আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে

মীর আব্দুল আলীম :: ‘ধান-চালের দরে বিশাল ফারাক’—পত্রিকার শিরোনাম দেখে ভাবি এ দেশে ফারাক নেই কোথায়? রাজনীতিতে, এক দলে আরেক দলে ফারাক, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে ফারাক, সামাজিক বন্ধনে ফারাক। এই ফারাক দেখেই তো শিল্পিরা গায়—‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’। সত্যিই আমরা আগে (ছোট বেলায়) অনেক সুন্দর দিন কাটিয়েছি।

রাজনীতিতে একদলের সাথে আরেক দলের ফারাক থাকাটাই স্বাভাবিক। এখন দলাদলির ফারাকটা কিন্তু অনেক বেড়েছে। একের পর এক মামলা, সাথে থাকে হামলা। বাড়ি ছাড়া করা, দুনিয়া ছাড়া করা, দেশ ছাড়া করা কোনোটাই বাদ যায় না। আগে কিন্তু এমনটা ছিল না। একদলের লোক আরেক দলের দাওয়াতে গিয়ে আনন্দে সামিল হতেন। আড্ডা দিতেন চায়ের টেবিলে। এখন দলবাজি যারা করেন তাদের বিরোধীদের সাথে রীতিমত মুখ চাওয়াচাওয়ি হারাম কোথাও কোথাও।

সেই দিন কোথায় আজ? আমার দুটো ছেলের কথা বলি। ওরা সকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছোটে। দিন ধরে কোচিং করতে করতে সন্ধ্যা। এর পর বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর প্রতিবেশীর সময় নেবার সময় কোথায়? আমি যে ফ্লাটে থাকি সে বিল্ডিংয়ে ১৬৮টি বড়সড় ফ্লাটে প্রায় ১৪শ’ লেকের বাস। একটি বড় গ্রাম আর কী। গুণে গুণে সাত/আটজনের নাম জানি। ছেলেরা তাও জানে কিনা সন্দেহ। বছরখানেক আগে আমার পাশের ফ্লাটের এক ভদ্রমহিলার অকালমৃত্যু হয়েছে। যে রাতে তিনি মারা গেছেন, আমার পরিবারের কেউ জানে না সে খবর। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে লিফটের পাশে মানুষের সমাগম থেকে পরে বিষয়টি জানতে পারলাম। এইতো শহুরে জীবন। আর আমরা আগে কি দেখেছি? দুই/একদিন গাঁয়ের কারো সঙ্গে দেখা নেই তো মন আনচান করতো। এখন কেউ কারো খোঁজ রাখে না। সে সময় কোথায় হারিয়ে গেলো? বড্ড ব্যস্ত আমরা। নিজেদের নিয়েই ব্যস্ততা বেশি। সামাজিক বন্ধনের ফারাকটা বুঝলেন তো পাঠক?

বাস্তব ঘটনা। পত্রিকায় খবর হয়েছে। ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার পিতা মারা গেছেন বৃদ্ধাশ্রমে। পুত্রকে বাবার মারা যাবার খবরটা দেওয়া হলে তিনি জানালেন—‘আমি এখন মিটিংয়ে আছি। লাশ আঞ্জুমানে দিয়ে দিন’। হায় পুত্র! ঠাকুরগাঁয়ে এক মায়ের ঘটনা সবাই জানেন। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। ডিসি সাহেব গিয়ে পুত্রের নির্যাতনের শিকার মাকে এনে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ছেলেকে দেন হাজতে। মা তো জ্ঞান ফিরে একই প্রলাপ— ‘আমার ছেলে কোথায়? তোমরা তাকে মেরো না’। এমন হাজারো উদাহরণ আছে আমাদের ঘুণে ধরা এ সমাজের। মা-বাবার প্রতি সন্তানের মায়া-মমতার ফারাক কিন্তু এখন বেশ লক্ষণীয়। ভাই ভাইকে টাকার জন্য, জমির জন্য খুন করছে। ভাইয়ে ভাইয়ে ফারাক বেড়েছে। ভ্রাতৃত্বের, মাতৃত্বের, পিতৃত্বের বন্ধনে চিড় ধরেছে। এ চিড় জোড়া লাগানো না গেলে আমাদের যে আর অবশিষ্ট কিছু থাকে না।

শুরুতেই ‘ধান-চালের দরে বিশাল ফারাক’ পত্রিকার শিরোনাম দিয়ে লেখা আরম্ভ করেছিলাম। ধান চাল নিয়েই কিছু বলা হয়নি এখনও। এদেশে দ্রব্যমূল্যের ফারাকটা নতুন নয়। পাইকারি বাজারে শসার দাম ২০ টাকা তো খুচরা বাজারে ৫০ টাকা।

গত ১২ নভেম্বর খাদ্য অধিদপ্তর প্রতি টন ধানের মূল্য ২৬ হাজার ৬৭ টাকা ৫৬ পয়সা ঘোষণা করেছে। অথচ টিসিবির মূল্য তালিকা অনুযায়ী ওইদিন বাজারে মোটা চাল (স্বর্ণা-চায়না ইরি) প্রতি কেজি ৪২ থেকে ৪৬ টাকা, পাইজাম-লতা ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, মাঝারিমানের চাল ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা, নাজির-মিনিকেট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং সরু চাল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।  মিলমালিকদের মতে, এক মণ ধানে সর্বোচ্চ ২৭ কেজি চাল পাওয়া যায়। সে হিসাবে সরকার নির্ধারিত ধানের দর অনুযায়ী প্রতি কেজি চালের দাম হবে ৩৮ টাকা। অথচ বাজারে এ দামে সর্বনিম্নমানের চালও নেই। ধান চালের দামে এমন ফারাক হবে কেন? আর স্বাভাবিকভাবেই কৃষকরা এমন দামের ফারাক রেখে কেউ সরকারের কাছে ধান বিক্রি করবে বলে মনে হয় না।

এদেশে সব কিছুতেই ফারাক বেশ চোখে পড়ার মতো। এ দূরত্ব, এ অসংগতি কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে, সরকারকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এভাবে চললে মানুষ আর মানুষ থাকে না, দেশ আর দেশ থাকবে না। আসুন আমরা আমাদের সমাজের, পরিবারের, রাষ্ট্রের ফারাকগুলো কমিয়ে আনি। আর তাতেই দেশের মানুষ ভালো থাকবে, দেশ সমৃদ্ধশালী হবে, সুন্দর দেশ হবে বাংলাদেশ। সেই দিনের প্রত্যাশায় রইলাম আমরা।

লেখক: গবেষক

সূত্র: ইত্তেফাক

শেয়ার করুন