কোচিং বন্ধে দুদক দাওয়াই

ড. হারুন রশীদ

কোচিং বাণিজ্য এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটা বন্ধ করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদদ) মাঠে  নামতে হয়েছে। এটা একদিকে যেমন পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে, অন্যদিকে স্বস্তির কারণ যে এর ফলে কোচিং বন্ধে এবার হয়তো কার্যকর একটা কিছু হতে চলেছে।

কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ঢাকার আটটি নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯৭ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদে পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে কোচিং বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘শাস্তিমূলক’ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেছে দুদক। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ঘটনা। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই।

দুদক সচিব ড. শামসুল আরেফিনের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭২ জন শিক্ষক ও সরকারি চারটি বিদ্যালয়ের ২৫ জন শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে যুক্ত বলে দুদক প্রমাণ পেয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা, ২০১২ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে দীর্ঘদিন ধরে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে সরকারের কাছে দাবি জানানো হলেও কাজ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকরা স্কুলের বাইরে কোচিংয়ে ক্লাস করিয়ে বাড়তি টাকা পান বলে স্কুলগুলোতে ঠিকমতো ক্লাস নেন না। কিন্তু সরকার যেহেতু তাঁদের বেতন দেয়, স্কুলে ঠিকমতো ক্লাস নেওয়া তাঁদের দায়িত্ব।

তাই শিক্ষকদের কোচিংয়ে ক্লাস নেওয়া বন্ধ করা জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা অত্যাবশ্যক।

সত্যি বলতে কি, শিক্ষাঙ্গনে কোচিং ব্যবস্থা এক মারাত্মক ব্যাধির রূপ নিয়েছে। এর বিস্তার ঘটেছে বিপুলভাবে। অধিক উপার্জনের জন্য এক শ্রেণির শিক্ষক কোচিংয়ে শক্তি ও সময় ব্যয় করছেন। ফলে উপেক্ষিত হচ্ছে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাদান। আবার এর অন্য একটি অনৈতিক দিকও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও একধরনের চাপ অনুভব করেন শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকের কাছে কোচিং পড়াতে। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে এটা অনৈতিক কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতামূলক সমাজে সাধারণভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল লাভের আশায় শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ছে।

শিক্ষার উন্নতির জন্য পুরো বিষয়টি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্য, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে কোচিং ব্যবসা ও শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করতেই হবে। শিক্ষাকে কিছুসংখ্যক লোকের অনৈতিক বাণিজ্যের ধারা থেকে বের করে আনতে মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে শিক্ষকদের পূর্ণ প্রস্তুতি ও মনোযোগ দিতে হবে। বিশ্বের কোথাও মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এ ধরনের কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনির রমরমা ব্যবসা নেই। বর্তমান বাস্তবতায় কোচিং ব্যবসা বন্ধের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণদানের পাশাপাশি দক্ষ, মেধাবী ও সঠিক যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের শিক্ষকতার পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বর্তমানে সারা দেশে কোচিং বাণিজ্যের দৌরাত্ম্য কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ভালোভাবেই জানেন। কোচিংয়ের নামে প্রতিষ্ঠানগুলোয় দুর্নীতিসহ নানা অনৈতিক কার্যকলাপ চলে। অনেক শিক্ষক কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনির সঙ্গে অতিমাত্রায় জড়িয়ে পড়ায় ভালোভাবে ক্লাস নেন না। শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে প্রলুব্ধ করেন। যারা কোচিং করে, পরীক্ষায় তাদের বেশি নম্বর দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গেও কোনো কোনো কোচিং সেন্টার জড়িত বলে অভিযোগ আছে। কোচিংয়ের আড়ালে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ প্রচারের অভিযোগ অনেক পুরনো। এসব কারণে সমাজে কোচিং ব্যবসা বন্ধের দাবি দীর্ঘদিনের।

