এক্স-রে রুমে নারীর নিরাপত্তা

ঊর্মিলা চত্রবর্তী

দেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্স-রে একটি বহুল ব্যবহূত রোগ নির্ণয় পদ্ধতি। ১৮৯৫ সালে জার্মান অধ্যাপক উইলহেম রন্টজেন কর্তৃক এক্স-রে বা রঞ্জনরশ্মি আবিষ্কারের পর মেডিক্যাল ইমেজিং-এ রেডিওগ্রাফির প্রচলন শুরু হয়। চিকিত্সা বিজ্ঞানে এক্স-রের গুরুত্ব অপরিসীম। দেহের যেকোনো স্থানে হাড়ের সমস্যা, পাকস্থলী, যকৃত, অন্ত্র এবং প্লীহার জটিল সমস্যা সহ অজ্ঞাত কারণে দেহের কোথাও বিশেষ ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাবের কারণ উদ্ঘাটনের জন্য এক্স-রে বর্তমানে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এছাড়া কিডনি, জরায়ু এবং মূত্রথলির সমস্যা চিহ্নিত করার জন্যও এক্স-রের প্রয়োজন হয়।

প্রতিবার এবডোমিনাল এক্স-রের ক্ষেত্রে প্রায় ৬-৮ এমএসভি (millisievert)  এবং স্পাইনাল এক্স-রের ক্ষেত্রে ১.৫ এমএসভি রেডিয়েশন দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। যেহেতু অতি উচ্চশক্তি সম্পন্ন রেডিয়েশন দেহের ভেতরে প্রবেশ করে তাই একবারেই রোগীকে সঠিক পজিশনে দাঁড় করিয়ে বা শুইয়ে ছবিটি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে এক্সরে কক্ষে কিছু বিশেষ নিয়ম পালন করতে হয়। যেমন: জুয়েলারি, দাঁতে প্রয়োগকৃত ধাতব পদার্থ, চশমা, যেকোনো ধাতব বস্তু যেমন মাদুলি বা তাবিজ ইত্যাদি খুলে রাখতে বলা হয়। যে সকল বস্ত্র সরাসরি এক্স-রে ইমেজিং-এ বাধাদায়ক, যেমন— ধাতব চেইন বা লকসহ পোশাক বা অন্তর্বাসের পরিবর্তে এক্স-রে সেন্টার কর্তৃক সরবরাহকৃত বিশেষ গাউন পরিধান করতে বলা হয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই কাজগুলো কোনো মহিলা অপারেটর দ্বারা করাটাই স্বাভাবিক হলেও আমাদের দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোতে রোগীর পজিশন ঠিক করানোর কাজটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষ অপারেটর দ্বারাই করা হয়ে থাকে। তাতেও কোনো অসুবিধা হতো না যদি তারা মহিলা রোগীদের সঙ্গে যথাযথ ভদ্র বা শালীন আচরণ করা হতো। তাদের কেউ কেউ অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই মহিলা রোগীদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অনাবৃত করে এক্সরে করতে বাধ্য করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীদের এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় তারা অপারেটরের কথামতো কাজ করতে একরকম বাধ্য হয়। তাদের এই বিব্রতকর অবস্থা কারো কাছে প্রকাশ করতেও দ্বিধা বোধ করে। আর এভাবেই অসত্ চরিত্রের অপারেটররা নিরাপদে একই অপরাধ বারবার সংঘটিত করতে ভয় পায় না।

শুধু তরুণী বা মধ্যবয়স্ক নারীরাই নয় বৃদ্ধ বা বয়স্ক মহিলারাও এক্সরে রুমে বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছেন। অপারেটর তাদের পজিশন ঠিক করানোর নামে তাদের সঙ্গে যথেচ্ছ ব্যবহার করে থাকে আর সামাজিক সম্ভ্রমের কথা চিন্তা করে প্রায় সবক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী নারীরা বিষয়টি বাইরে অপেক্ষমাণ আত্মীয়ের কাছে গোপন রাখে। সামান্য হাঁটুর এক্সরে করতে অপারেটর যখন দৈহিক আবরণ সরাতে হবে বলে তখন একজন মহিলার জন্য সেটা অত্যন্ত মানহানিকর। আমাদের দেশের অধিকাংশ মহিলাই স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত হওয়ায় তারা এটাকেই নিয়ম বলে বিশ্বাস করে থাকে। এছাড়া এবডোমিনাল এক্সরে করার সময় রোগীকে সঠিক পজিশনে শোয়ার মৌখিক নির্দেশনা না দিয়ে অপারেটর অনেকক্ষেত্রে এক্সরে টেবিলে পজিশন ঠিক করার সময় রোগীকে আপত্তিজনকভাবে স্পর্শ করে থাকে। এগুলো কোনোটাই এক্সরে প্রসিডিউরের মধ্যে পড়ে না। আমি এখানে কমপক্ষে দু’টি কেস স্টাডি তুলে ধরতে পারতাম, কিন্তু তার প্রয়োজন নেই। কারণ এ ধরনের বেশকিছু গুরুতর অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আর লোকলজ্জার কারণে অপ্রকাশিত উদাহরণও যে একেবারে কম নয় তাও বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমি বেশ কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করি এবং তারা বলেন, প্রথমত পোশাক এক্সরে ফিল্মে ধরাই পড়ে না যদি না তাতে ধাতব অংশ থাকে, আর দ্বিতীয়ত রোগীকে সঠিক নির্দেশনা দিলে তিনি নিজে নিজে পজিশন নিতে পারেন, তার জন্য রোগীকে স্পর্শ করার প্রয়োজন পড়ে না। বহির্বিশ্বে এবং আমাদের দেশে উন্নত ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোতে এই কাজের জন্য প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মহিলা অপারেটর নিয়োগ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগের এই যুগে এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা শিক্ষিত মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য। নারী অধিকার সমুন্নত রাখতে এক্সরে অপারেটরদের এ ধরনের স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। অধিকাংশ ভুক্তভোগী মহিলা নিজেদের লজ্জা বা সংকোচের কারণে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করলেও নারীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী অপারেটরের ব্যবস্থা রাখা উচিত। এই ব্যাপারে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সচেতনতা ও সুদৃষ্টি প্রয়োজন। এর পাশাপাশি আমাদের নারীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকা উচিত। এক্সরে রুমে অপারেটর নয়, আপনি নিজেই নিজের দায়িত্ব নিবেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনে সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিবাদ জানাতে ভীত হবেন না— এটাই হবে নারী অধিকার দাবির একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা।

লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) কর্মকর্তা।

urmila010285@gmail.com

উৎস : ইত্তেফাক

শেয়ার করুন