এরদোয়ানের নেতৃত্বে ওআইসি

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

পারস্যের শাসকেরা, মোঘল সম্রাটেরা, মধ্য এশিয়ার ছোট ছোট মুসলিম রাষ্ট্রগুলো ওসমানিয়া খেলাফতের আনুগত্যের বায়াৎ গ্রহণ করতেন। অটোম্যানেরা তখনকার বিশ্বে বিরাট শক্তিশালী মুসলিম সম্রাজ্য। আনুগত্যের এ বায়াৎ পরাধীনতার বায়াৎ ছিল না। কেন্দ্রীয় মুসলিম শক্তি হিসাবে অটোম্যানদের হাতে এ বায়াৎ ছিল ঐক্য ও সংহতির বায়াৎ।

দীর্ঘ ৬০০ বছর তিন মহাদেশের বিরাট ভূখণ্ড জুড়ে অবস্থান ছিল ওসমানিয়া খেলাফতের। ইউরোপের যে কোনও রাজবংশের চেয়ে অটোম্যানদের স্থান ছিল বহু ঊর্ধ্বে। এক টানা ৬০০ বছর দুনিয়ার একটা রাজবংশ একটা সাম্রাজ্যের শাসন করার ইতিহাস বিরল ঘটনা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ওসমানিয়া খেলাফত আর জার্মানি একত্রিত হয়েই মিত্র বাহিনীর মোকাবিলা করেছিলো। তারা মিত্র বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়েছিলো। রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্স ছিল মিত্রজোট। রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স চেয়েছিলো অটোম্যান সাম্রাজ্যকে ভাগ-ভাটোয়ারা করে নিয়ে নিতে। কামাল আতাতুর্ক তখন আনাতোলিয়া ছিলেন। তিনি প্রতিরোধ যুদ্ধ করে বর্তমান তুরস্ককে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। এজন্য তাকে তুর্কি জাতি আতাতুর্ক নামে ডাকে। আতাতুর্ক মানে পিতা।

১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ। কামাল আতাতুর্ক ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত নানা ঝামেলা সামাল দিয়ে তুর্কি জাতিকে বর্তমান অবস্থায় রেখে গেছেন। তুর্কি জাতি এখন কিছু শক্তিশালী অবস্থায় এসে উপস্থিত হয়েছে। তারা ন্যাটো জোটের সদস্য, রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট।

এরদোয়ান এখন বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের সুখ-দুঃখ দেখার চেষ্টা করছেন। এরদোয়ান ওআইসিরও প্রেসিডেন্ট। তিনি গত ১০ ডিসেম্বর ওআইসির মিটিং ডেকেছিলেন। জেরুজালেমকে আমেরিকা ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় যে পরিস্থিতি উদ্ভব হয়েছে সে বিষয়ে তিনি ওআইসির সদস্য দেশসমূহের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ঐক্যবদ্ধভাবে একটা ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করেছেন।

ওআইসি পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে এবং আমেরিকার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন যে তিনি পূর্ব জেরুজালেমে তুরস্কের দূতাবাস খুলবেন। বিষয়টা জটিল হলেও তিনি আমেরিকার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে দূতাবাস খোলার ঘোষণা দিয়ে খুবই বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। তার এ ঘোষণাটা খুবই সাহসী উচ্চারণ।

ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছে যারা তার বিরোধিতা করবে তাদের সাহায্য সহানুভূতি আমেরিকা বন্ধ করে দেবে। ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। আমেরিকা রাষ্ট্রদূত হুমকি দিয়ে বলেছেন তারা জাতিসংঘকে বেশ অর্থ প্রদান করে থাকেন। আর তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি জাতিসংঘ প্রস্তাব গ্রহণ করে তবে তারা তাদের চাঁদা প্রদানের বিষয়টা বিবেচনা করবেন। এর আগে নিরাপত্তা পরিষদে মিশর প্রস্তাব এনেছিলো ‘আমেরিকা প্রস্তাবটা প্রত্যাহার করুক’। পক্ষে চৌদ্দ ভোট পড়েছিলো কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে প্রস্তাবটা পাস হতে পারেনি।

