কিশোরীদের সাফল্যে জাতি গর্বিত

ইকরামউজ্জমান

বছরের শেষ প্রান্তে কিশোরী ফুটবলাররা (অনূর্ধ্ব-১৫) জাতিকে গৌরবোজ্জ্বল এক বিজয় উপহার দিয়েছেন। বিজয়ের মাসে দেশকে গৌরবান্বিত করার পাশাপাশি মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন অদম্য কিশোরী ফুটবলাররা।

অসাধারণ নৈপুণ্যের মাধ্যমে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন বাঙালির ফুটবলের নিস্তেজ গাঙে আবারও জোয়ার আনা অসম্ভব কিছু নয়! দেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় খেলা আবার দাঁড়াতে পারবে, যদি সুষ্ঠুভাবে লালন-পালন করা হয়। দেশে মেয়েদের ফুটবল চর্চা এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে পদার্পণের ইতিহাস তো ১৫-১৬ বছরের বেশি নয়। এই সময়ের মধ্যে বাঙালি মেয়েদের এগিয়ে চলা ও সাফল্য অর্জন দেশের ফুটবলে অনেক বড় প্রেরণা। চ্যালেঞ্জ শক্ত, তবে অসম্ভব নয়—সেটাই প্রমাণ করেছেন মেয়ে ফুটবলাররা। নেপাল ও তাজিকিস্তানে গত দুই বছরে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা হয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকায় গত বছর এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাই পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চলতি বছর থাইল্যান্ডে অনূর্ধ্ব-১৬ এশিয়ান মহিলা ফুটবলের চূড়ান্ত আসরে আট দেশের মধ্যে মেয়েরা স্থান করে নিয়ে লড়াকু ইতিবাচক ফুটবল খেলেছেন। এরপর দক্ষিণ এশিয়ার অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবলে সেরা হিসেবে পরিচিত হওয়া। মহিলাদের ফুটবলে অর্জন গড়ার পাশাপাশি বড় স্বপ্নের পরিধিও বাড়ছে।

গত শনিবার প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে গতিময় ও উপভোগ্য খেলা খেলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আত্মবিশ্বাসী ও লড়াকু বাংলাদেশ দল।

রবিন লিগ পদ্ধতিতে খেলার ফাইনালে শক্তিশালী ভারতকে ১-০ গোলে পরাজিত করেছে বাংলাদেশের মেয়ে দল। লিগ পর্যায়ে পরাজিত করেছিল ৩-০ গোলে ভারতকে।

সার্কভুক্ত দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭২ কোটি। এই জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। সেখানে বাংলাদেশের মেয়ে দল সবাইকে টপকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এটি একটি অসাধারণ সাফল্য। পুরুষ জাতীয় দল তো সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে গত তিন আসরে গ্রুপ পর্যায়ের বেড়াই অতিক্রম করতে পারেনি। দেশের ফুটবলে এখন সেরা বিজ্ঞাপন হলো ‘লড়াকু মহিলা দল’।   ফিফার র‌্যাংকিংয়ে মেয়ে দল ১০০-তে উঠে এসেছে। মেয়ে দলের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি ক্রমে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে।

মেয়েদের ফুটবলে সৌন্দর্য ও ইতিবাচক দিক হলো ধারাবাহিকতার সঙ্গে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলা। আমরা পারব, দেশের জন্য আমাদের পারতে হবে—এই মানসিকতা, এটাই এগিয়ে নিয়ে চলেছে। পূর্বসূরিদের পক্ষে যেটা সম্ভব হয়নি, বর্তমান প্রজন্ম সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে, আরো দূরের বড় বন্দরে পৌঁছতে পারবে—সেই প্রত্যয় ও বিশ্বাসে তারা বলীয়ান।

দেশে জাতীয় পুরুষ দল তো এখন গাঢ় অন্ধকারে (ফিফার র‌্যাংকিংয়ে ১৯৭) তলিয়ে আছে, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ থেকে (এএফসি) বঞ্চিত, এমন সময়ে দেশের ফুটবলে আলো জ্বালিয়েছেন কিশোরী ফুটবলাররা। উজ্জ্বল করেছেন দেশের ভাবমূর্তি। অনেক হতাশার মধ্যেও ফুটবল অনুরাগীরা ভাবতে পারছেন, মেয়েদের পক্ষে সম্ভব বাঙালির ফুটবলের ঐতিহ্যের পতাকাকে ওপরে তুলে ধরা।

মেয়েদের ফুটবলে সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের। কয়েক বছর ধরে ‘প্রাইমারি লেভেলে’ দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধীনে লাখ লাখ বালিকা অংশ নিয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে এশিয়ান ফুটবলে এটা নজিরবিহীন ঘটনা। এখান থেকেই মেয়েদের নিয়ে ফুটবল ফেডারেশন বছরের পর বছর ধরে প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে বিভিন্ন বয়স পর্যায়ে কাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। যাঁরা মেয়েদের নিয়ে প্রথম থেকেই কাজ করেছেন, তাঁরাই থাকায় সব কিছু সুষ্ঠুভাবে চলছে। এই প্রক্রিয়াটা ফুটবল ফেডারেশন অব্যাহত রাখতে পারলে দেশের মেয়েরা ফুটবলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনেক কিছুই করতে পারবেন।

যাঁরা দেশকে ফুটবলের মাধ্যমে তুলে ধরছেন, নিজেদের উজাড় করে খেলছেন, ক্রীড়াঙ্গনে আলো জ্বালাচ্ছেন—তাঁদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক জীবন, সমাজের কোথা থেকে এদের উঠে আসা—এই ছিল প্রতিদিনের এদের সংগ্রামময় জীবন, খেলাকে ভালোবেসে এই চত্বরে ছুটে আসার পেছনে রুগ্ণ হৃদয়কে স্পর্শ করে। আশা করব, এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মহিলা ফুটবলারদের নিয়ে ভাবা হবে।

সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মেয়েদের ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম আসরের শিরোপা জেতায় বাংলাদেশ দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বার্তায় বলেছেন, ‘আমাদের খেলোয়াড়দের খেলা ও দলগত নৈপুণ্য দেখে সারা জাতি গর্ববোধ করছে। বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দলের এই বিজয়ের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন।

কিশোরী ফুটবল দলের প্রতি আমাদের টুপি খোলা অভিনন্দন।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

উৎস: কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন