মুক্তিযুদ্ধ, সশস্ত্র বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় আচার

মো. আবদুর রশীদ 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় দিন হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী দিবস জাতীয় অঙ্গনে অনবদ্য হয়ে গেছে। সশস্ত্র বাহিনী দিবস উদযাপনের পেছনের দর্শন হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর ভূমিকাকে সমুন্নত রেখে বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের সত্যকে তুলে ধরা। শিখা অনির্বাণে পুষ্পমাল্য দিয়ে স্বাধীনতার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দিন শুরু হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী প্রথম শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিকেলে সেনাকুঞ্জে আয়োজিত দৃষ্টিনন্দন সংবর্ধনার প্রতি বেশি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। শহীদ পরিবারদের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্যও থাকে বিশেষ আয়োজন। ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের সেনা, নৌ এবং বিমানবাহিনী সর্বপ্রথম সম্মিলিত অভিযান পরিচালনা করে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে বাংলাদেশের অস্তিত্বের বাস্তবতাকে বিশ্বের কাছে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই আমাদের জাতীয় জীবনে এ ঐতিহাসিক দিনটির তাৎপর্যের বিশালতা ও গভীরতা সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ পথের দিশারি হয়ে থাকবে। যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে দেশে পালিত হয় সশস্ত্র বাহিনী দিবস। সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ দিনটিতে নতুন মাহাত্ম্য যোগ করে রাষ্ট্রীয় আচার বা কৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী আত্মপ্রকাশ ঘটে আলাদা আলাদাভাবে। সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব শুরু থেকে থাকলেও নৌ এবং বিমানবাহিনী ছোট সামর্থ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বড় আঘাত হানতে সমর্থ হয়েছিল। আক্ষরিক অর্থে সম্মিলিত অভিযানের মধ্যে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আত্মপ্রকাশ ২১ নভেম্বর ঘটলেও স্বাধীনতার পর থেকে বাহিনীগুলো তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে আসছিল। আশির দশকের গোড়ার দিক থেকে সম্মিলিত অভিযানের সূচনার ঐতিহাসিক দিনটিকে সমুজ্জ্বল করতে সশস্ত্র বাহিনী দিবস যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করা শুরু হয়। দেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক বাহিনীর সংযোগ সেতু হিসেবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের বিশেষ ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। জনসম্পৃক্ততা দিনটিকে আরও সার্বজনীন করেছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী ও অবিস্মরণীয় নেতৃত্ব ও দেশের মানুষের রাজনৈতিক প্রত্যয়কে ঘনীভূত করেছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা যেমন সুস্পষ্ট ছিল, ঠিক মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কৌশল সুবিন্যস্ত ছিল। স্বচ্ছ সামরিক নির্দেশনার কারণে ২৫ মার্চে অপারেশন সার্চলাইটের নামে হানাদাররা বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটালিয়ন নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিদ্রোহ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানার ইপিআর প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলে। সারাদেশে প্রতিরোধ গড়ে তোলে সাধারণ মানুষ। ২৬ মার্চ সকাল থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয় এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটগুলো পাকিস্তানি কমান্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়। প্রতিরোধ যুদ্ধে টিকে থাকতে কৌশলগতভাবে সীমানা পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। সেনাবাহিনী গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে।

একাত্তর সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যুদয় ঘটে। দখলদারমুক্ত করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী তৈরি অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। কর্নেল এমএজি ওসমানীকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক করা হয় এবং ১১ জুলাই বাংলাদেশ সামরিক কমান্ড স্থাপিত হয়। বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়। পাকিস্তানি আনুগত্য পরিত্যাগ করে আসা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিদেশের স্বীকৃতি আদায়ের কৌশল হিসেবে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি নিয়মিত বাহিনী দিয়ে একটি মুক্তাঞ্চল তৈরির গুরুত্ব অনুভূত হয়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৮টি পদাতিক ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠা করে তাদের তিনটি ব্রিগেডের আওতাধীন করে নিয়মিত বাহিনীর নতুন কাঠামো দাঁড় করা হয়। সীমান্ত অঞ্চলে নিয়মিত বাহিনী হামলা শুরু করে। তার মধ্যে কমলপুর, বেলোনিয়া ও বয়রা যুদ্ধ উল্লেখযোগ্যভাবে স্মরণীয়। পাকিস্তানিদের ৩৭০টি সীমান্ত চৌকির মধ্যে ৯০টি বাংলাদেশি বাহিনীর দখলে চলে আসে।

মুক্তিযুদ্ধ মূলত কেন্দ্রীভূত ছিল স্থলযুদ্ধে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে পূর্ণতা দিতে নিয়মিত সেনাবাহিনী ও এক লাখ মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি বিমান ও নৌবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা শুরু থেকে অনুভূত হলেও বাস্তবে রূপ নিতে সময় লেগেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর বিমান ঘাঁটিতে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ত্যাগ করে আসা ৯ বাঙালি অফিসার ও ৫০ জন বিমান সেনাকে একত্র করে বিমানবাহিনী গঠিত হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি ডিসি-৩ ডাকোডা, একটা ডিএইচ-৩ অটার বিমান এবং একটা এলুয়েট-৩ হেলিকপ্টার নিয়ে যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর। পরিচালনা করে অন্তত ১২টি যুদ্ধমিশন। ৪ ডিসেম্বর শমসেরনগর মুক্ত হলে ডিমাপুর থেকে বিমান ঘাঁটি স্থানান্তরিত হয়।

পাকিস্তান নৌবাহিনী ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী অফিসার ও নৌসেনারা দিল্লিতে সমবেত হয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। পরে পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীতে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলেন, যার সাংকেতিক নাম ছিল সি২পি। ৩০০ জন মুক্তিবাহিনীকে নৌবাহিনীতে অঙ্গীভূত করা হয়। বিএনএস পলাশ এবং পদ্মা নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী যাত্রা শুরু করে। ৯ নভেম্বর ৬টি পেট্রোল ক্রাফট নিয়ে প্রথম নৌফ্লিটের উদ্বোধন হয়। তার পূর্বে ১৫-১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, মোংলা ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে নৌ-কমান্ডোরা যুগপৎ হামলা করে পাকিস্তানিদের অনেক জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। চট্টগ্রামে তিনটি জাহাজ ডুবিয়ে ১৯ হাজার টন অস্ত্র এবং গোলাবারুদ ধ্বংস করা হয়। হামলায় চাঁদপুরে তিনটি স্টিমার, নারায়ণগঞ্জে চারটি জাহাজ, মোংলায় ছয়টি বিদেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের বাহিনীগুলো এককভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে যথেষ্ট সাফল্য ও সাহসিকতা দেখিয়েছে। একাত্তর সালের ২১ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধরত বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর তিনটি অঙ্গ সম্মিলিতভাবে প্রথমবারের মতো যুগপৎ অভিযান পরিচালনা করে স্থলযুদ্ধের একক চরিত্রকে আকাশ ও সমুদ্রে নিয়ে বহুমাত্রিক যুদ্ধে রূপ দেয়। ডিসেম্বরের ৩ তারিখে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব শুরুর প্রাক্কালে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর ত্রিমাত্রিক রূপ সামরিক অর্থে না হলেও কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ ও ভারত নিয়ে গঠিত মিত্র বাহিনীতে বাংলাদেশের সামরিক অংশকে পরিপূর্ণতা এনে দিতে সক্ষম হয়েছিল। ২১ নভেম্বর ভবিষ্যৎ সমরে সম্মিলিত অভিযানের গুরুত্বকে সমুন্নত রাখতে পথপ্রদর্শক হয়ে কাজ করবে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী একটি আধুনিক ও সক্ষম শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে বেড়েছে অস্ত্র ও সরঞ্জামে হয়েছে আধুনিক। সুপারসনিক যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন, মিসাইল ও ট্যাংক-কামানসমৃদ্ধ সামরিক বাহিনীর ভিত্তি ছিল মুক্তিযুদ্ধে সমরজয়ের তিলক চিহ্ন। জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ ও দেশ গড়ায় নিবেদিত বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে এখনও সামরিক বাহিনী দুর্যোগ মোকাবেলা থেকে বিশ্ব শান্তি ও মানবতা রক্ষায় সফলভাবে কাজ করে চলেছে এবং আগামী দিনেও অগ্রণী ভূমিকায় থাকবে। সশস্ত্র বাহিনী দিবস প্রেরণার ও শিক্ষার উৎস হয়ে থাকবে।

সশস্ত্র বাহিনী দিবসের তাৎপর্যের বহুমাত্রিকতা রয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী দিবস এখন রাষ্ট্রীয় আচারে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক সহিষুষ্ণতা তৈরিতে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সেনাকুঞ্জের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান অনেক সময় অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে। সামরিক বাহিনীর অনুষ্ঠানে সব রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ ও উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে সৌহার্দ্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারার সুবাদে একটি কাঙ্ক্ষিত জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা কর্মকর্তাদের মিলন মেলা বললে অত্যুক্তি হবে না। কূটনীতিকদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও বর্ণিল ও অনবদ্য করে তোলে। বাংলাদেশের অর্জন ও চ্যালেঞ্জ অনুধাবনের বাহন হিসেবেও কাজ করে। সশস্ত্র বাহিনী দিবস জাতীয় অতীত ও বর্তমানকে বেঁধে ফেলার এক বর্ণিল মুহূর্ত। নতুন ও পুরাতনের মাঝে বন্ধনের সেতু হয়ে সশস্ত্র বাহিনী দিবস নতুন কৃষ্টি তৈরি করে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল; নিরাপত্তা বিশ্নেষক ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আই ক্লাডস) নির্বাহী পরিচালক

সূত্র: সমকাল

শেয়ার করুন