মধ্যপ্রাচ্যে যদি ফিলিস্তিন সমস্যার কোনও সমাধান মুসলিম জগৎ প্রত্যাশা করে তবে তাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনে দুই জাতির জন্য দুই রাষ্ট্রের ১৮১ নং প্রস্তাবে গ্রহণ করেছিলো এবং ১৮১নং প্রস্তাবের আলাকে জেরুজালেম যেহেতু মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের পবিত্র ধর্মস্থান এ কথা বিবেচনা করে এ শহরটাকে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধায়নে রাখার কথা ছিল। এরপর সব ধরনের উদ্যোগ উপেক্ষা করে ১৯৪৮ সালে ডেভিড বেন গোরিয়ন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়ে বসেন। এবং তাৎক্ষণিকভাবে আমেরিকা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে ফেলে। যার কারণে ধীরে সুস্থে জাতিসংঘ তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ১৯৪৮ সালে ডেবিড বেন গোরিয়ন যখন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেন তখন মিশরে ক্ষমতায় ছিলেন বাদশা ফারুক, ইরাকে ক্ষমতায় ছিলেন বাদশা দ্বিতীয় ফয়সাল আর জর্দানে ক্ষমতায় ছিলেন রাজা প্রথম আবদুল্লাহ। দ্বিতীয় ফয়সাল ইরাকের আগে সিরিয়ারও রাজা ছিলেন।

ডেভিড বেন গোরিয়ানের ঘোষণার (১৪ মে ১৯৪৮) একদিন পর ১৫ মে ১৯৪৮ সাল মিশর, ইরাক, জর্দান, সিরিয়া ইসরায়েল আক্রমণ করে। জর্দানের সামরিক বাহিনী যুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম অধিকার করে নেয়। তখন যুদ্ধের গতি এমন ছিল যে জর্দান ইচ্ছা করলে সমগ্র ফিলিস্তিন অধিকার করতে পারতো এবং জাতিসংঘের ১৮১ নং প্রস্তাব বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারতো। পুরনো নথিপত্র এযাবৎ যা প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় জর্দানের বাদশা আবদুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে যুদ্ধ বন্ধ করেছিলেন।

মিশর ওই যুদ্ধে গাজা দখল করে করেছিলো। ঘরের শত্রু বীভিষণের ভূমিকায় আবদুল্লাহ অবতীর্ণ না হলে তখনই ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হতো। বর্তমানে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সিআইএর ছাড় করা নথিপত্রের পুরনো দলিলে আমরা এও দেখেছি যে জর্দানের বাদশাকে সিআইএ দীর্ঘদিন মোটা অংকের মাসহরা দিতেন। মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের এই যদি অবস্থা হয় তবে মুসলিম বিশ্ব দুঃখ দুর্দশা থেকে উঠে আসাতো অসম্ভব হবেই।

১৯৪৮ সালে মুসলিম রাষ্ট্র সমূহের সম্মিলিত আক্রমণ থেকে শিক্ষা নিয়ে গত ৭০ বছর ধরে ইসরায়েল এবং আমেরিকা চেষ্টা করেছে ইসরায়েলের পাশ্ববর্তী শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র সমূহকে বিধ্বস্ত করে দিতে।

‘আরব বসন্ত’ হিলারি ক্লিন্টনের কূটবুদ্ধির সন্তান। যা আরবের দেশগুলোকে বিনাশ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েল এবং আমেরিকা দুরভিসন্ধির শিকার হয়েছে বার বার। এখন লিবিয়া, ইরাক এবং সিরিয়া গত ৬ বছরের গৃহযুদ্ধে সব শক্তি সামর্থ্য হারিয়েছে যা পুনর্গঠন করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেতে বেশ সময়ের প্রয়োজন হবে।

ফিলিস্তিনবাসীকে মনে রাখতে হবে রোমান ইতিহাসবিদ ক্যাসিয়াস ডাইওর বর্ণনা অনুসারে ইহুদি নেতা বার কোখরার বিদ্রোহে ৫ লক্ষ ৮০ হাজার ইহুদীকে রোমান বাহিনী ফিলিস্তিনে হত্যা করেছিলো। যে কারণে ইহুদিরা ১৩৫ সালের এ বিপর্যয়ের পর প্যালেস্টাইন ছেড়ে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিলো। ১৮১৩ বছর পর এ ইহুদিরাই ১৯৪৮ সালে ১৪মে ফিলিস্তিনে তাদের রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্মের কথা ঘোষণা করে।

নৃতাত্ত্বিক গবেষণা এবং আধুনিক ডিএনএ স্টেটে প্রমাণিত হয়েছে যে প্যালেস্টাইনরা আরবের চেয়ে ইহুদিদের রক্তের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বেশি। ফিলিস্তিনিরা আদি কানানীয়। তাদের ভাষাও ছিল হিব্রু। ১৩৫ সালে ইহুদিদের দেশ ত্যাগ এবং আরবীয় অভিযানে ফিলিস্তিন আরবের দখলে চলে যাওয়া ধর্ম, ভাষা, সাহিত্যে সংস্কৃতি পরিবর্তন হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা কিন্তু কেনানের ভূমিপুত্র। হযরত ইব্রাহীম (আ.) যখন ইরাক অঞ্চল ত্যাগ করে আল্লাহর হুকুমে হিযরত করে কেনানে এসেছিলেন তখনও এ অঞ্চলে ফিলিস্তিনিরাই ছিল–আদিবাসী।

সীনাই থেকে জর্দান আর লেবনান থেকে সিরিয়া পর্যন্ত ভূমিটাকে তখন কেনান বলা হতো। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার পর ইহুদিরা যখন ফিলিস্তিনের গ্রাম অঞ্চলে উচ্চমূল্যে ভূমি ক্রয় করে বসতি স্থাপন করেছিলো তখন কিন্তু ফিলিস্তিনিরা বেশি দামের আশায় ভূমি বিক্রি করেছে তার পরিণতির কথা চিন্তা করেনি। বিশ্ব জয়ইনবাদী আন্দোলনই বসতি স্থাপন, জমি ক্রয় এবং আর্থিক যোগদান অস্ত্র-সস্ত্র ক্রয় করা প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা সব কিছুই সংগোপনে করেছিলেন। তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করেছিলেন। এখন বিশ্বে ইহুদি সংখ্যা এক কোটি চল্লিশ লক্ষ সবাই ফিলিস্তিনে আসেনি অথচ ফিলিস্তিনে ফিলিস্তিনি মুসলমান অনেক বেশি। তারা আছে ফিলিস্তিনে এবং আশেপাশের রাষ্ট্রগুলোতে।

পরিকল্পিতভাবে যদি ফিলিস্তিনিরা সংগ্রাম করতে না পারে তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্থাপন কঠিন হবে। এরদোয়ান ওআইসির সভাপতি হিসেবে যখন ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করার উদ্যোগ নিয়েছেন তবে জৈনবাদীদের মতো আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্তও নেয়া উচিত। ওআইসির সম্মিলিত প্রচেষ্টা না থাকলে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। প্রয়োজনে অস্ত্র সরবরাহ করতে হবে। ১৯৪৮ সালের পূর্বে বিশ্ব জৈনবাদী আন্দোলন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সবকিছু দিয়ে সাহায্য করেছিলো। ইহুদিরা তখন ব্রিটিশ মন্ত্রী লড ময়নীকে হত্যা করতেও দ্বিধা করেনি। জেরুজালেমে তারা জাতিসংঘের বিশেষ দূত কাউন্ট বার্নাডোটকে হত্যা করেছিলো। ১৯৪৮ সালে আরব ইসরায়েল যুদ্ধের প্রাক্কালে ইহুদিরা ৭ লক্ষ ফিলিস্তিনকে নির্বিচারে হত্যা করেছিলো। অথচ মিসর, জর্দান, ইরাক, সিরিয়া যখন যুদ্ধ আরম্ভ করেছিলো তখন তারা যুদ্ধ ভিন্ন কোনও ইহুদি বসতিতে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে আমেরিকা এবং ইসরায়েল টার্গেট করেছে তাতে সৌদি আবরও সামিল হয়েছে। ইরানকে ইরাক, লিবিয়া আর সিরিয়ার মতো বিধ্বস্ত করতে সক্ষম হলে শেষ টার্গেট হবে তুরস্ক। মিশরে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জেনারেল সিসিকে প্রেসিডেন্ট করেছে। জেনারেল সিসির হচ্ছে আমেরিকা ইসরায়েলের পুতুল সরকার। ওআইসির উচিত ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা, মরো এবং কাশ্মীরের মুসলমান সম্পর্কে সোচ্চার হওয়া। কোনও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় এ অজুহাতে মুসলমান হত্যাকে উপেক্ষা করলে ওআইসির যথাযথ ভূমিকা পালন করা হবে না। এরদোয়ান এ ব্যাপারে সক্রিয় হোক মুসলিম বিশ্ব তা কামনা করে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন