বিএনপি জোটে ইরান-সংকট, রাতে সিদ্ধান্ত

সিলেটের সকাল ডেস্ক :: লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকে নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে। দলটির একটি অংশের দাবি, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ এবং জোট ছাড়ার বিষয়ে জোটের আরেক নেতার সঙ্গে মোবাইল ফোনের আলাপকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (১৫ নভেম্বর) রাতে গুলশানে অনুষ্ঠেয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদিও বৈঠকে লেবার পার্টির কোনও অংশকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্টরা মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর)এসব তথ্য জানিয়েছেন।

জানা গেছে, গত ৫ নভেম্বর রাতে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দল বাংলাদেশ লেবার পার্টিতে ভাঙন হয়। পাল্টাপাল্টি ঘোষণা দিয়ে দলের চেয়ারম্যান ইরান বহিষ্কার করেন মহাসচিব হামদুল্লাহ আল মেহেদীকে। পরে হামদুল্লাহ আল মেহেদী ও তার অনুসারীরা আবার ইরানকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেন। হামদুল্লাহ তার অংশের চেয়ারম্যান করেন দলের সহ-সভাপতি ইমদাদুল হক চৌধুরীকে। ভেঙে যাওয়া দলটির দুই অংশই বিএনপি জোটের শরিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিল। নতুন করে দুই দলে সমস্যা তৈরি হয় মঙ্গলবার জোটের বৈঠক ডাকার সিদ্ধান্তে। বিএনপির দফতর থেকে ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বুধবার রাতে গুলশানে চেয়ারপারসন কার্যালয়ে আসার আমন্ত্রণ দেওয়া হয়। এই আমন্ত্রণের তালিকা থেকে বাদ পড়ে লেবার পার্টি।

লেবার পার্টি (মেহেদী) অংশের মহাসচিব হামদুল্লাহ আল মেহেদী মঙ্গলবার রাতে বলেন, ‘বিএনপির মহাসচিব ও জোটের সমন্বয়ক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমাদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানাননি। তিনি বলেছেন, জোটে আলোচনা হবে, এরপর লেবার পার্টির বিষয়ে খালেদা জিয়া সিদ্ধান্ত দেবেন।’

মেহেদী আরও বলেন, ‘আমি ও পার্টির চেয়ারম্যান ইমদাদুল হক চৌধুরী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা তাদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছি, মোস্তাফিজুর রহমান ইরান জোটবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত।’

লেবার পার্টির যুগ্ম-মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি শামসুদ্দিন পারভেজ বলেন, ‘সাবেক চেয়ারম্যান ইরানকে বহিষ্কার করা হয়েছে গঠনতান্ত্রিকভাবেই। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর প্রমাণ আমরা হাতে পেয়েছি। এই তথ্যপ্রমাণগুলো জোটের শীর্ষনেতাদের সবাইকে অবহিত করা হয়েছে।’

শামসুদ্দিন পারভেজ মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে আরও বলেন, ‘‘বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইরান। এ তথ্যও সবাইকে জানিয়েছি। এছাড়াও তিনি জোটের একটি শরিক দলের নেতাকে ফোনে বলেছেন, ‘বিএনপি জোট করে কী হবে, দেখি বার্গেনিং করে, আসেন।’ তিনি এই ছবি ফেসবুকেও দিয়েছেন।’’

এদিকে, লেবার পার্টির ইরানবিরোধী অংশটির তথ্যপ্রমাণ অভিযোগ হাতে পেয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে গত ৭ নভেম্বর রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকও করে ইরানবিরোধী অংশটির নেতারা। বুধবার রাতের বৈঠকে শরিক নেতাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে অবগত জোটের শরিক একটি দলের চেয়ারম্যান। নাম না প্রকাশের শর্তে তার ভাষ্য, ‘খালেদা জিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন হয়তো। সম্ভবত, ইরানকে আর জোটে রাখা হচ্ছে না। এছাড়া ইরান জোটের অনেকের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধাও গ্রহণ করেছেন বিভিন্ন সময়। এ ক্ষেত্রে শরিক নেতারাও ইরানের বিরুদ্ধেই মতামত দিতে পারেন। সবকিছু পরিষ্কার হবে আগামীকালের (বুধবার) বৈঠকে।’

লেবার পার্টির ইরানবিরোধী অংশটির একাধিক নেতা জানান, নতুন অংশটির চেয়ারম্যান ও মহাসচিব মঙ্গলবার রাত ১১টা পর্যন্ত গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অবস্থান করেছেন। এ বিষয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে হামদুল্লাহ মেহেদী বলেন, ‘আমরা এতক্ষণ ছিলাম অফিসে। মহাসচিব আমাদের বলেছেন, জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর লেবার পার্টিকে জানানো হবে।’

বিএনপির আমন্ত্রণ না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান ইরানও। রাত পৌনে ১২টার দিকে তিনি বলেন, ‘আমি বাসায়। বুধবারের বৈঠকের কোনও আমন্ত্রণ এখনও পাইনি।’ আমন্ত্রণ না পেলেও যাবেন কিনা— জানতে চাইলে ইরান বলেন, ‘এসব নিয়ে এখন ভাবছি না।’

ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে ইরান বলেন, ‘গত ২ নভেম্বর রাস্তায় ফার্নিচারের এক দোকানে নেজামী সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ওই সময় কুশল বিনিময় হয়েছে, ভালোমন্দ জানতে চেয়েছি। এটা তো খুব স্বাভাবিক। সরকারের অনেক মন্ত্রীদের সঙ্গেও তো বিএনপির অনেকের দাওয়াতে দেখা হয়, একসঙ্গে খাবার খান। মোসাদের সঙ্গেও তো ছবি দেখা গেছে। এগুলোর কী হবে?’

ইরানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামীর কাছেও। তিনি বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে কোনও বৈঠক হয়নি। নয়াপল্টনে একটি দোকানে আমি বাথরুমের কিছু জিনিস কিনছিলাম। এসময় ইরানের সঙ্গে দেখা। ওখানে ফার্নিচারের দোকানও আছে। এরপর তিনি নিজেই একজনকে দিয়ে ছবিও তুলেছেন। তার সঙ্গে কোনও আলোচনা বা বৈঠক হয়নি।’

নেজামীর সঙ্গে বৈঠকের সূত্র ধরে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে কিনা কিংবা জোট ছাড়ার চিন্তা আছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘জোট ছাড়ার কোনও পরিকল্পনা নেই। এই জোটের জন্য রক্ত দিয়েছি, বারবার গ্রেফতার হয়েছি।’ জোট ছাড়ব কেন?— উল্টো প্রশ্ন তোলেন ইরান।

এদিকে, বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাব কনফারেন্স লাউঞ্জে বাংলাদেশ লেবার পার্টির (ইরান) উদ্যোগে ‘বিচার বিভাগে নগ্ন হস্তক্ষেপ: আইনের শাসনের ভবিষ্যত’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এই অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের উপস্থিত থাকার কথা। তবে শেষ পর্যন্ত এই অনুষ্ঠানে মওদুদ আহমদ অংশ নেন কিনা, তা দেখতে অপেক্ষা করছেন বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলগুলোর অনেক নেতাই।

এ বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং কর্মকর্তা শায়রুল কবির খানকে পাওয়া যায়নি। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।

শেয়ার করুন