শহীদ ডা. মিলন স্মরণে

ডা. এম. নজরুল ইসলাম 

আজ ২৭ নভেম্বর, ২০১৭। শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলনের ২৭তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৯০ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক ওচএগজ) বিএমএর একটি সভায় যোগ দিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দীনের সঙ্গে একই রিকশায় যাওয়ার পথে টিএসসির মোড়ে ডা. মিলন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তখন একদিকে সামরিক স্বৈরাচারী সরকারের পতন দাবিতে রাজনৈতিক আন্দোলন, অন্যদিকে বিএমএর নেতৃত্বে গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ও চিকিৎসকদের ৩০ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলন চলছিল। এমনই এক অবস্থায় চিকিৎসকদের একটি সমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার পথে সামরিক সরকারের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে ডা. মিলন নিহত হয়েছিলেন। সেদিন ডা. মিলনের হত্যার মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল।

ডা. মিলন লক্ষ্মীপুর জেলার কলাকোপা গ্রামে একটি সাধারণ পরিবারে ১৯৫৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শাহাদাত উল্লাহ, মা মোসাম্মাৎ সেলিনা আক্তার। ছোটবেলা থেকেই মিলন মেধাবী ছিলেন। ঢাকা নটর ডেম কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে মিলন জাসদ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন সৎ, সাহসী ও দক্ষ চিকিৎসক সংগঠক। ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস পাস করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় ডা. মিলন সারাদেশের নবীন চিকিৎসকদের সংঘবদ্ধ করেন ও ইন সার্ভিস ট্রেইনি চিকিৎসক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হন। এ সময় সামরিক সরকার দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চলমান ইন সার্ভিস ট্রেইনি প্রথা বাতিল করে ইন্টার্নি ট্রেনিং প্রথা চালু করলে নবীন চিকিৎসকরা সে সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কেন্দ্রীয় বিএমএ তাদের এ দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। বিএমএর ২১ দফা দাবি আদায় ও নবীন ডাক্তারদের আন্দোলন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অচল করে দেয়। সরকার একটি পর্যায়ে বিএমএর সঙ্গে আলোচনায় বসে দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলে আন্দোলন সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামরিক সরকার বিএমএর দাবি-দাওয়া বাস্তবায়ন না করে নতুন করে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের কালাকানুন জারি করতে থাকে। বিএমএ তখন নতুন করে ২৩ দফা দাবি তৈরি করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।

১৯৮৫ সালে দেশের প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসকরা (প্রকৃচি) ৯ দফা দাবি নিয়ে আরেকটি আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সে আন্দোলনে দেশে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। বিভিন্নভাবে সে আন্দোলনকে বানচাল করার ষড়যন্ত্রে ব্যর্থ হয়ে সামরিক সরকার প্রকৃচির নেতৃবৃন্দের ওপর নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে নেতৃবৃন্দকে বদলি করাসহ সামরিক আইনে (গখজ-৯) চাকরিচ্যুত করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন বিএমএর নেতা ডা. মহিবুল্লাহ, ডা. শিশির কুমার মজুমদার, ডা. এম. নজরুল ইসলাম (এ নিবন্ধকার) ও ডা. শামসুল আলম খান মিলন। এক পর্যায়ে সামরিক সরকার আলোচনার টেবিলে বসে দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়। ডা. মিলন তৎকালীন বিএমএর কেন্দ্রীয় কমিটিতে না থেকেও এসব আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় তাকেও সেদিন সামরিক আইনে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এমনকি বিএমএর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ওচএগজ-এ গ.চযরষ কোর্সে তার ডেপুটেশন প্রথা বাতিল করে তাকে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। এত কিছুর পরও মিলন এসব আন্দোলনে সক্রিয় ও আপসহীন ছিলেন। বিএমএ ও প্রকৃচির এসব দাবি-দাওয়া বাস্তবায়ন করার পদক্ষেপ গ্রহণ না করে নতুন করে স্বৈরাচারী সরকার দেশে একটি গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি ঘোষণা করে। বিএমএ এই গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি প্রত্যাখ্যান করে তা বাতিলের দাবিতে নতুন করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই ধারাবাহিকতায় ২৭ নভেম্বর সকাল ১০টায় তৎকালীন ওচএগজ-এ বিএমএর ডাকে এক চিকিৎসক সমাবেশ আহ্বান করা হয়েছিল। সে সমাবেশে যোগদান করতে যাওয়ার পথে সেদিন ডা. মিলন নিহত হয়েছিলেন। ডা. মিলন তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষক।

২৭ নভেম্বর বেলা আনুমানিক ১১টায় মিলনের মৃত্যুর খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসকদের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণ এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ জানায় এবং সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ সৃষ্টি হলে সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সন্ধ্যা থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ আইন জারি করে। এরই মধ্যে ডা. মিলন হত্যার প্রতিবাদে ঢাকাসহ সারাদেশে চিকিৎসকরা বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু করেন। ঢাকাতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক বিরাট চিকিৎসক সমাবেশ শুরু হয়। অন্যদিকে তৎকালীন ১৫ দলীয় জোট নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা পরদিন ২৮ নভেম্বর ডা. মিলন হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

আমরা কেন্দ্রীয় বিএমএ নেতৃবৃন্দ ঢাকা মেডিকেল কলেজে এসে অধ্যাপক ডা. এজিএম চৌধুরী স্যারের রুমে বসে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসি। ডা. মিলনের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে দাফন করার সিদ্ধান্ত নিই এবং এ হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশের চিকিৎসক সমাজের গণপদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, সামরিক সরকার তার বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ডা. মিলনের মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে এবং সন্ধ্যা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করার কারণে আমরা তাৎক্ষণিক ডা. মিলনের দাফন কাজ অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে শেষ করি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে চিকিৎসক সমাবেশে বিএমএর কর্মসূচি গণপদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে এবং ডা. মিলনের দাফন কাজ শেষ করে উপস্থিত চিকিৎসকরা খণ্ড খণ্ড মিছিল করে কারফিউ আইন ভেঙে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চলে যেতে থাকেন। এমনই একটি মিছিল মিটফোর্ড হাসপাতালে যাওয়ার পথে বেচারাম দেউড়ি মোড়ে সামরিক সরকারের সন্ত্রাসীদের গুলিতে ডা. মামুন আহত হন। মূলত ডা. মিলনকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের ভিত নড়ে যায় এবং এরশাদ সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়। এরই এক পর্যায়ে ১৯৯০-এর ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। শহীদ নূর হোসেন ও ডা. মিলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের দীর্ঘদিনের সামরিক শাসনের অবসান ও গণতন্ত্রের বিজয় হয়।

শহীদ ডা. মিলন শুধু দেশের চিকিৎসক সমাজেরই একজন নন, তিনি দেশের এক কৃতী সন্তান ও জাতীয় বীর। যেখানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম হবে, যেখানেই অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই হবে, যেখানেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াই হবে, সেখানেই ডা. মিলনের চেতনাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। ডা. মিলন শুধু ক্ষণিকের জন্য নয়; যুগে যুগে আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে সাহস জোগাবে। ডা. মিলন তাই চিরঞ্জীব।

লেথক: সাবেক সহসভাপতি, বিএমএ ও ‘৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের চিকিৎসক নেতা

সূত্র: কালের কন্ঠ

শেয়ার করুন