শিক্ষামন্ত্রী নিজেও কোচিংকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিভিন্ন সময়। তিনি বলেছেন, ক্লাসে ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না। ক্লাসে পুরো শিক্ষা শেষ করা হলে কোচিং বন্ধ হয়ে যাবে। কোচিংয়ের দ্বার অবারিত রেখে ক্লাসে ঠিকমতো পড়াশোনা নিশ্চিত করা সম্ভব কি না সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কোচিং বাণিজ্য আজ এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে তা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামগঞ্জেও। এ বাস্তবতায় কোচিং বাণিজ্য বন্ধের দাবিটি উপেক্ষা করার নয়। অন্তত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শিক্ষকদের কোচিং করানো থেকে বিরত রাখতে নিতে পারে বিশেষ ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে সরকারেরও মনিটরিং থাকা উচিত। সরকার যদি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ক্লাসে ভালোভাবে পড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে হয়তো আইন করে কোচিং বন্ধের প্রয়োজন হবে না, এমনিতেই তারা নিরুৎসাহী হবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষকদের হতে হবে শিক্ষার্থীর প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল। দুর্বল শিক্ষার্থীর প্রতি দিতে হবে বিশেষ দৃষ্টি। প্রয়োজনে ক্লাসের বাইরে বা বিশেষ ক্লাস নিয়ে তার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এ জন্য তার কাছ থেকে অর্থ নেওয়া চলবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিজ দায়িত্বেই এটা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব অবশ্যই শিক্ষকের। কারণ তাঁরাই প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ক্ষেত্র তৈরির জন্য ক্লাসে অবহেলা করেন। কোচিং বন্ধে দায়িত্ব রয়েছে অভিভাবকদেরও। তাঁরা সন্তানের বেশি নম্বরের আশায় তাকে নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষায় নম্বর বা ফলটাই হয়ে ওঠে মুখ্য, সন্তান কতটা মানসম্পন্ন শিক্ষা গ্রহণ করছে তা নিয়ে যেন কারো মাথাব্যথা নেই। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিশ্চিত করার স্বার্থেই কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষা খাতে সব সময়ই কম বরাদ্দ দেওয়া হয়। শিক্ষকদেরও পরিবার-পরিজন রয়েছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রক্ষা করতে গিয়ে তাঁরা হিমশিম খান। এক শ্রেণির শিক্ষকের নৈতিক অধঃপতনের দায় পুরো শিক্ষক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সমীচীন নয়, আমরা এটা মানি। তাই অধঃপতিত শিক্ষকদের শনাক্ত করাও আজ সময়ের দাবি। কোচিং সেন্টারে মেয়ে শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের ঘটনাও ঘটেছে। তবে আশার কথা হলো, সমাজ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। গণমাধ্যম তার সতর্ক দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে। সম্মিলিতভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে সাধারণ মানুষ। আমাদের প্রত্যাশা, বিলম্ব হলেও বাংলাদেশে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।

শিক্ষার মানোন্নয়ন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শুধু পাসের হার ও উচ্চতর গ্রেডই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য নয়, পাশাপাশি নৈতিক মানসম্পন্ন সুনাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলাই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীর নৈতিক মানোন্নয়নের বদলে প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ও জিপিএর প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থায় মানহীনতা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরাই পাস করে শিক্ষকসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। মানহীন ও নৈতিকতাবিবর্জিত, সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার ফলে সমাজে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইভ টিজিং, শিক্ষকদের মানহীনতা থেকে ছাত্রীদের যৌন নির্যাতন ও হয়রানির মতো ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য কলঙ্কজনক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও অভিভাবকদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তবে এ কথা সত্য যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদানের যথার্থ মান রক্ষিত না হওয়া ও শ্রেণিকক্ষেও শিক্ষকদের অমনোযোগিতা ও অদক্ষতার জন্যই প্রাইভেট কোচিং অথবা টিউশনি ও কোচিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক।

বর্তমান বাস্তবতায় কোচিং-ব্যবসা বন্ধের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নে নৈতিক শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ভিনদেশি অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ রোধে, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে সব সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণদানের পাশাপাশি দক্ষ, মেধাবী ও সঠিক যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের শিক্ষকতার পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

উৎস: কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন