হত্যা : রাজন-রাকিবের পর সাগর-রাসেল

বিশ্বজিত রায় :: রাজন-রাকিবের ওপর চালানো নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি দেখল দেশবাসী। একই কায়দায় ময়মনসিংহে ১৬ বছরের সাগর এবং বগুড়ায় ১৯ বছরের রাসেলকে নৃশংসভাবে হত্যা করল মানুষরূপী হায়েনারা। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চোর অপবাদে সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট খুলনায় রাকিবের পায়ুপথে বায়ু ঢুকিয়ে হত্যার দগদগে ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ফের প্রাণ হারাল আরও দুইজন।

সংবাদে প্রকাশ, পানির পাম্প চুরির অপবাদ দিয়ে কিশোর সাগর মিয়াকে গাছের সঙ্গে বেঁধে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পানি চাইলেও পান করতে দেয়া হয়নি। গাছে বাঁধা অবস্থায় একসময় সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মর্মস্পশী ঘটনাটি ঘটে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার চরশ্রীরামপুরের একটি মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রে। হত্যাকা-ের মূল ভূমিকায় ছিলেন মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের মালিক আক্কাস আলী। নিহত কিশোর সাগর ময়মনসিংহের রেলওয়ে বস্তির শিপন মিয়ার ছেলে। অপরদিকে বগুড়ায় কমপ্রেসার মেশিন দিয়ে পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে রাসেল মিয়া (১৯) নামে একজনকে হত্যা করা হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর বেলা ২টা ৫০ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একটি সিরামিক কারখানার শ্রমিক রুবেল হোসেন (২৪) তার সহকর্মী রাসেল মিয়ার পায়ুপথে জোরপূর্বক বাতাস ঢুকিয়ে দিলে এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ বাস্তবতায় শেষ বলতে কিছু নেই। আজ একটা ঘটলে আগামীকাল ঘটবে এর চেয়ে বড় কিছু। কিন্তু বড় থেকে বড় অঘটন ঘটলেও এর প্রতিকারে নেই কোনো সন্তোষজনক সমাধান। তাই দিন দিন বেড়েই চলছে মানুষ হত্যার মতো ঘৃণ্য অপকর্ম। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিদিনই পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে। চোর, ডাকাত, পকেটমার কিংবা ছিনতাইকারী সন্দেহে ধরা পড়লে গণপিটুনি দেয়াটা বিধানে পরিণত হয়েছে।

অপরাধবিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতার অভাবে গণপিটুনির মতো ভয়াবহ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। অপরাধ করেও ঘুষ আর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় গণপিটুনির মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের ঘটনা বাড়ছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৮ বছরে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ১ হাজার ২৩ জন। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১২৭ জন, ২০১০ সালে ১৭৪, ২০১১ সালে ১৬১, ২০১২ সালে ১৩২, ২০১৩ সালে ১২৫, ২০১৪ সালে ১১৬, ২০১৫ সালে ১৩৫ এবং ২০১৬ সালে ৫৩ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে। আর চলতি বছরে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চুরির অভিযোগে ১৩ বছরের শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যার পর সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম সোচ্চার হয়। হত্যাকারীদেরই এক সহযোগী নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিলে সারা দেশে তৈরি হয় তীব্র ক্ষোভ। সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালত ২০১৫ সালের ৮ নভেম্বর এ মামলার রায়ে চারজনকে ফাঁসির আদেশ দেন। এ ঘটনার পর ২০১৬ সালে গণপিটুনিতে হত্যার সংখ্যা কমে আসে। তবে ২০১৭ সালে আবার গণপিটুনিতে এ সংখ্যা বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে গণপিটুনির শিকার হয়েছে শিশুসহ ২০ জন। এর মধ্যে সাতজন মারা গেছেন। সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গরুচোর সন্দেহে চারজন এবং এর ৬ দিন আগে কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাত সন্দেহে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর ওয়ারীতে গণপিটুনিতে এক যুবক মারা গেছে ছিনতাইকারী অভিযোগে। সর্বশেষ ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার চরশ্রীরামপুর গ্রামে চুরির অভিযোগে কিশোর সাগর মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের ১ মার্চ বনশ্রীর ই-ব্লকে সাইকেল চুরির অভিযোগে মানিক নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২ জুন মোহাম্মদপুরের চান মিয়া হাউজিং এলাকায় শামীম নামে আরেক যুবককে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করে জনতা। (সূত্র : আলোকিত বাংলাদেশ, ২৮.০৯.১৭)।

আমরা এখনও ভুলে যাইনি শিশু রাজনের মুখচ্ছবি। কান পাতলে রাজনের আকুতি-মিনতির দুঃখভারাক্রান্ত কান্নার ধ্বনি আজও কানে বাজে। ভুলতে পারি না রাজনের মায়াবী মুখের সে চিত্র। দেশ-বিদেশে ঝড় তোলা রাজন-কাহিনী শেষ হতে না হতেই সাগরের উত্তাল তরঙ্গ (মৃত্যুযন্ত্রণা) ঢেউ তুলেছে মোর মানবিক চিত্তে। কিন্তু কেন এ আচরণ?

সুস্থ চিন্তাশক্তি দ্বারা তালাশ করলে সমাজের নানা অসংগতি যেমন সামনে চলে আসে, তেমনি রাষ্ট্রের গাফিলতি ও খামখেয়ালিপনার বিষয়গুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় অনেক কিছু। এমন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মনে জাগে প্রশ্ন। জননিরাপত্তা বিধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকতে মানুষ কেন নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে? সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা নিরূপণে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় মাধ্যমগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজের নোংরা চরিত্রগুলোকে আরও উৎসাহিত করছে। আবার অপরাধীরা এভাবেই সমাজ ও রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের আধিপত্য অন্যায়-অবিচারের জলজ্যান্ত উদাহরণ উপস্থাপন করছে দেশবাসীর সামনে। সর্বদা অন্যায় অভিমুখে বিচরণকারী এ দুষ্কর্মধারী মানুষরা একের পর এক মানবতাবিরোধী অপকর্ম করে যাচ্ছে, আমরা নীরবে চেয়ে চেয়ে দেখছি আর রাজন-রাকিব ও সাগর-রাসেলের পরিবার-পরিজন শুধুই কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের ঘটনা-পরবর্তী খানিক্ষণের দৌড়ঝাঁপ কিছুটা আশা জাগালেও অল্পদিন অতিবাহিত হওয়ার পর হাওয়ায় মিলিয়ে যায় সব তৎপরতা।

এ থেকে পরিত্রাণ প্রয়োজন। দরকার জবাবদিহিমূলক সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে এগোতে হবে রাষ্ট্রকে। কোনো অপরাধী যাতে অপরাধ করে পার পেয়ে না যায়। যে যেমন অপরাধই করুক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে; আইনের নির্দেশিত পথে থেকে তার বিচার করতে হবে। শাস্তির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে পারলেই হয়তো কমে আসবে অপরাধ কর্ম।

#কলামিস্ট, সুনামগঞ্জ
bishwa85@gmail.com

শেয়ার করুন