নারী নির্যাতন রোধে পুরুষের ভূমিকা

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৭’ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, কিছু নির্দিষ্ট সূচকে দেশটি আগের বছরের তুলনায় অনেক এগিয়েছে। মোট ১৪৪ দেশের মধ্যে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম, যা গত বছর ছিল ৭২তম। এরকম অগ্রগতির চিত্র দেখলে কার না ভালো লাগে! তবে প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা, সেই সঙ্গে অন্যান্য প্রতিবেদন পড়লে এতটা আশাবাদী হওয়া যায় না। যেমন, ২০১৩ ও ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতার ওপর জরিপ প্রতিবেদন আমাদের বেশ ভাবিয়ে তোলে! ব্যুরোর ২০১৬ সালের প্রতিবেদন বলছে, দেশে বিবাহিত নারীর ৮০ শতাংশ তাদের জীবনে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। বস্তুত সহিংসতার এমন কোনো ধরন নেই যেটিকে খাটো করে দেখা যাবে কিংবা পরিস্থিতি ভালো বলা যাবে। সম্প্রতি গণমাধ্যম থেকে আমরা জানতে পেরেছি, বগুড়ার শিবগঞ্জ ও রংপুরের তারাগঞ্জের কয়েকটি বিদ্যালয়ে এ বছর জেএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেও পরীক্ষায় বসেনি শতাধিক ছাত্রী। তথ্যমতে, বাল্যবিবাহ হয়ে যাওয়ায় তারা পরীক্ষা দিতে পারেনি। এখানে বলে রাখা দরকার, নারীর প্রতি সহিংসতার সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রকৃত চিত্র পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই দুঃসাধ্য। কারণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা বাধ্যবাধকতায় অনেকে সেটা প্রকাশ করতে চান না। আমরা এও দেখি, সহিংসতার শিকার নারীকেই দোষারোপ করার মানসিকতা অনেকের মধ্যে থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতি অনেক নারীকে সহিংসতার ঘটনা প্রকাশেও নিরুৎসাহিত করে। ফলে পরিসংখ্যানের চেয়ে প্রকৃত ঘটনা যে অনেক বেশি, তা সহজেই অনুমেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের এত অগ্রগতি সত্ত্বেও নারীর প্রতি সহিংসতা কেন কমছে না?
তাত্ত্বিক ও অধিকারকর্মীরা প্রায়ই এজন্য ‘পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে’ দায়ী করেন। কিন্তু সব পুরুষই কি এমন ‘মানসিকতা’ ধারণ করে? অনেক পুরুষই তো সহযোদ্ধা হিসেবে নারীর এগিয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে পাশে থাকে। আসলে সমাজে দু’ধরনের পুরুষ আছে- একপক্ষ নারীর প্রতি সংবেদনশীল এবং নারীর প্রতি সহিংসতার ইস্যুতে সবসময় সোচ্চার; অন্যপক্ষ নারীর প্রতি সহিংসতার ইস্যুতে সবসময় নারীর ওপর দোষারোপ করতে আগ্রহী।
এখন ভাবতে হবে নারীকে সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রের আইন-আদালত, সচেতনতা সৃষ্টি ইত্যাদি ছাড়াও ‘পুরুষ’ কীভাবে উন্নয়নের একটি প্রভাবক হতে পারে? গত চার দশকে জেন্ডার বিষয়ে ‘নারী’ একটি ক্যাটাগরি হিসেবে যতটা গুরুত্ব পেয়েছে নানা ক্ষেত্রে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুরুষকে ততটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। অথচ একটি ক্যাটাগরি হিসেবে ‘পুরুষই’ নির্যাতনকারী! আবার সমাজে নারীর প্রতি যারা সংবেদনশীল পুরুষ, তাদেরও গুরুত্বের সঙ্গে ফোকাস করা হয়নি। তবে আশার কথা হচ্ছে, সাম্প্রতিককালে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পুরুষের ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। পুরুষকে কীভাবে আরও সম্পৃক্ত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা-প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ দেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা তাদের কাজকর্মে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পুরুষের ইতিবাচক ভূমিকার ওপর জোর দিচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রমাণিত হচ্ছে, পুরুষকে বেশি সম্পৃক্ত করতে পারলে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের কাজ আরও বেগবান হতে পারে।
সমাজের অনেক পুরুষই এখন বুঝতে পারছেন, একজন নির্যাতনকারী শুধু নারীর শত্রু নয়, সমাজেরও শত্রু। এরকম শত্রুর সংখ্যা সমাজে বেশি নয়, তবে তারা হয়তো নানা কারণে অনেক ক্ষমতাবান। তাই বলে এরকম অল্পসংখ্যক শত্রুর অপরাধের দায়ভার সব পুরুষের ওপর বর্তাতে পারে না। সমাজের সব পুরুষকে উপলব্ধি করতে হবে, অতি অল্পসংখ্যক পুরুষ বাদবাকিদের জন্য কলঙ্ক বয়ে আনছে। সেই উপলব্ধি সবার জন্য সহায়ক হবে।
আশার কথা হচ্ছে, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১-তে পুরুষ ও যুবকদের সম্পৃক্ত করে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এখন দরকার সেই নীতিমালা ও যথাযথ কর্মপরিকল্পনার আলোকে এর সঠিক বাস্তবায়ন।

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান : উন্নয়নকর্মী

সূত্র: যুগান্তর

শেয়ার করুন