আর্সেনিক থেকে রক্ষায় উদ্যোগ জরুরি

আর কে চৌধুরী

বাংলাদেশের ১২ শতাংশ মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। আর্সেনিক দূষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভয়াবহ বিপদসংকুল অবস্থায় রয়েছে। সমস্যার সমাধানে সরকার যদি তৎপর না হয়, তবে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হবে আর্সেনিকসংক্রান্ত রোগে।

২০১২ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে জেলাভিত্তিক তালিকা দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, আর্সেনিকজনিত কারণে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ৭১৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর মতে, দেশে বর্তমানে ১২ শতাংশ মানুষ আর্সেনিক দূষণজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থা মোকাবিলায় ঝুঁকি নিরসনে ১ হাজার ৯৬৬ কোটি ৭৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে আর্সেনিক ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে নেওয়া হয়েছে এ উদ্যোগ। তাই যত দ্রুত সম্ভব এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।

পানিবাহিত হওয়ায় বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি এলাকার পানিতেই কিছু না কিছু আর্সেনিক রয়েছে। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পানীয় জলে মানবদেহের জন্য সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রতি লিটার পানিতে ০.০৫ পিপিবি (পার্টস পার বিলিয়ন) বা ০.০৫ মিলিগ্রাম। অথচ বাংলাদেশে পানীয় জল হিসেবে যা ব্যবহৃত হয়, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে পাঁচগুণ বেশি আর্সেনিক রয়েছে। স্বভাবতই এটি ভয় এবং উদ্বেগের কারণ।

মানব সমাজের জন্য বেদনাদায়ক ও দুঃসংবাদ হচ্ছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি, যা দিয়ে আর্সেনিক বিষাক্রান্ত থেকে সম্পূর্ণ নিরাময় লাভ করা যেতে পারে। তবে বিষাক্রান্তের প্রাথমিক পর্যায়ে যদি রোগী দূষিত পানি পান বন্ধ করে নিরাপদ পানি পান শুরু করে, তাহলেই পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা আশা করা যায়। সরকারি উদ্যোগে মিটিগেশন ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পের মাধ্যমে আর্সেনিক প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল সত্য, কিন্তু প্রকল্প বেশিদূর এগোয়নি। অথচ আর্সেনিকজনিত স্বাস্থ্য সমস্যাকে সমাধান করতে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাটা জরুরি।

নব্বই দশকে আর্সেনিক ইস্যু যে মাত্রায় গুরুত্ব পেয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে তা কমে এসেছে। এ নিয়ে এখন বড় কোনো প্রকল্প বা কর্মসূচিই নেই। এমনকি আর্সেনিকের কারণে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কত মানুষ মারা গেছে, সে হিসাবও হয়তো নেই। কিন্তু জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ এ ক্ষেত্রকে কিছুতেই অবহেলা করা যাবে না। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সামর্থ্যগত সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখেই বলতে চাই, ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানি ব্যবহারে বিশেষজ্ঞ পরামর্শকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। পাশাপাশি আর্সেনিক নীতিমালা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। আর্সেনিকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা না গেলে এ ভয়াবহতা থেকে উত্তরণ সত্যিই কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগই পারে শতভাগ আর্সেনিকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে।

স্মর্তব্য, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর ২০০৩ সালে সারা দেশের ২৭১ উপজেলায় ৫০ লাখ নলকূপের আর্সেনিক পরীক্ষা করে, যার মধ্যে ২৯ ভাগ নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত অর্থাৎ ৫০ পিপিবির উপরে আর্সেনিক পাওয়া যায়। বাংলাদেশে নিরাপদ পানির উৎস হলো গভীর ও অগভীর নলকূপ। কিন্তু এ পানিও সবসময় নিরাপদ থাকে না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাটির গুণাগুণ ভিন্ন থাকায় এবং অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার হওয়ায় মাটির নিচেও অক্সিজেন প্রবেশ করছে। পানিবাহী শিলাস্তরের আর্সেনিক তরল অবস্থায় ভূগর্ভস্থ পানিকে আর্সেনিকযুক্ত করছে। আর্সেনিক হুমকি থেকে রক্ষা পেতে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধে উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক:মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ

উৎস: আলোকিত বাংলাদেশ

শেয়ার করুন