বাল্যবিবাহ ও আমাদের বিবর্তনশীল গ্রামীণ সমাজ

মোফাজ্জল করিম :: 

পুতুলের বিয়ে দিতে দিতে একদিন পুতুলের মতো ছোট্ট মেয়েটি নিজেই বিয়ের পিঁড়িতে বসল। কয়েক দশক আগেও এই ছিল গ্রামবাংলার সাধারণ চিত্র।

কবি জসীমউদ্দীনের কবর কবিতার দাদুর জবানীতে পাই : এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ/পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক। বয়স ১০ কি ১২ হতে না হতেই মেয়েদের বৌ সাজতে হতো। ওই বয়সে স্বামী কী, সংসার কী—এসব বোঝার কোনো ক্ষমতাই ছিল না মেয়েদের। তারপর ক’দিন আগে যে মেয়ে নিজেই ছিল মায়ের কোলে, সেই মেয়ের কোলজুড়ে শিগগিরই এসে যায় সন্তান। আর শিশু বয়সে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে প্রসূতির মৃত্যু, নবজাতকের মৃত্যু—এসব ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

এ তো গেল এক দিক। আরেক দিকে ওই কন্যাশিশুটির জীবনের সব সম্ভাবনা, সব আশা-আকাঙ্ক্ষারও পরিসমাপ্তি ঘটত এভাবে। কোনো পরিবারে একটি কন্যাশিশুর জন্ম হলেই মা-বাবা ও পরিবার-পরিজনের মনে দেখা দিত দুশ্চিন্তার কালো মেঘ : এর জন্য একটি সুপাত্র পাব তো? শিশুটিকে লালন-পালন করার একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল যেন তাকে একদিন বৌ সাজিয়ে অন্যের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া। সেও যে লেখাপড়া শিখে একদিন পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সাহায্য করতে পারে মা-বাবাকে, এই সেদিনও গ্রামাঞ্চলে এসব ছিল আকাশকুসুম কল্পনা।

মেয়ে মানে ছিল : মায়ের কোল থেকে নেমে পুতুল খেলা, ধুলো-বালির রান্নাবান্না শেখা, ছোট ভাই-বোনদের কোলে-কাঁখে করা, সন্ধ্যা নামলে পুকুরপাড়ে গিয়ে ‘আয় আয় তই তই’ সুরে হাঁসগুলোকে ডেকে নিয়ে আসা। লেখাপড়া বলতে ছিল, রোজ সকালে আমপারা হাতে মক্তবে গিয়ে গ্রামের আট-দশটা শিশুর সঙ্গে সুর মিলিয়ে আরবী পড়া। তারপর একদিন ১০-১২ বছরের শিশুটি মায়ের কোল ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে যাবে সম্পূর্ণ এক নতুন জগতে। সেখানে স্বামী নামক এক অচেনা মানুষের সঙ্গে সংসার নামক এক বিভীষিকাময় জীবন। গ্রামবাংলার মেয়েদের জীবন ছিল মোটামুটি এই ছকে বাঁধা। এর পরিণতিতে মেয়েটির বা তার সন্তানের অকালমৃত্যু, স্বাস্থ্যহানি, পারিবারিক অশান্তি—এগুলোই ছিল তার বিধিলিপি।

দুই.

এখন অবশ্য দৃশ্যপট পাল্টেছে। এখন আর গ্রামের ছোট মেয়েদের ঘরে বসে পুতুল খেলতে হয় না—আসলে পুতুল খেলা এখন উধাও হয়েছে শিশুদের জীবন থেকে—এখন তারা দল বেঁধে স্কুলে যায়, সেখানে খেলাধুলা করে, হৈচৈ করে। বাড়িতে মায়ের সংসারের কাজে সাহায্য করার পাশাপাশি স্কুলের পড়া তৈয়ার করে, জিপিএ-৫ পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। অনেকে পায়ও। এখন গ্রামের রাস্তায় রোজ সকালে যে দৃশ্যটি আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করে তা হচ্ছে, একদল কন্যাশিশুর ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য। যেন একপাল রাজহংসী গর্বিত গ্রীবা উঁচু করে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রামের রাস্তা দিয়ে। এটি এখন কোনো একটি বা দু’টি গ্রামের দৃশ্য নয়, এটি এখন বাংলাদেশের সব গ্রামের সকালবেলার একটি পরিচিত দৃশ্য। এভাবে এখন বেড়ে উঠছে আমাদের গ্রামের মেয়েরা। এভাবে বড় হচ্ছে তাদের ঘিরে আমাদের স্বপ্ন।

মেয়েদের এই চলার পথটি যে একেবারে নিষ্কণ্টক নয়, তা আমরা জানি। পত্র-পত্রিকায় চোখ বুলালেই দেখতে পাই—অমুক স্কুলের অমুক মেয়েটিকে কোনো প্রতাপশালী ব্যক্তির বখাটে ছেলে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত রাস্তাঘাটে। ছেলেটির মা-বাবা, ময়-মুরব্বিদের কাছে নালিশ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি, উল্টো মেয়েটিকে ও তার পরিবারকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে। গ্রাম্য সালিশ বসেছে। সালিশের রায় গেছে মেয়েটির বিপক্ষে। কারণ সে গরীবের মেয়ে। সমাজ তার পাশে দাঁড়াতে ভয় পায়। তারপর একদিন সেই কোমলমতি বালিকাটি অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আবার ক্বচিৎ কখনো সাহসিকাদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও শোনা যায় : মেয়েরা দল বেঁধে বখাটে ছোকরাকে পিটুনি দিয়েছে। কিন্তু এমন ঘটনা হাজারে একটা।

তবে আজকাল যে বিষয়টি সবাইকে নাড়া দেয় তা হচ্ছে, মেয়েদের দল বেঁধে সতীর্থের বাল্যবিবাহ ঠেকানো। গ্রামের মেয়েরা এখন প্রমাণ দিচ্ছে, তারা আর অবলা নয়। তারাও প্রতিবাদ করতে জানে, প্রতিরোধ গড়তে জানে। পুতুলখেলার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে বইয়ের জগৎ, জ্ঞানের জগতে পা দিয়ে তারা তাদের অধিকারের কথা, অপার সম্ভাবনার কথা জানতে পেরেছে। তাদের আশপাশের যেসব মেয়েরা লেখাপড়া করে বড় বড় চাকরি-বাকরি করছে, ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে করছে দুঃসাহসিকতাপূর্ণ কাজ, তাদের দৃষ্টান্ত অনুপ্রাণিত করছে তাদের। তারা দেখতে পারছে, ওই সব সফলকাম মেয়ের অনেকেই তাদের মত গরীব পরিবারের সন্তান। অতএব, ‘ওরা পারলে আমিও পারব না কেন?’ এই চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে এগিয়ে আসছে গ্রামের অনগ্রসর পরিবারের মেয়েরা। জয় হোক তাদের।

জয় অবশ্যই একদিন হবেও তাদের। তবে তাদের পথে বড় বাধা হচ্ছে সমাজপতিরা, সালিশের মালিকেরা। তারা সবাই সমাজের উঁচু স্তরের বাসিন্দা। গ্রামীণ জীবনে একজন চেয়ারম্যান সাহেব, মেম্বার সাহেব, জোতদার কিংবা ব্যবসায়ী সাহেব বিচার-সালিশে বসে সব সময় বাদী-বিবাদীর সামাজিক অবস্থান দেখেন। তাদের চোখে অলিমদ্দি-সলিমদ্দির ছেলে বা মেয়ে যে স্কুলে যায় এটাই তো অনেক বড় ব্যাপার। তাদের মেয়েকে অমুক মালদারের ব্যাটা দু’টো কথা বলেছে তো কী হয়েছে? না হয় একটা কুপ্রস্তাবই দিয়েছে, তাতে এত নালিশের কী আছে। এর চেয়ে বেশি কিছু হলে হাজারখানেক টাকা ওই ব্যাটা অলিমদ্দির হাতে গুঁজে দাও, তা হলেই তো হলো। যা, বাড়ি যা। অলিমদ্দি সহায়-সম্বলহীন গরীব মানুষ, এই তার অপরাধ। মালদারের ছেলের কোনো দোষ নেই, যত দোষ ওই গরীব অলিমদ্দি ও তার মেয়ের। ‘গরীবের মেয়ের অত ন্যাকা-পড়া করারই দরকার কী যে রাস্তাঘাটে রূপের লণ্ঠন জ্বালাইয়া স্কুলে যাইত অইব। একটা বিয়া-শাদী দিয়া দিলেই তো ল্যাঠা চুইকা যায়। এই বিবাদী ছেলেটাই বা পাত্র হিসাবে খারাপ কী?…এরপর মেয়েটির স্বপ্নের চারাগাছটি আর কী করে বেঁচে থাকে বলুন।

তিন.

মেয়েদের বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে হলে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, গ্রামে থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাচারি হাতের নাগালের মধ্যে নয়। সেখানে শতকরা আটানব্বই ভাগ মানুষের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হচ্ছেন শতকরা দুই ভাগ বিত্তশালী, প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। এসব ব্যক্তির কারো দাপট বিত্তের, কারো সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিপত্তির। গ্রামে কোনো ঘটনা ঘটলে প্রথমেই দ্বারস্থ হতে হয় ওই সব প্রভাবশালীদের। এদের কেউ কেউ আবার রাষ্ট্রপ্রদত্ত ক্ষমতার মালিক। যেমন ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার। বাকিরা সমাজস্বীকৃত মোড়ল, যে মোড়লি পেয়েছেন টাকার জোরে, লাঠির জোরে বা রাজনীতির জোরে। সব ক্ষেত্রেই এরা গ্রামের অবস্থাপন্ন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃত। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের সব বিষয়ে যাওয়ার জায়গা ওই একটাই : চেয়ারম্যান-মেম্বার-মাতব্বর-জোতদার এবং রাজনৈতিক নেতা সাহেব। এই সমাজব্যবস্থা থেকে গ্রামের মানুষের বেরিয়ে আসার উপায় নেই। এটা চলছে আবহমানকাল ধরে। এটাই স্বাভাবিক মনে করা হয়।

এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), যা দেশের সর্বনিম্ন পর্যায়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। এটি গঠিত হয় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে। এই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানটিকে খাতায়-কলমে অনেক দায়িত্ব দেওয়া আছে। এর প্রায় সবই এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ, যা সম্পাদিত হয় কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে। ফলে অর্থ বরাদ্দ নেই, তো ইউনিয়ন পরিষদের কাজও নেই। সরকারি টাকায় অবকাঠামো নির্মাণের কাজের ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদের যে পরিমাণ উৎসাহ-আগ্রহ দেখা যায়, অন্য ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব না থাকায় শিক্ষা-স্বাস্থ্য-আইনশৃঙ্খলা-কর আদায় ইত্যাদি বিষয় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকে। অথচ এসব বিষয়ের কোনোটাই জনজীবনে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বাল্যবিবাহ, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ১৮ বছর বয়সপূর্তির আগেই বিয়ে, একটি জাতীয় অভিশাপ। এটি রোধ করার জন্য আইন আছে, কিন্তু তা প্রয়োগ করার জন্য কেবলমাত্র একজন উদ্যমী ইউএনও বা একদল সহমর্মী সতীর্থের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে ঈপ্সিত ফল লাভ করা যাবে না। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে অহরহ সংঘটিত হচ্ছে বা সংঘটনের তোড়জোড় চলছে হাজার হাজার বাল্যবিবাহের। এর সব ক’টি ইউএনও, ওসি বা স্কুলের সহপড়ুয়াদের নজরে আসে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গরীব মা-বাবা মেয়ের বয়স লুকিয়ে তাদের পছন্দের ‘সুপাত্রের’ সঙ্গে বিয়ের আয়োজন করেন। এসব ক্ষেত্রে গ্রামের তথাকথিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বাধা প্রদান তো দূরের কথা, বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের আনুকূল্য থাকে। কখনো কখনো মেয়ের বাপকে আইনের ভয়-ভীতি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার কথাও শোনা যায়।

এই পরিস্থিতিতে বাল্যবিবাহ রোধে নজরদারির বিষয়টি চলে আসে। দারিদ্র্যের কারণে বা পারিপার্শ্বিক নানাবিধ চাপে পড়ে অভিভাবকরা প্রচলিত আইন ভঙ্গ করে একটি নাবালিকা কন্যাকে অনেক সময় বিয়ে দিতে বাধ্য হন। এরূপ বিয়ে হয় যথাসাধ্য লুকিয়ে-চুরিয়ে। কিন্তু গ্রামের সঙ্ঘবদ্ধ সমাজে কোনো না কোনোভাবে এ কান সে কান হয়ে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। তখন স্থানীয় সমাজপতি, বিশেষ করে জনপ্রতিনিধি মেম্বার-চেয়ারম্যানদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা তাদের দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক।

এক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ বন্ধের ব্যাপারে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদকে আরও সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। কোনো ইউনিয়নে বাল্যবিবাহের কোনো ঘটনা ঘটলে তার জন্য কেবল সংশ্লিষ্ট অভিভাবক ও ম্যারেজ রেজিস্ট্রারই (কাজী সাহেব) দায়ী থাকবেন না, ওই এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বারদেরও জবাবদিহি করতে হবে।

বাল্যবিবাহ যে পুরো জাতির জন্য একটি অভিশাপ, যেমন অভিশাপ নিরক্ষরতা, তা গ্রামের মানুষকে সরকারি প্রশাসনের লোক (যেমন ডিসি-এসপি-ইউএনও-ওসি) কিংবা ঢাকায় বসবাসকারী এমপি সাহেব যত সহজে বোঝাতে পারবেন, তার চেয়ে বেশি সহজে বোঝাতে পারবেন গ্রামবাসীর প্রতিবেশী ও তাদের সুখ-দুঃখের সাথী ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। কাজেই প্রতিটি ইউনিয়ন তথা ওয়ার্ডে যদি এসব সামাজিক ব্যাধি নিয়ে নিয়মিত আলাপ-আলোচনা করা যায়, তা হলে গ্রামের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষের কাছে বার্তাটি পৌঁছে যাবে। সেসব আলোচনায় এলাকার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও অংশগ্রহণ করে তাদের মতামত তুলে ধরবে। এসব শিক্ষার্থী তাদের ক্লাবে বা অন্য সংগঠনে মাঝে মাঝেই এ ধরনের আলোচনা সভার আয়োজন করে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে, তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

এখানে একটা জরুরি বিষয়ে আলোকপাত না করলে আলোচনা একপেশে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। যেসব হতদরিদ্র অভিভাবক অভাবের তাড়নায় মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন, তাদের কাছে তো মেয়েটিকে একটি বোঝা মনে হয় সংসারে। তারা যত তাড়াতাড়ি পারেন, এই বোঝা সংসারের ঘাড় থেকে নামাতে পারলে বাঁচেন। তাঁরা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় মেয়েটিকে স্কুলে পাঠাতে পারেন না আর্থিক অক্ষমতার কারণে। এদের জন্য কী করা যায়? বিয়ে না দিয়ে স্কুলে পাঠালে সরকার থেকে মেয়েটি যে উপবৃত্তি পাবে, তার সুফলের কথা ওই অভিভাবককে বোঝাতে হবে। তিনি হয়ত এরূপ অর্থ সাহায্যের অপর্যাপ্ততার কথা বলতে পারেন। সেক্ষেত্রে প্রতিটি স্কুলে যেসব অতিশয় দরিদ্র ছাত্রী অধ্যয়ন করে, তাদের সঠিক জরিপের মাধ্যমে চিহ্নিত করে তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ বৃত্তি বা অনুদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে করে সরকারের বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে ঠিকই, কিন্তু চাপ বাড়ানোর এর চেয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্র আর কী হতে পারে। একদিকে সরকার বাল্যবিবাহ রোধ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, আর অন্যদিকে নারীশিক্ষাও প্রসার লাভ করবে। তবে কেবলমাত্র সরকারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে এলাকার বিত্তশালীদেরও এগিয়ে আসা উচিত। তাঁরা যদি প্রতিটি স্কুলে এরকম ৮-১০টি মাসিক বৃত্তি চালু করেন, তা হলে এলাকার অনেক গরীব অভিভাবককে অর্থের অভাবে কন্যাশিশুটিকে সংসার থেকে অকালে বিদায় করতে হবে না। আমাদের দেশে প্রতিটি ইউনিয়নে এরকম অন্তত ১০০ ব্যক্তি আছেন, যাদের কাছে প্রতি মাসে ৫০০টি টাকা এ বাবদে দান করা কোনো ব্যাপারই না। অভাব শুধু তাঁদের সংগঠিত করা। সেই উদ্যোগটি নিতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্কুল কমিটি। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি, ধান কাটার মৌসুমে স্কুল কমিটির ত্যাগী সদস্যরা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে স্কুলের জন্য দান হিসেবে ধান সংগ্রহ করতেন। এখন সে ধরনের কমিটিও নেই, নেই সেই উদ্যোগ। এখন দেশ যতই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের প্রত্যাশাও ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে সরকারের কাছে। নিজেরাও যে নিজেদের পরিমণ্ডলে ছোটখাটো অনেক কিছু করতে পারে, দাঁড়াতে পারে প্রতিবেশীর পাশে, সে কথা ভুলতে বসেছে মানুষ। (না, সব মানুষ নয়, যারা প্রভূত ক্ষমতাশালী, যারা অগাধ বিত্তের মালিক তারা। )

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

সূত্র: কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন