প-কারখানাতেই ইটিপি স্থাপন করা হয়নি। যেগুলোতে ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে তারও প্রায় অর্ধেকই বন্ধ থাকে। ইটিপি স্থাপনের পরও শুধু পরিচালন ব্যয়টুকু বাঁচানোর জন্য শিল্প মালিকরা এ কাজটি করেন।

বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা যে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী সেটিও পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে করা এক সমীক্ষায়। গত অক্টোবরে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যান্সেটের একটি গবেষণা প্রতিবেদন বলেছে, ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী ৬৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পানিদূষণের কারণে মৃত্যু হয়েছে ১৮ লাখ মানুষের। হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো রোগে মারা গেছে এসব মানুষ। দূষণের কারণে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে।

রাজধানীতে বায়ুদূষণ পরিমাপের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর তিনটি স্থানে বায়ুদূষণ পরিমাপের যন্ত্র বসিয়েছে। গত ২২ নভেম্বর বুধবার ঢাকার বায়ুমানের সূচক ছিল ২৬৯, যা পরিবেশ অধিদপ্তরের মান অনুযায়ী লাল ক্যাটাগরির; অর্থাৎ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কল-কারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটার ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা ঢাকার বাতাস প্রতিনিয়ত দূষিত করছে। আইন থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে ইটভাটাগুলোকে এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা যায়নি। পুরনো যানবাহন ঢাকার বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ছড়ায়। ধুলাদূষণ রাজধানীর এখন বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বাতাসে ভারী বস্তুকণার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীবাসীর মধ্যে হাঁচি, কাশিসহ শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাতাস, পানি ও মাটির এসব দূষণ কমিয়ে আনতে না পারলে জনস্বাস্থ্যের যে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে তার জন্য আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে। অর্থের মাপকাঠিতে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের কারণে বছরে ৪২ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির যে আর্থিক হিসাব করেছে, জনস্বাস্থ্যের বিবেচনায় সে ক্ষতি আরো অনেক বেশি ও দীর্ঘমেয়াদি এবং বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পথে একটি বড় অন্তরায়। আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশকে মধ্যম বা উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে পরিবেশ রক্ষা করেই অগ্রসর হতে হবে।

লেখক : পয়ঃপ্রকৌশলী, ইংল্যান্ডের গ্রিনিচ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনভায়রনমেন্টাল কনজারভেশন বিষয়ে মাস্টার্স

শেয়ার করুন