ধূমপান প্রতিরোধে শরয়ি দৃষ্টি

সিলেটের সকাল ডেস্ক।। ধূমপান শব্দটি ‘ধূম’ এবং ‘পান’ শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত। ধূম হলো ধোঁয়া বা বাষ্পের প্রতিশব্দ। আর ধূমপান হচ্ছে, তামাক জাতীয় দ্রব্য বিশেষ উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে শ্বাসের সঙ্গে তার ধোঁয়া শরীরে গ্রহণের প্রক্রিয়া। এ তামাকজাত দ্রব্যটির ব্যবহার মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অভিমত, সিগারেট বা তামাক এমন একটি দ্রব্য, যা সেবন করলে জীবননাশ করে দেয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ রাখে না।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, সিগারেট বা তামাকে প্রায় ৪ হাজার বিষমিশ্রিত পদার্থ রয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগ কেমিক্যাল হচ্ছে Carcinogenic (ক্যান্সারজনক), যা মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টির প্রধান কারণ। নিকোটিন, অ্যামোনিয়া, কার্বন মনোক্সাইড, মিথেন, বিউটেন, ক্যাডমিয়াম, ফরমালডিহাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, আর্সেনিকÑ এসব বিষাক্ত পদার্থই তামাকে বিদ্যমান থাকে।

আমরা জানি, নিকোটিন ইঁদুরের বিষ হিসেবে, আর্সেনিক ইঁদুরের বিষ হিসেবে, মিথেন রকেটের জ্বালানি হিসেবে, বিউটেন হালকা জ্বালানি গ্যাস হিসেবে, ক্যাডমিয়াম ব্যাটারিতে আর ফরমালডিহাইড ল্যাবরেটরিতে মানুষের টিস্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সংরক্ষণ করতে ব্যবহৃত হয়। আর তামাক সেবনের কারণে এসব মরণঘাতী পদার্থ মানবদেহে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ টিস্যু ও Organ-গুলোর মৃত্যু ঘটায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, প্রতি বছর সারা বিশ্বে প্রায় ৬০ লাখ লোক তামাকের ক্ষতিকর প্রভাবে মারা যায়। (সর্বমোট মৃত্যুর প্রায় ১০ শতাংশ), যার প্রায় ৬ লাখ পরোক্ষ ধূমপানের স্বীকার। বিংশ শতাব্দীতে তামাক প্রায় ১০ কোটি ব্যক্তির মৃত্যু ঘটিয়েছে। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন সেন্টারও এটাকে বিশ্বব্যাপী অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ধূমপান করার কারণে মানবদেহে যেসব ক্ষতি হয়ম তার সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছেÑ ক্যান্সার, যক্ষ্মা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, অ্যাজমা, কফ, অকালজন্ম, বন্ধ্যত্ব, পরিপাকতন্ত্রে সংক্রমণ, মাংসপেশি অকার্যকর, চিন্তাশক্তির সামনে পর্দার আবরণ পড়া, হজম প্রক্রিয়ায় বাধাগ্রস্ত, একটুতেই ঘাবড়ানো, মাঝে মধ্যে হাত-পা কাঁপতে থাকা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, অনিদ্রা, হাত ও আঙুলে হলুদ দাগ হওয়ার কারণে ফুসফুস, যকৃৎ ও অন্যান্য Internal organঅকেজো হয়ে যায়। একজন ধূমপায়ীর গড় আয়ু অধূমপায়ীর গড়ের চেয়ে ১০ বছর কমে যায়। ধূমপায়ী নারী গর্ভবতী হলে গর্ভপাত, শিশুর অকালজন্ম, ওজন হ্রাস ইত্যাদি সমস্যা হয়। ধূমপানের কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, পরিবেশ দূষণ হওয়া এবং ধূমপায়ীর পাশে থাকা লোকদেরও ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা থাকে।

ইসলামে ধূমপানের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞামূলক কোনো আয়াত বা হাদিস না থাকলেও এমন কিছু আয়াত ও হাদিস আছে, যা পরোক্ষভাবে ধূমপান নিষিদ্ধের ওপরই জোর নির্দেশ দেয়। যেমন পবিত্র কোরআন বলছে, ‘(বার্তাবাহক) তাদের সৎকাজের আদেশ ও মন্দকাজের বাধা দেয়। তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করে…।’ (সূরা আল আরাফ : ১৫)।

‘তোমরা তোমাদের নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনো না।’ (সূরা আল বাকারা : ১৯৫)। এ ছাড়াও আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা মদ হারাম ঘোষণা করেছিলেন মদের মধ্যে উপকারের চেয়ে অপকারের মাত্রা বেশি থাকার কারণে; কিন্তু সিগারেট বা তামাক জাতীয় দ্রব্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বিন্দু পরিমাণও ভালোর পক্ষে কথা বলেননি।

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেঁয়াজ ও রসুন খায়, সে যেন অবশ্যই আমাদের থেকে পৃথক থাকে এবং সে যেন আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে।’ (বোখারি ও মুসলিম)। বুঝতে অসুবিধা নেই যে, এখানে রাসুল (সা.) যে কথাটি বোঝাতে চাচ্ছেন, তা হলো কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন খেলে যে দুর্গন্ধ বের হয়, তা অন্যান্য মানুষের জন্য কষ্টকর বিধায় তিনি এ উক্তিটি করেছেন।

এসব আয়াত, হাদিস মদ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই ড. ইউসুফ আল কারজাভি ‘ধূমপান নিষেধ’ বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন। যদিও কিছু কিছু মুফতি এটাকে মাকরুহ বলে ঘোষণা করেছেন। সর্বোপরি কথা হচ্ছে, ধূমপান অপবিত্র খাদ্য, এটা মরণঘাতী, পরবেশ নষ্টকরী, অর্থ অপচয়কারী, সময় হরণকারী, অপরকে কষ্ট দেয়, অসামাজিক, দুর্গন্ধময় ইত্যাদির কারণে নিষিদ্ধ হওয়ারই দাবি রাখে। আর ইসলাম মরণঘাতী কোনো জিনিসকে নিষিদ্ধের দিকেই রায় প্রদান করে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন