আলুকে আরো আলোকিত করা প্রয়োজন

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

আলু একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিনে দিনে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এটি। বাংলাদেশে আলুর রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। তাই আলু দিয়ে কী হয় তা না খুঁজে বরং আলু দিয়ে কী হয় না সেটা বের করা সহজ হবে। আলুর পুষ্টিগুণ এবং এর উত্পাদনশীলতার কারণে এটি বিশ্বের অনেক দেশের প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এখন আলু উত্পাদনের দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে থাকায় এখানেও একটি প্রধান খাদ্য ভাতের সঙ্গে অথবা ভাতের বিকল্প হিসেবে চালানোর কথা উঠেছে।

বাংলাদেশের জলবায়ু ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য খুবই উপযোগী। সত্তর ও আশির দশকের দিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে শুধু দেশি জাতের অল্প পরিসরে আলু চাষ করা হতো। সেচের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির পর আশির দশক থেকে আমাদের দেশে দেশি জাতের আলু আবাদের পাশাপাশি বিদেশি উচ্চ ফলনশীল জাতের আলুর আবাদ বাড়তে থাকে। সে সময় হল্যান্ড থেকে কাঠের বাক্সে করে আসতো এক বিশেষ ধরনের বীজ আলু যার ফলন দেশি আলু থেকে অনেক বেশি হতো। সেখান থেকেই আস্তে আস্তে বাংলাদেশে রবি মৌসুমে আলুর আবাদ ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে। দেশের অভ্যন্তরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট আলু নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু করে। আবিষ্কার করা হয় বাংলাদেশের আবহাওয়ায় খাপ খাইয়ে চাষোপযোগী উচ্চফলনশীল জাত।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক এ ফসলটির। সারাদেশেই আবাদ বাড়তে থাকে এ গোল আলুর। সেই আলুকে সারাবছর সংরক্ষণ করার জন্য এবং এক বছরের আলুকে পরের বছর বীজ আলু হিসেবে ব্যবহারের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপন করা হয় অনেক হিমাগার। আলু আবাদ ও সংরক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত চাষি সৃষ্টি করা হয়। এভাবে এগোতে এগোতে আলু এখন দেশের অন্যতম ফসলের মর্যাদা লাভ করেছে। এখন দেশে প্রায় এক কোটি টন আলু উত্পাদিত হয়। এত বিপুল পরিমাণ আলু আমাদের নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে আরো অনেক বেঁচে যায়। কিন্তু বিদেশে রপ্তানি করার প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেদিকে তেমন এগোনো যাচ্ছে না।

আলুর বহুমুখী ব্যবহার থাকলেও উদ্যানতাত্ত্বিক ভাষায় এটিকে সবজি বলা হয় না। অথচ আলু সব ধরনের মাছ, মাংসে, ডিম ইত্যাদিতে সবজি হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। আলুর দম, আলুর চপ, আলুর পরোটা, আলুর চিপস, সিঙ্গারা, আলুর পুরি ইত্যাদি আমাদের দেশের প্রত্যেকটি মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। আলুর পুষ্টিগুণ এমন যে সেটি ভাতের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। বাংলাদেশে এখন যদিও প্রধান খাদ্যদ্রব্য হিসেবে চালের অভাব নেই। কিন্তু ভাতের পাশাপাশি একই খাদ্যমানে সমৃদ্ধ আলু খাওয়ার অভ্যাস করতে পারলে আমাদের চাল ও আটার উপর চাপ অনেকাংশে কমে যেতো।

আলু চাষে আবার সুদিন ফেরাতে কিংবা আলুকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এখনই এ খাতে নজর দেওয়া জরুরি। আলু রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন নতুন দেশ খুঁজতে হবে রপ্তানি করার জন্য। এটিকে একটি কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে একটি শিল্প-বাণিজ্য পণ্যের মর্যাদায় রপ্তানি করতে পারলে যদি বেশি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় তবে তাই করতে হবে। বিভিন্ন সময়ে আলুকে ভাতের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হলেও এ ব্যাপারে তেমন সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ কখনো চোখে পড়েনি। তবে আগে যাই হোক না হোক এখন সময় এসেছে সেই উদ্যোগ নতুনভাবে শুরু করে তাকে আরো সামনে এগিয়ে নেওয়ার দিকে নজর দেওয়ার। তাহলে আলুর উত্পাদন যথাযথ হবে। লাভবান হবে কৃষক। কৃষি অর্থনীতিতে দেশ এগিয়ে যাবে। আর এর জন্য শুধু সরকারি পর্যায় থেকে উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। এগিয়ে আসতে হবে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরকেও। তাহলেই আলুকে আরো বেশি বেশি আলোকিত করা সম্ভব হবে।

লেখক:কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
email: kbdhumayun08@gmail.com

উৎস: ইত্তেফাক

শেয়ার করুন