এরশাদই হোক বাংলাদেশের শেষ স্বৈরাচার

আবদুল মান্নান

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন প্রথমে খন্দকার মোশতাক, তারপর জেনারেল জিয়া। খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হলেও আসল ক্ষমতা রয়ে যায় ঘাতক সেনাসদস্যদের হাতে, যারা আবার জিয়ার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রেখে চলত।

৩ নভেম্বর জেলে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করার পর জিয়া পুরোপুরি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। সাক্ষীগোপাল রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাখা হয় দেশের প্রধান বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে। সেই পাকিস্তান আমল থেকে দেখা গেছে, এক শ্রেণির বিচারপতি সেনাশাসকদের তাঁবেদার ও সাক্ষীগোপাল হতে সব সময় প্রস্তুত থাকেন।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশে যখনই সেনাশাসকরা সিভিলিয়ানদের হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছেন শুরুতেই তাঁরা জাতির উদ্দেশে ভাষণে জনগণের কাছে অঙ্গীকার করেছেন তাঁরা দেশকে রক্ষা করার জন্য সাময়িকভাবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছেন এবং প্রথম সুযোগেই তাঁরা জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাবেন। রাজনীতিতে এই সংস্কৃতি প্রথমে চালু করেন পাকিস্তানের প্রথম সেনাশাসক আইয়ুব খান। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে একই কথা বলে পরবর্তী ১০ বছর দমন-পীড়নের মাধ্যমে পাকিস্তান শাসন করেছেন। ১৯৬৯ সালে পূর্ববাংলার ছাত্র-জনতার তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে সেই বছরের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে স্বীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ইয়াহিয়া খানও একই কথা বলে ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু তিনি তাঁর ক্ষমতা প্রলম্বিত করতে পারেননি; কারণ তত দিনে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আবির্ভাব হয়েছে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ববাংলায় আওয়ামী লীগের ধস নামানো বিজয়ের পর শুরু হয় বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার আরেক খেলা; যার ফলে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। সেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাশাসক জেনারেল জিয়া। তিনিও তাঁর পূর্বসূরিদের মতো ঘোষণা করেছিলেন, সময় হলে তিনি জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাবেন। জিয়া ক্ষমতা দখলের পরবর্তী তিন বছর দেশে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করে দেশ শাসন করেছেন। তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন এবং সেনাবাহিনীর প্রধান থাকাকালে সব আইন-কানুন ভঙ্গ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছেন। মেজর জেনারেল পদে থাকাকালে তিনি অবসরে যান এবং দুই মাস পর পেছনের তারিখ দিয়ে নজিরবিহীনভাবে লে. জেনারেল পদে নিজেকে পদোন্নতি দেন। জিয়াকে হটানোর জন্য সেনাবাহিনীতে  প্রায়  ২০টি সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করা হয় কিন্তু সবই ব্যর্থ হয়। অবশেষে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে জিয়া এক অভ্যুত্থানে নিহত হন। জিয়ার জীবদ্দশায় অভ্যুত্থানের চেষ্টা করার দায়ে প্রায় দুই হাজার সেনাসদস্যকে অনেকটা বিনা বিচারে নির্মমভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর বিচারপতি আবদুস সাত্তার নিয়মিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন ড. কামাল হোসেন। বিচারপতি সাত্তারের নির্বাচনের পর এটি ধারণা করা হয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতি একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসবে। কিন্তু তাতে বাদ সাধল বিচারপতি সাত্তারের দুর্বল ব্যক্তিত্ব ও দল হিসেবে বিএনপির অদূরদর্শিতা, অনভিজ্ঞতা ও সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের ষড়যন্ত্র বোঝার অক্ষমতা। জিয়ার জীবদ্দশায় এরশাদ রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রের মারপ্যাঁচ জিয়ার কাছ থেকে শিখে গিয়েছিলেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো হয়ে ওঠে অশান্ত। বিএনপির অন্তর্দলীয় কোন্দল লাগামহীনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি যুবমন্ত্রী আবুল কাশেমের সরকারি বাসভবন থেকে সাতটি হত্যা মামলার আসামি যুবদলের সদস্য ইমদাদুল হক ইমদুকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ইমদুকে গ্রেপ্তার করার সময় পুলিশকে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মন্ত্রী আবুল কাশেমকে ১২ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয়। এককথায় দেশের শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে দ্রুত বিচারপতি সাত্তারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর সুযোগ নিয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। ২৯ মার্চ এরশাদ বেতার ও টিভিতে দেওয়া এক ভাষণে তাঁর পূর্বসূরিদের অনুসরণ করে ঘোষণা করেন, তিনি যথাসময়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ব্যারাকে ফেরত যাবেন। কিন্তু আইয়ুব, ইয়াহিয়া আর জিয়ার মতো এরশাদেরও আর ব্যারাকে ফেরত যাওয়া হয়নি। কারণ সব দেশে সেনাশাসকদের কাছে ব্যারাকে ফেরত যাওয়ার পরিবর্তে দেশ শাসনের নামে জনগণের ওপর জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসা, ক্ষমতা ভোগ করা অনেক বেশি লাভজনক ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।

এরশাদ ক্ষমতা দখল করার আগে দেশি-বিদেশি পত্র-পত্রিকায় সেনাপ্রধান হিসেবে একাধিক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, দেশের সিভিল প্রশাসনে কোনো না কোনোভাবে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা থাকা উচিত এবং তেমনটি হলে দেশে কোনো ধরনের সেনা অভ্যুত্থ্যানের আশঙ্কা থাকবে না। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক-সামরিক হঠকারিতা জওয়ানদের কাম্য নয় এবং সামরিক বাহিনীতে তাঁরা রাজনৈতিক হঠকারিতা চান না। তাঁরা শুধু জনগণের সঙ্গে থেকে গণতন্ত্র গড়ে তোলায় সাহায্য করতে চান; যেকোনো ভবিষ্যৎ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ ও ভারসাম্য গড়ে তোলায় সাহায্য করতে চান। ’ সেনাবাহিনীপ্রধানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে রাষ্ট্রপতির (তিনি পদাধিকার বলে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক) অনুমতি ব্যতিরেকে এমন একটি বিবৃতি বা গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়া ছিল সম্পূর্ণভাবে অনধিকার চর্চা ও চরম নিয়মবহির্ভূত। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, সে সময় দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও সুধীসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এরশাদের এমন একটি বক্তব্যকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সুপ্রিম কোর্ট বারের ১৫৫ জন আইনজীবী। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বেগম সাজেদা চৌধুরী এক বিবৃতিতে সশস্ত্র বাহিনীকে সব রকম বিতর্ক ও পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সংবিধান বলবৎ থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনীপ্রধানের এজাতীয় মৌলিক সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক বিষয়ে বক্তব্য প্রদান বাঞ্ছনীয় নয় (সৈয়দ আবুল মকসুদ সম্পাদিত গণ-আন্দোলন, ১৯৮২-৯০, মুক্তধারা, ১৯৯১ পৃ. ৩০)।

এ দেশের মানুষ কখনো অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অথবা শাসকদের মেনে নেয়নি। প্রথম সুযোগেই তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এরশাদ ক্ষমতা দখল করে তাঁর পূর্বসুরিদের মতো সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ছাত্রসামজই এরশাদের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষা দিবসকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক সময় রাজনৈতিক সংকটকালে রাজনৈতিক দলগুলো নানা ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর বিভ্রান্তিতে ভুগলেও ছাত্রসমাজ সংকট মোকাবেলায় যথাসময়ে সঠিক কাজটি করেছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সামরিক জান্তার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮৩ সালের ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল বের করে এবং অনেক স্থানে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ফলে বেশ কয়েকজন ছাত্র নিহত হয়। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ঢাকায় সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। ১ এপ্রিল ঘরোয়া রাজনীতি শুরু হলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৫ দলীয় ঐক্যজোট। এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হয় সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল। এর পরপরই বিএনপির নেতৃত্বে সাতদলীয় ঐক্যজোট আত্মপ্রকাশ করে। ১৪ নভেম্বর থেকে প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ দিয়ে ২৭ নভেম্বর এরশাদ নিজের দল জাগদল গঠনের ঘোষণা দেন, যা পরবর্তীকালে জাতীয় পার্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরশাদের পার্টিতে মূলত চীনপন্থী কিছু রাজনৈতিক নেতা আর সামরিক-বেসামরিক আমলা যোগদান করেন। এদিকে  আগে গঠিত দুই জোটেরই প্রধান দাবি এরশাদের পদত্যাগ ও সাধারণ নির্বাচন দিয়ে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া। এরশাদের দল গঠনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই জোটকে মোকাবেলা করা, যা তাঁর পক্ষে মোটেও সহজ ছিল না। এর জন্য তিনি পরবর্তীকালে গঠন করেন জাতীয় ছাত্রসমাজ। দুই জোট ও ছাত্রসমাজের  সম্মিলিত এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর এরশাদ আবার দেশে সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন এবং শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়াকে অন্তরীণ করেন। ১১ ডিসেম্বর এরশাদ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আহসানউদ্দীনকে বঙ্গভবন থেকে বিদায় করে নিজেই রাষ্ট্রপতি বনে যান। যদিও জামায়াতে ইসলামী কোনো জোটের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তারা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এককভাবে এই আন্দোলনে শামিল হয় এবং এই আন্দোলনের অন্যতম বেনিফিশিয়ারি ছিল জামায়াত। ১৯৯০ সালের এক তীব্র  গণ-আন্দোলনের ফলে ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন হলে রেডিও-টিভিতে শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়ার সঙ্গে প্রথমবারের মতো জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির আব্বাস আলী খানেরও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ঘটে। এরশাদের শাসনকালে যে কয়জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁকে সর্বাত্মক সহায়তা করেছেন তাঁদের মধ্যে কাজী জাফর আহমদ, ব্যারিস্টার মওদুদ, শাহ মোয়াজ্জেম অন্যতম।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে বামপন্থী দলগুলো ১৫ দলীয় ঐক্যজোট থেকে বের হয়ে গঠন করে পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট। এই তিন জোট একসময় এরশাদের বিদায় ও পরবর্তী রাজনীতির একটি রূপরেখা ঘোষণা করে, যা তিন জোটের রূপরেখা হিসেবে পরিচিত ছিল। এই রূপরেখার অন্যতম দাবি ছিল, দেশের প্রধান বিচারপতির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে এরশাদের বিদায় এবং একটি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। যার ফলে এরশাদ পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের আবির্ভাব হয়েছিল।

রাজনৈতিক দল ছাড়াও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এই দেশের পেশাজীবী সংগঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিল। সুপ্রিম কোর্টেও আইনজীবী  শামসুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয় পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ। এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন ব্যারিস্টার ইশতিয়াক, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, সারা যাকের, রামেন্দু মজুমদার প্রমুখ। চট্টগ্রামে পেশাজীবীদের নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মান্নান, অধ্যাপক অনুপম সেন, অধ্যাপক আবু ইউসুফ আলম, শিল্পী মুর্তজা বশীর, কলেজ শিক্ষক নেতা রফিকুল আনোয়ার, সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া, আবুল মোমেন, সাংবাদিক হেলালউদ্দিন চৌধুরী, অঞ্জন সেন, অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন বাবুল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ডা. কামাল এ খান প্রমুখ।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এ দেশের অনেক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার মিছিলে পুলিশ গুলি করলে ঘটনাস্থলে ২৩ জন নিহত হয়। বিভিন্ন সময়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রাউফুন বসুনিয়া, জয়নাল, জাফর, দীপালি শাহ, মোজ্জাম্মেল, ডা. মিলনসহ অসংখ্য নাম না জানা ছাত্র-শ্রমিক-সাধারণ মানুষ। তাঁদের নাম এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এরশাদ তাঁর ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে শেষের দিকে এতই বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিলেন যে দেশের সব সংবাদপত্রে কঠোর সেন্সরশিপ আরোপসহ বাংলাদেশে বিবিসির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। ঠিক পতনের আগমুহূর্তে এরশাদ প্রত্যাশা করেছিলেন, সেনাবাহিনী তাঁকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসবে; কিন্তু পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো একজন স্বৈরাচারকে রক্ষা করার জন্য তারা কোনো ভূমিকা রাখতে অস্বীকার করে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে দলমত-নির্বিশেষে দেশের সব মানুষের ঐকবদ্ধ হওয়া এবং লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ঘরে না ফেরা। এ দেশে গণতন্ত্র যখনই বিপন্ন হয়েছে মানুষ তা পুনরুদ্ধারের জন্য সব সময় আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়টি মনে রেখে রাজনীতি চর্চা করলে দেশে একটি সুস্থ রাজনীতির ধারা প্রতিষ্ঠা করা অনেক সহজ হয়ে পড়ে। এরশাদই হোক এ দেশের শেষ স্বৈরাচার। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

সূত্র: কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন