রাখাইনে সু চির শিশুতোষ উপদেশ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :: সম্প্রতি মিয়ানমারের বিধ্বস্ত জনপদ রাখাইনে অং সান সু চি সফরে গিয়েছিলেন। তিনি যখন রাখাইনে তখনও বাংলাদেশ সীমান্তে নির্যাতিত-নিপীড়িত রোহিঙ্গারা ভিড় করছিল। রাখাইন সফরে গিয়ে সু চি বলেছেন, ‘তোমরা ঝগড়া করো না।’ তার এই মন্তব্য সমালোচনার আরও খোরাক জুগিয়েছে। কারণ রাখাইনে যা চলছে তা ‘ঝগড়া’ নয়, স্পষ্টই জাতিগত নিপীড়ন। মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি এখনও রোহিঙ্গাদের প্রতিকূলে। টানা সামরিক অভিযানে গণহত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও, লুটতরাজসহ অমানবিক বিভিন্ন ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর এখন বর্বরতার ধরন পাল্টেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশ, এর ফলে বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গ অনুপ্রবেশের ঢল নেমেছে। বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে সু চি যখন রাখাইন সফর করছিলেন, তখন অনেকেই এই সু চির মাঝে সেই সু চিকে খুঁজছিলেন। সু চির অতীত-বর্তমান মিলিয়ে দেখলে হতাশ হওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না। অং সান সু চি অবশ্য রক্ষণশীল বলে মোটেই পরিচিত নন। তিনি উদারনীতিরই মুখপাত্র। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প কেন, হিলারি ক্লিনটনের তুলনাতেও তিনি অনেক উজ্জ্বল। বিশ্ব তাকে চেনে গণতন্ত্রের এক মানসকন্যা হিসেবেই এবং প্রশংসাও করে থাকে। তার লড়াইটা ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। মিয়ানমারের জঙ্গি শাসকরা গণতন্ত্রের কণ্ঠ আক্ষরিক অর্থেই চেপে ধরেছিল, তিনি দাঁড়িয়েছিলেন বিপদগ্রস্ত গণতন্ত্রের পক্ষে। তার রাজনৈতিক জীবনের পুরোপুরি ১৫ বছর কেটেছে কারাগারে। সামরিক জান্তা তার বিরুদ্ধে নানা রকম মামলা দিয়েছে। ট্রাম্পও অনেক মামলায় পড়েছেন; কিন্তু কোনো মামলাতেই ট্রাম্পের কারাদণ্ড হয়নি, বরং দেখা গেছে, যত মামলা তত উন্নতি। ট্রাম্পের সব মামলাই বাণিজ্যিক। সু চির বিরুদ্ধে মামলাগুলোর কোনোটাই বাণিজ্যিক নয়, সবই রাজনৈতিক। মামলা যারা করেছে, তারা নিজেরাই আবার বিচারক ছিল।

সু চি ভয় পাননি। সামরিক শাসকদের জঙ্গিপনার সঙ্গে আপস করেননি। তারা তাকে বছরের পর বছর আটকে রেখেছে। স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে পারিবারিক জীবনযাপন করতে দেয়নি। ক্যান্সারে যখন মরণাপন্ন তখনও তার স্বামীকে শেষ দেখা করার জন্য মিয়ানমারে আসতে দেয়নি। বলেছে, মিয়ানমারে তার চিকিৎসা সম্ভব নয়। তারা উৎসাহিত করেছে সু চিকে লন্ডনে চলে যেতে। অভিসন্ধিটা ছিল একবার দেশের বাইরে গেলে আর ঢুকতে না দেওয়ার। সু চি সে ফাঁদে পা দেননি। দেশের মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন। স্বামী মারা গেছেন লন্ডনেই। শেষ দেখাটা পর্যন্ত হয়নি। দুটি পুত্রসন্তান, তারাও বিদেশেই থাকে।

বলা সম্ভব যে, অনেক দিক দিয়েই সু চি হচ্ছেন ট্রাম্প, যা নন তা-ই। তার পরিবারটি ঐতিহ্যগতভাবেই রাজনৈতিক। পিতা অং সান আধুনিক বার্মা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪৮ সালে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে বার্মার স্বাধীনতা অর্জন তার নেতৃত্বেই ঘটে। বার্মার আধুনিক সেনাবাহিনীর গঠনও তিনিই করেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে তিনি নিহত হন। কন্যা অং সান সু চির জন্ম ১৯৪৫-এ। সু চি তিন বছর বয়সেই পিতৃহীন হন। ভাগ্য ভালো, মা ছিলেন সুশিক্ষিত এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাসিন্দা। সু চির মা এক সময় ভারতে বার্মার রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সু চির শিক্ষাজীবন রীতিমতো আন্তর্জাতিক। পড়াশোনা শুরু করেন রেঙ্গুনের খ্রিস্টান মিশনারিদের ইংরেজি স্কুলে। পরে মায়ের সঙ্গে দিল্লিতে গিয়ে পড়েছেন মিশনারিদেরই স্কুল ও কলেজে। সেখান থেকে চলে যান অক্সফোর্ডে। অক্সফোর্ডে বিএ পাস করেন তিনটি বিষয় নিয়ে। এর পরে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এমএ করেন রাজনীতি বিষয়ে। কর্মজীবনের শুরু নিউইয়র্কে, জাতিসংঘের সদর দপ্তরে। আরও পরে এমফিল করেছেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে। ১৯৯০ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অনারারি ফেলো পদবি দিয়ে সম্মানিত করে। ভারতের সিমলাতে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিঁউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজে তিনি গবেষণার কাজও করেছেন। তার ইংরেজ স্বামী ড. মাইকেল ইরিস গবেষণা করেছেন তিব্বতের সংস্কৃতি বিষয়ে।

মিয়ানমার সরকার যেভাবে তাকে নির্যাতন করেছে, তাতে সারাবিশ্বে প্রতিবাদ ওঠে। ওই প্রতিবাদের ধারাবাহিকতাতেই অং সান সু চিকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় ১৯৯১ সালে। পুরস্কার প্রদানের কারণ হিসেবে অভিজ্ঞানপত্রে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য সু চির ধারাবাহিক অহিংস সংগ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল সঙ্গতভাবেই।

সু চি তখন বন্দি। শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের ক’জন এক যৌথ বিবৃতিতে সু চির মুক্তি দাবি করেছিলেন। ২০০৮ সালে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র তাদের সর্বোচ্চ কংগ্রেসনাল পুরস্কার দিয়ে গণতন্ত্রের জন্য সু চির সংগ্রামের প্রতি তাদের নৈতিক সমর্থন ব্যক্ত করে। বন্দি অবস্থায় থাকার দরুন ওই পুরস্কারটি তখন তিনি গ্রহণ করতে পারেননি, গ্রহণ করেন চার বছর পরে, ২০১২ সালে। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যাকে বন্দি অবস্থায় ওই সম্মাননাটি দেওয়া হয়েছিল।

সামরিক জান্তা সু চিকে কেবল যে আটক অবস্থায় রেখে সন্তুষ্ট থেকেছে, তা নয়। নির্যাতন করেছে নানাভাবে। ২০০৮ সালে সাইক্লোন নার্গিস মিয়ানমারে ভয়ঙ্কর ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। সু চি তখন গৃহবন্দি। সাইক্লোনে তার ঘরের ছাদ উড়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভঘ্নবাড়িতে মোমবাতি জ্বালিয়ে অনেক দিন তাকে নির্জন রাত কাটাতে হয়েছে। ইচ্ছা করেই তার বাড়িটি মেরামত কয়েক মাস বিলম্বিত করে সামরিক জান্তা। সরকারি লোকেরা তাকে অন্তত দু’বার হত্যা করার চেষ্টা করেছে। বিশ্বের জনমত ছিল সু চির পক্ষে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে চীন ও রাশিয়া কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক সরকারের তেমন সমালোচনা করেনি, যেমনটা নাকি প্রত্যাশিত ছিল। না করার কারণ, ওই রাষ্ট্র দুটি মিয়ানমারের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছিল। বোঝা গেল রাশিয়া ও চীন ততদিনে সমাজতন্ত্রের পথ ছেড়ে পুঁজিবাদের পথ ধরেছে। এমনকি ভিয়েতনামও যে তার আগের অবস্থান থেকে সরে গেছে, সেটা টের পাওয়া যায় ২০০৯ সালে যখন তাদের একজন মুখপাত্র বললেন যে, সু চিকে গৃহবন্দি করে রাখাটা মিয়ানমার সরকারের ‘ঘরোয়া’ ব্যাপার।

এসব ঘটনা পুরনো। অং সান সু চি সম্প্রতি যে কারণে আলোচনায় উঠে এসেছেন, সেটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন চলছে, সেটা গণহত্যা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। রোহিঙ্গারা একটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী। সংখ্যায় তারা ১১ লাখের মতো হবে। যুগের পর যুগ ধরে এরা মিয়ানমারের পশ্চিম সীমান্তে বসবাস করে আসছে। কিন্তু এদের কোনো নাগরিক অধিকার নেই, নেই ভোটের অধিকারও। চলাফেরার স্বাধীনতা অনুপস্থিত, অধিকাংশই চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। প্রতিবেশী রাখাইনরা তাদের ওপর যখন-তখন অত্যাচার চালায়। রাখাইনরা চায় রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে চলে যাক, যাতে তাদের বিষয়-সম্পত্তি তারা দখল করতে পারে। অত্যাচারের মাত্রা ক্রমাগত বেড়েছে। যে জন্য শরণার্থী হিসেবে অগণিত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে।

প্যালেস্টাইনে বর্ণবাদী ইহুদিরা যা করছে, মিয়ানমারের বৌদ্ধদের একাংশ তার চেয়েও জঘন্য কাজে লিপ্ত রয়েছে। প্যালেস্টাইনের মানুষরা তবু প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তারা লড়ছে, রোহিঙ্গাদের সে ক্ষমতা একেবারে নেই। প্যালেস্টাইনের পক্ষে বলার কিছু লোক আছে, রোহিঙ্গাদের পক্ষে সেভাবে বলার কেউই নেই। বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে আশ্রয় দিচ্ছে। তাদের পক্ষে যে শক্ত একটা অবস্থান নেবে, মিয়ানমারের ওপর যে চাপ দেবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটনার ভয়াবহতাকে যে তুলে ধরবে, বাংলাদেশ সরকার সেটা কার্যকররৃপে করতে পারছে না। অথচ আশ্রয় দেওয়া ও চাপ দেওয়া দুটি কাজই করা খুব দরকার ছিল। আমরা কী করে ভুলি যে, একাত্তরে প্রতিবেশী ভারত যদি তার সীমান্ত খুলে না দিত, তাহলে আমাদের যে বিপদ ঘটত, রোহিঙ্গারা আজ ঠিক সেই বিপদেই পড়েছে? সেদিন ভারত কেবল যে আশ্রয় দিয়েছে তা নয়, আমাদের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে এবং যুদ্ধ পর্যন্ত করেছে। সেটা ভুলে গিয়ে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে উদাসীন থাকলে যে নৈতিক পরাজয়টা ঘটবে, তা আমাদের হীন ও ক্লীব করে ফেলবে; অন্যদের চোখে তো বটেই, নিজেদের কাছেও আমরা অত্যন্ত অমানবিক বলে উদ্ভাসিত হবো। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আমাদের যে ঐতিহ্যটা আছে, সেটা ম্লান হয়ে যাবে। মিয়ানমার সরকার অবশ্য চাইছে, রোহিঙ্গারা সবাই দেশ ছেড়ে পালাক; বাংলাদেশ তো পাশেই, সেখানে গিয়ে মাথা গুঁজুক। তাদের সেই অভিসন্ধির কারণেও অবিলম্বে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া চাই। নইলে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাছেই হেরে যাব। তদুপরি রোহিঙ্গারা বানের স্রোতের মতো আসছে এবং আসবে, আসতেই থাকবে। প্রাণের ভয়ের চেয়ে বড় ভয় মানুষের জন্য আর কিই-বা হতে পারে?

বাংলাদেশ সরকার যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারেনি; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবাদ করছে, করবেও। এ দেশে বসবাসকারী বৌদ্ধ ও রাখাইনরা বাস্তব বুদ্ধির ও যথার্থ নৈতিকতার পরিচয় দিয়েছে। তারা মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নিধন তৎপরতার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এই সুযোগে দেশের ইসলামপন্থি দলগুলো তৎপর হয়ে উঠতে চাইছে। ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসীদের পক্ষে উচিত হবে, প্রতিবাদের কাজটা অবিলম্বে নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া। নয়তো ধর্মান্ধদের অভিসন্ধিতে ইস্যুটি সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে পরিণত হবে।

সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছেন অবশ্য অং সান সু চি নিজে। এতকাল তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়েছেন, দুঃসহ নির্যাতন সহ্য করেছেন, এখন তিনি তার নিজের সরকারকে গণহত্যার ব্যাপারে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছেন। প্রথমে চুপ করে ছিলেন, ধীরে ধীরে সরব হচ্ছেন; তবে বিপন্ন রোহিঙ্গাদের পক্ষে মোটেই নয়, নিপীড়নকারী সরকারি বাহিনী ও সরকার সমর্থিত বর্ণবাদীদের পক্ষে। তিনি বলা শুরু করেছেন যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের লোক নয়, তারা আসলে বাঙালি। প্রয়োজন দেখা দিলে বলবেন ওরা বৌদ্ধ নয়, তারা মুসলমান। এই দুই যুক্তিই দাঁড়িয়ে যাবে তাদেরকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মেরে-ধরে তাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে। সামরিক জান্তা সু চিকে দেশছাড়া করতে চেয়েছিল; পারেনি; এখন ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার যে পুরো জনগোষ্ঠীটিকে নির্মূল করে দিতে সচেষ্ট হয়েছে, গণতন্ত্রের বিশ্বনন্দিত মানসকন্যা সেটাই চাইছেন। নিজের একসময়কার নৈতিক বেদনা এবং অনিশ্চিত ও নিঃসঙ্গ জীবনযাপনের বিভীষিকা তিনি ভুলে গেছেন। নিজেকে তিনি নৈতিকভাবে অহিংসাবাদী এবং রাজনৈতিকভাবে গান্ধীপন্থি বলে ঘোষণা করেছিলেন; কিন্তু ক্ষমতা পেয়ে দেখা যাচ্ছে, তিনি দমন-পীড়নের হিংস্র পথটাই বেছে নিয়েছেন।

তিনি সেনাবাহিনীর ‘পোড়ামাটি নীতি’র তাণ্ডবে পর্যুদস্ত রাখাইন রাজ্যের উত্তরাংশ সফর করেছেন। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ফসলি ক্ষেত, পুরো জনপদ বিধ্বস্ত-ভস্ম। সু চি সেখানে গিয়ে শিশুতোষ উপদেশ দিয়েছেন, ‘ঝগড়া করো না।’ গণহত্যায় আক্রান্তদের উদ্দেশে তার এই উপদেশ কিরৃপ নির্লজ্জ-হাস্যকর সেটা নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না। মংডুর মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় তাকে হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেছে। তার এই সফরকে মাছের মায়ের কান্নার সঙ্গেই তুলনা চলে।

বৌদ্ধধর্ম হিংসায় বিশ্বাস করে না। তিনি নিজে ওই ধর্মের মানব কল্যাণকামী নীতির অনুসারী বলে সুপরিচিত। বন্দি অবস্থায় তার প্রধান অবলম্বন ছিল বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র পাঠ। সেই মানুষটি এখন সধর্মীদের একাংশকে উগ্র বর্ণবাদী আচরণে উৎসাহিত করছেন। ঘটনাটি মর্মান্তিক বৈকি। নোবেল পুরস্কার কমিটি তাদের অভিজ্ঞানপত্রে বলেছিল যে, তারা এমন একজন মানুষকে সম্মান জানাচ্ছে, যিনি নাগরিক সাহসের অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। অং সান সু চিকে সম্মান জানিয়ে বিশ্বজুড়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম চলছে, তার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছিল বলে কমিটি মতপ্রকাশ করেছিল। সু চির বর্তমান ভূমিকা কমিটির সে আশা পূরণ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষমতা পাওয়া মাত্রই তিনি গণতন্ত্র-নিষ্পেষণকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

একদা যারা তাকে নিপীড়ন করেছিল, তাদের সঙ্গে তার ব্যবধানটা দূর হয়ে গেছে। তিনি নিন্দিত হচ্ছেন। বলা হচ্ছে যে, তিনি যেন তার নোবেল পুরস্কারটি ফিরিয়ে দেন। কেননা সেটি অর্পণের পেছনে যে প্রত্যাশা ছিল তা তিনি পূরণ করতে পারছেন না। শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার অবশ্য আমাদের বাংলাদেশের গৌরব অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও পেয়েছেন; তিনি সারাবিশ্বকে সামাজিক ব্যবসাতে দীক্ষিত ও শিক্ষিত করছেন; কিন্তু নিজের দেশের নিকট প্রতিবেশী রোহিঙ্গাদের অশান্তিতে নীরব থাকার সিদ্ধাতেই অটল ছিলেন। অনেক পরে অল্প-একটু সাড়া দিয়েছেন, তাও একাকী নয়; আরও ২২ জন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে। মন্দের ভালো।

উদারনীতির মূল কথাটাই অবশ্য সমঝোতা। উদারনীতিকদের দৌড় ওই পর্যন্তই। তারা শ্রেণিস্বার্থ রক্ষায় অভিলাষী এবং প্রয়োজনে বর্ণবাদী হতেও প্রস্তুত। এদিক থেকে অং সান সু চি একজন খাঁটি উদারনীতিক। কমও নন, বেশিও নন।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক

সূত্র : সমকাল

শেয়ার করুন