শিশুদের প্রতি সদয় হোন

ইসহাক খান 

আমার একজন ফেসবুক বন্ধু আমার সঙ্গে একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন। ভিডিওটি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদের চুম্বক অংশ।

কী আছে ওই ভিডিওতে? আট বছরের একটি শিশু ইব্রাহিম, ওর সত্বাবার কাছে চিপস খাওয়ার আবদার করেছিল। ওর সত্বাবা চিপস দেওয়ার নাম করে ওকে ডেকে বাইরে এনে ধারালো দায়ের এক কোপে ডান হাতটা কেটে ফেলে। ইব্রাহিম কাঁদতে কাঁদতে সত্বাবাকে বলে, ‘আব্বা, আমার হাত কেটে ফেললেন, আমি ভাত খাব কিভাবে?’ ওই শিশুর মুখে এ কথা শোনার পর আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। অথচ সেই সত্বাবা এ কথার পর শিশু ইব্রাহিমের বাঁ হাতও কেটে ফেলে। দুই হাত হারিয়ে শিশু ইব্রাহিম পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এক মাস ধরে সেই হতভাগ্য শিশু পঙ্গু হাসপাতালে অব্যক্ত যন্ত্রণায় ছটফট করছে। অথচ তাকে কেউ দেখতে আসেনি। সত্বাবার আসার প্রশ্নই ওঠে না। সে এখন পলাতক। পুলিশ তাকে খুঁজছে। দুঃখের বিষয়, ইব্রাহিমের মা-ও ছেলেকে দেখতে আসেননি। কেমন মা তিনি?

ইব্রাহিমের চিকিৎসারও অবহেলা হয়। এই খবর প্রচার হওয়ার পর রোখসানা নামের একজন মহিলা শিশুর বেদনা সহ্য করতে না পেরে নিজে ছুটে আসেন ইব্রাহিমকে দেখতে। তিনি একজন আয়াকে ডেকে এনে তাকে টাকা দিয়ে ইব্রাহিমকে পরিষ্কার করান। ’

তারপর ইব্রাহিমের স্বাভাবিক চিকিৎসা হয়। ইব্রাহিম কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তার বর্ণনা শুনে দর্শকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ইব্রাহিম বলে, ‘আব্বা, আমাকে চিপস দেওয়ার নাম করে আমাকে বাড়ির বাইরে এনে হাত কেটে দেয়। ’ আমি বললাম, ‘আব্বা, আপনি হাত কাইটা দিলেন, আমি ভাত খাব কিভাবে? তাই শুনে আব্বা আরেকটা হাতও কাইটা ফেললেন। ’

সাংবাদিক ওকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি হাসপাতাল থেকে গিয়ে কী করতে চাও?’ শিশু ইব্রাহিম অকপটে জবাব দেয়, ‘আমি লেখাপড়া করতে চাই। ’

‘কিভাবে লেখাপড়া করবে? তোমার তো দুটি হাতই নেই? লিখবে কিভাবে?’

ইব্রাহিম বলে, ‘আমি মুখ দিয়ে কলম কামড়ে ধরে তারপর লিখব। ’ এসব কথা সহ্য করার মতো না। এত কিছুর পরও শিশু ইব্রাহিমের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে ওর প্রতি আমার ভালোবাসা ভীষণ বেড়ে যায়। আমার সামর্থ্য থাকলে আমি ইব্রাহিমকে আশ্রয় দিয়ে ওর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিতাম। আমি একবারই ভিডিওটি দেখেছি। দ্বিতীয়বার দেখার সাহস হয়নি। ভিডিওটি আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। আরো একটি ভিডিও সংরক্ষিত আছে। সেটিও শিশু নির্যাতনের নির্মম দৃশ্য। সাত-আট বছরের এক বালককে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন দুজন হুজুর। বালকটি আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করছে। হাতের সামনে যা পাচ্ছে তাই ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে। কিন্তু এক হুজুর টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে, আরেকজন হুজুর পেছন থেকে তাকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছেন। একজন পথিক জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে, এভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? একজন হুজুর বলেন, মাদরাসা থেকে পালিয়ে এসেছে। তাই ধরে নিয়ে যাচ্ছি শাস্তি দেওয়ার জন্য।

এ বিষয়টি স্পর্শকাতর। শিক্ষা কখনো এভাবে বাধ্য করে শেখানো যায় না। ভালোবেসে শিক্ষা দান করতে হয়। এ ব্যাপারটা তাদের কে বোঝাবে?

এ ছাড়া শিশু নির্যাতনের আরো হৃদয়বিদারক ঘটনা আছে। মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে শিশুকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আরো নির্মম হলো, শিশুর পায়ুপথে গ্যাস ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করা। এই নির্মম ঘটনাগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হলে ঘটনার পুনাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

পাশাপাশি শিশুদের যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ কাহিনি ঘটছে দেশের সর্বত্র। গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলায় চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি চার বছর বয়সের এক শিশুকে আইসক্রিম দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তাকে ঘরে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন করে। মেয়েটির যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকলে ধরা পড়ার ভয়ে ওই পাষণ্ড শিশুটিকে গলা টিপে হত্যা করে নির্জন স্থানে ফেলে দিয়ে আসে।

শিশুদের আমরা ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করি। কারণ ফেরেশতারা যেমন নিষ্পাপ, তেমনি শিশুরাও নিষ্পাপ। সব শিশুই একেকটি রঙিন ফুল। পৃথিবীর সব প্রাণীর শিশু বাচ্চাকে কত চমৎকার দেখা যায়। আমরা এতটাই পাষাণ হয়ে গেছি যে সেই ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদের নির্যাতনের মাধ্যমে হয় হত্যা করছি, না হয় তাকে পঙ্গু করে দিচ্ছি। আমরা কি পশুর পর্যায়ে নেমে এসেছি? কেন? আমাদের এত অধঃপতন কেন? আমরা কি আমাদের মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে শিশুদের আদর-সোহাগ দিতে পারি না?

গত ২২ নভেম্বর মিরপুর বস্তিতে ‘স্বপ্নডানা’ নামের একটি সংগঠনের আমন্ত্রণে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার উপকরণ বিতরণ করতে গিয়েছিলাম। বক্তৃতার একপর্যায়ে আমি বস্তির মহিলা অভিভাবকদের বললাম, আপনারা কে কে শিশুর গায়ে হাত তোলেন না, তাঁরা হাত তুলুন? তাঁরা আমার এমন কথায় মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকেন। আমি বুঝলাম, তাঁরা অনেকেই শিশুদের মারধর করেন। আমি তাঁদের বললাম, যে কারণে আপনি আপনার সন্তানের গায়ে হাত তুলছেন, ওকে মারলেই কি সেই জিনিস আপনি ফিরে পাবেন? তাহলে কেন মারছেন। ও ভুল করেছে। ওকে বলেন, তুমি এটা ভুল করেছ। আর কোরো না। ওকে বন্ধু ভাবুন। দেখবেন ও আর ভুল করবে না। ও আর অবাধ্য হবে না। ওকে যত আঘাত করবেন তত বেশি ও বেয়াড়া হয়ে যাবে। ও বুঝে ফেলবে, এ ধরনের অন্যায় করলে সামান্য শাস্তি পাবে। তাতে কী? সে আগের ভুলটা ইচ্ছা করে করতে থাকে। এ থেকে ওরা আরো অন্ধকারের পথে নেমে যাচ্ছে। নেশা শুরু করবে। অতএব ওকে ভালোবাসা দিয়ে বুকে চেপে রাখুন। দেখবেন ও আপনার কথার অবাধ্য হবে না। বস্তির ওই মহিলারা আমাকে কথা দিলেন, তাঁরা আর সন্তানের গায়ে হাত তুলবেন না। সন্তানকে বন্ধু ভাববেন।

বস্তির ওই সব মানুষ অক্ষরজ্ঞানহীন। তবু তাঁরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিজেরা সংশোধন হবেন বলে কথা দিলেন। কিন্তু আমাদের জ্ঞানী-গুণীরা, যাঁরা সমাজের সম্মানীয় ব্যক্তি, তাঁরা কী করছেন? তাঁদের কর্মকাণ্ডের কথা শুনলে স্তম্ভিত হতে হয়। সিরাজগঞ্জ জেলার বানিয়াগাঁতি গ্রামের একটি মাদরাসার প্রিন্সিপাল শরীরে তেল মর্দনের নামে মাদরাসার শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে বলাৎকার করেন। ব্যাপারটা ধরা পড়ে সেই সম্মানীয় প্রিন্সিপাল সাহেব এখন শ্রীঘরে। তাঁদের আপনি কিভাবে সচেতন করবেন? তিনি তো যথেষ্ট সচেতন ও শিক্ষিত। শিক্ষিত না হলে তিনি একটি মাদরাসার প্রিন্সিপাল হলেন কিভাবে? অথচ তিনি শিশু নির্যাতনের মতো এমন জঘন্য কাজ অনায়াসে করে ফেলেছেন। ভাবা যায়?

আমাদের মানবিক মূল্যবোধে ভয়ংকর ধস নেমেছে। আমরা যত অমানবিক কাজ নির্বিঘ্নে করে যাচ্ছি। তাতে কোনো অপরাধ বোধ কাজ করে না আমাদের মনে। আমরা কত সহজে একটি শিশুকে নির্যাতন করে আত্মতৃপ্তিতে ভুগি। অতি দ্রুত এই অবক্ষয়ের উত্তরণের পথ বের করতে হবে সমাজ বিশ্লেষকদের। না হলে অন্ধকার ক্রমেই আমাদের সব অর্জনকে গ্রাস করে ফেলবে।

লেখক :
গল্পকার, টিভি নাট্যকার

সূত্র: কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন